কিন্তু রায়পুর বাগানে গিয়েছিল অমূল্যদের পাড়ার সুবল আর ছিদাম। যে কারণেই হোক, তাদের দুজনের কেউই খুব একটা বিশদ বিবরণ দিতে চায় না। সুবল আর ছিদামের বদলে আর-কেউ হলে হয়ত বাবুদের এই এত প্রশ্নের সুযোগে বেশ সবিস্তার কাহিনীই বলতে বসত। সুবল-ছিদামও যে তেমন গল্প বলতে পারত না, তা নয়। কিন্তু নিজেদের চর ছেড়ে, ঘর ছেড়ে, ভোলা বাঁধের ওপর তাদের একটা রাত কেটেছে, এবং মাত্র একটা রাত। আজ হাওয়ার আর নদীর যা-চেহারা তাতে আর করাত কাটাতে হবে, তারা জানে না। সারা শরীরে ঐ জল আর হাওয়ায় তাদের ইতিমধ্যেই একটা একঘেয়েমি এসে গেছে। যে বন্যার মধ্যে আছে, সেই বন্যা নিয়ে আর কথা বলতে তাদের ভাল লাগছিল না। তা ছাড়া সুবল-ছিদামের যা বয়স, তাতে বাঁধের ওপর তাদের আর-কিছু করার ছিল না–এখন শুধু বসে বসে সময় কাটানো। রিলিফ-টিলিফ এই সব করার জন্যে ত নিতাইকাকারই আছে। গরুবাছুরও আছে বাধা। তারা তাই রায়পুর বাগান থেকেই সাইকেলে টাউনে গিয়ে দুপুরের শোতে একটা সিনেমা দেখে বিকেলে বাঁধে ফিরে আসবে। ডি-সিকে ফোন করার কথাটুকু তারা জানাতে চায় শুধু–এর চাইতে বেশি কথার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে চায় না। বাবুদের কথার উত্তরে ছোটখাট ঘ দিয়ে তারা সাইকেলে চড়ার ভঙ্গি করে। কিন্তু সাইকেলে চড়ার আগে বাবুদের একবার মনে করিয়ে দেয়, ফোনটা কইর্যা দিবেন বাবু, মিলিটারিনৌকা য্যান পাঠায়।
ফলে, সুবল-ছিদাম চলে যাবার পর বাবুদের মুখে-মুখে কথাটা বাগানে ছড়ায়, বাগানের কুলিকামিনদের কাছেও কিছু খবর আসে, দুপুরে বাবুরা বাড়িতে খেতে গেলে বাড়িতেও খবরটা পৌঁছে যায়। রায়পুর বাগানের লোকজনের কাছে এটা আর-কোনো খবর না যে চরের লোকজন বাধে উঠেছে। কিন্তু সেই বানভাসি লোকেরা এসে খবর দিয়ে গেছে যে তিস্তা দিয়ে তোকজন ভেসে আসছে–এটা একটা খবর বটে। কত লোক, কখন ভাসল, কোথায় উঠল, মিলিটারির নৌকো কখন আসবে-এর কোনো কিছুই জানা নেই বলে কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। এদের মধ্যে অনেকেই ত বন্যায় যে মিলিটারি নামে তা শুধু রেডিয়োতে শুনেছে, অন্য জায়গার বন্যার খবরে টিভিতেও দেখেছে। কিন্তু তাদেরই বাধ থেকে মিলিটারির নৌকো ছাড়বে–এটা প্রায় যেন অবিশ্বাস্য ঠেকে। এমন আশাও কারো কারো মনে আসে যে মিলিটারি যখন নামবে তখন কি আর টিভিতে দেখাবে না? টিভিতে দেখানো না-হলে কি মিলিটারি নামবে? একেবারে তাদেরই বাঁধের ওপর থেকে মিলিটারিরা যাবে আর সেটা আবার তাদের টিভিতেই দেখা যাবে–এ রকম একটা অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে ভেবে দুপুরের খাওয়া কোনো রকমে সেরে রায়পুর বাগানের বাবুরা, গিন্নিরা, বাচ্চারা বাঁধের ওপর এসে ওঠে।
বাঁধের দিকে আসতে-আসতে রঘু ঘোষ একবার ম্যানেজারের বাংলোতে হাঁক দেয়–কী ম্যানেজারবাবু, খবর পেলেন নাকি মিলিটারির নৌকো কখন আসবে?
