হে-হে করে হাসতে-হাসতে রঘু ঘোষ বলে, আরে, আচ্ছা-আচ্ছা, চলেন।
ম্যানেজারবাবুকে নিয়ে রঘু ঘোষ যখন বাধে পৌঁছয় তখন ভিড় একেবারে জমজমাট। রঘু ঘোষ বাধে উঠে ওদের বাগানের দলটাকে খোঁজে। ওদিকে ম্যানেজারবাবুকে দেখে হাটের লোক দু-একজন নমস্কার করে এগিয়ে আসে। রঘু ঘোষ বলে, এই আসার আগে ফোন করলাম। আধঘণ্টার মধ্যে মিলিটারির নৌকো এসে যাবে। এতক্ষণে টাউন থেকে রওনা হয়ে গেছে?
রায়পুরের গুদামবাবু আগেই এসে গেছেন। উনি এদের দেখে কাছে আসতে-আসতে বলেন, আরে, আর প্রেসকিউ করবে কাকে? যে ভেসে এসেছিল সে নাকি কিছুক্ষণ পর একটা সুপুরি গাছের ওপর উঠে উধাও হয়ে গেছে।
মানে? সে আবার কী? রঘু ঘোষ জিজ্ঞাসা করে।
ঐ যে দেখছেন টিনের চাল ভেসে আছে, গুদামবাবু আঙুল দিয়ে অশ্বিনী রায়ের চাল দেখান, ঐখানে নাকি একটা লোক ভেসে এসে উঠেছিল। এরা সবাই দেখেছে। গুদামবাবু বেশ জোরে-জোরে কথাগুলো বলছিলেন–ফলে তাদের ঘিরেই ভিড়টা জমাট বেঁধে যায়। তা ছাড়া এই জায়গায় এই ভিড়ের মধ্যে এখন রায়পুরের ম্যানেজারবাবু, গুদামবাবু, ফ্যাক্টরিবাবুই (রঘু ঘোষ) সবচেয়ে প্রধান ব্যক্তি। রায়পুরের এক শ্রমিক এসে ম্যানেজারবাবুর হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে তার মাথায় ধরে রাখে। গুদামবাবু বলেন-তারপর নাকি লোকটা হঠাৎ একটা সুপুরি গাছে চড়ে। ওরা সবাই দেখেছে। কিন্তু সুপুরি গাছ থেকে আর নামে নি। আর, নামবেই বা কোথায়?
সুপুরি গাছ ত পিছল হয়ে আছে। পড়ে যায় নি ত গাছ থেকে? ম্যানেজারবাবু বলেন।
পড়ে গেলে ওরা দেখত না? গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
তা, লোকটা কি হাওয়া হয়ে গেল? রঘু ঘোষ পাল্টা জিজ্ঞাসা করে।
.
১৩৭. বন্যার উপকথা
সে আমি কী করে বলব, আমি ত আর দেখি নি, কিন্তু এরা ত সব এক কথা বলছে! গুদামবাবু ডান দিকে হাত দেখান।
চলুন ত দেখি, রঘু ঘোষ সেদিকে পা বাড়িয়ে ম্যানেজারবাবুর দিকে ঘুরে তাকায়। ম্যানেজারবাবু কথা বলছিলেন। হাত তুলে রঘু ঘোষকে এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করেন। রঘু ঘোষ আর গুদামবাবু ঘিরে ধরা ভিড়টাকে ভেঙে এগিয়ে যায়। ভিড়টার কেউ-কেউ গুদামবাবু আর রঘু ঘোষের পেছন-পেছন যায়, কেউ-কেউ ম্যানেজারবাবুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে।
গুদামবাবুর পেছনে-পেছনে রঘু ঘোষ যেখানে গিয়ে দাঁড়ায় সেখান থেকেই বানভাসিদের অস্থায়ী আবাস শুরু। এর মধ্যেই বানভাসিদের আলাদা করে চিনে নেয়া যায়। তারা বেশির ভাগই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এক-এক দঙ্গলে জড়াজড়ি করে আছে। চব্বিশ ঘণ্টার ওপর হাওয়া আর বৃষ্টি তাদের শরীরের ওপর দিয়ে গেছে–সেটা দেখেই বোঝা যায়। বাতাসের ধাক্কায় কোনো আড়াল বা ঢাকনা থাকছে না। কিন্তু এরই মধ্যে বড় বড় বোল্ডারের পাশে পাথরের আড়ালে অনেকে নিজেদের শরীর বাঁচাচ্ছে। কেউ-কেউ আবার সংসারের জিনিশপত্র পাজা করে রেখে তার আড়ালে বাতাস আর বৃষ্টি থেকে মাথা বা শরীরের কোনো অংশ বাঁচাচ্ছে। পাশেই গরুগুলো দাঁড়িয়ে বসে। তাদের সারা শরীর সপসপে ভেজা। গোবরের গন্ধে বাতাস ভারী। এক বুড়ি একটা তক্তার ওপর কাত হয়ে শুয়ে, তার মাথার ওপর একটা ঝুড়ি চাপা দেয়া বৃষ্টি ঠেকানোর জন্যে।
রঘু ঘোষ আর গুদামবাবু যে-জায়গায় এসে দাঁড়ায়, সেখান থেকেই বানভাসিরা নিজেদের আলাদা করে রাখা শুরু করেছে বটে কিন্তু ঐ শুরুর জায়গাটাতেই যা ভিড়। তারপর জিনিশপত্র আর গরুবাছুরে বাকি বাধটা এমন ঠাসা যে যারা ফ্লাড দেখতে এসেছে তাদের পক্ষে সেদিকে এগনো মুশকিল। ফলে, ঐ প্রথম দলটার কাছেই ভিড়টা একটু বেশি। সবাই যেন তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে যে বন্যায় নিজেদের বাড়ি ছাড়তে হলে কী রকম দেখায়।
এই দেখার মধ্যে যে কৌতূহলের আলস্যই ছিল তা নয়, অনেকের পক্ষে এই দেখাটা স্মৃতিচারণও বটে। এই ভিড়ের মধ্যে অনেকে আছে যারা আটষট্টির বন্যায় কোনো রকমে বেঁচেছে। আবার এমনও অনেকে আছে যারা দু-এক বছর আগের কোনো বন্যায় ভেসেছে। তবু যে সবাই মিলে বানভাসিদের দেখছে, তার কারণ, বানে যে ভেসে আসে শুধু তাকেই দেখে না, তার ভেতর দিয়ে বন্যাটাকেই দেখে। কিন্তু সেই বা কতক্ষণ দেখা? তাই মানুষজন দেখছিল, আবার সরেও যাচ্ছিল। রায়পুরের দলটাও এখানেই ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। গুদামবাবু রঘু ঘোষকে এসে বলেন, এই যে এদের জিজ্ঞাসা করুন। এরা সবাই দেখেছে যে লোকটা টিনের চালের ওপর বসেছিল।
কী, তোমরা দেখেছ নাকি? সত্যি একটা লোক ভেসে এসেছিল? রঘু ঘোষ একটু হেসে, একটু জোরে বলে। কিন্তু বানভাসিদের যে-দলটাকে সে জিজ্ঞাসা করে, তারা জবাব ত দেয়ই না, এমনকি রঘু ঘোষের দিকে ফিরেও তাকায় না! বোধহয় বহুক্ষণ ধরে এই প্রশ্নটা তাদের করা হয়ে আসছে। কেউ জবাব দিল না দেখে অফিসবাবুর বড় শালী রঘু ঘোষের দিকে তাকিয়ে বলে, সত্যি একটা লোক ভেসে এসেছিল, তারপর নাকি সুপুরি গাছে চড়ে উধাও হয়ে গেছে জলের ভেতর থেকে?
রঘু ঘোষ আবার একটু হে-হে করে হাসে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। তারপর অফিসবাবুর বড় শালীকে বলে, চলেন, আপনাকেও ঐ চালের ওপর রেখে আসি, তারপর বিনা পয়সায় সুপুরি গাছের প্লেনে উঠবেন।
অফিসবাবুর স্ত্রীর প্রায় সব সময়ই অসুখ। তার বড় শালীই চিরদিন তাদের সংসারের দেখাশোনা করে আসছেন। সেই সুবাদে অফিসবাবুর অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গেও তার এক রকম সস্নেহ রসিকতার সম্পর্ক।