ম্যানেজারবাবু খাওয়াদাওয়ার পর শুয়ে ছিলেন। তিনি জানলায় পর্দা সরিয়ে ঘাড়টা একটু তুলে বলেন, কী, তুমিও যাচ্ছ নাকি বাধে?
করবটা কী? সবাই যাচ্ছে। আপনি যাবেন না?
তোমরা আগাও। আমি একটু শুয়ে, পরে যাচ্ছি।
তা একটা ফোন করেন জ্যোতিদাকে, মিলিটারি কখন আসবে।
ম্যানেজারবাবু পর্দা ফেলে দেন। রায়পুর চা-কোম্পানির অফিস জলপাইগুড়ি শহরে। তাদের সেক্রেটারিকেই ম্যানেজারবাবু ফোন করে জানিয়েছিলেন তখন। তারপর আর-খবর নেন নি। তাঁর আর খবর নেয়ার আছেই বা কী? এখন জ্যোতিবাবুকে ফোন করলে অবিশ্যি জানা যায় কী হয়েছে।
ম্যানেজারবাবু পর্দা তুলে বলেন, এই রঘু, জ্যোতিবাবু একটা ফোন নম্বর দিলেন। মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সির। তাদের কাছে জানতে হবে, কখন আসবে। তুমি এসে ফোন করে দেখো ভাই।
করেন-না ফোন, রঘু ঘোষ রাস্তার ওপর থেকেই বলে।
ও-সব মিলিটারির ব্যাপারস্যাপার ভাই, তুমি করলে করো, না করলে ছেড়ে দাও, তোক ভাসছে ত ভাসুক, ম্যানেজারবাবু জানলার পর্দা ফেলে দিয়ে আবার শুয়ে পড়েন।
আপনাকে নিয়ে যে কী হবে, একটা ফোন করতে এত ভয় পান- বলতে বলতে রঘু ঘোষ ম্যানেজারের বাংলোর বাগানের গেট ঠেলে ঢোকে। দরজা খোলাই ছিল। ফুলবাগান থেকে বারান্দায় উঠে পর্দা ঠেলে ঘরে ঢোকে রঘু ঘোষ। ম্যানেজারবাবু যে-চৌকিটাতে শুয়েছিলেন তার পাশেই, টেবিলে ফোন। ম্যানেজারবাবুর চৌকিটাতে রঘু ঘোষ বসতেই ম্যানেজারবাবু বলেন, করো, দেখো কী বলে। আজ রবিবারে দেখবে মিলিটারিও নাই, পুলিশও নাই।
রঘু ঘোষ লাইনটা পেয়ে যায়, হেলো, হ্যাঁ, শোনেন আমি রায়পুর চা বাগান থেকে বলছি, হা, ও, হ্যাঁ, বলতে বলতে রঘু ঘোষ থেমে যায়। ম্যানেজারবাবু চোখের ওপর থেকে হাতটা নামিয়ে তাকিয়ে থাকেন। রঘু ঘোষ বলে ওঠে, আচ্ছা, আপনারা তা হলে আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন? রঘু ঘোষ আরো কিছু শুনে, আচ্ছা বলে ফোনটা রেখে দিয়ে বলে, আরে ওঠেন, ওঠেন, আধঘণ্টার মধ্যে মিলিটারির নৌকা আসবে। চলেন। জ্যোতিদা আবার ফোন করেছিলেন। ম্যানেজারবাবু বলেন, আরে, আমাকে ছেড়ে দাও, তোর্মরা ত যাচ্ছই।
রঘু ঘোষ দাঁড়িয়ে উঠে বলে, আরে চলেন ত, আপনাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
ম্যানেজারবাবু অগত্যা ওঠেন। ধুতি ওঁর পরাই ছিল। উনি আলনা থেকে শাদা ফুলশার্টটা গায়ে চড়ান আর স্যাণ্ডেলটা খুলে রবারের চটিটা পরে ছাতাটা হাতে নেন। দরজা দিয়ে বেরতে-বেরতে ম্যানেজারবাবু বলেন, এই রঘু, ঐ মিলিটারিরা এসে যদি জিজ্ঞাসা করে কে খবর দিয়েছে, কী হয়েছে, সে-সব কিন্তু ভাই তোমরা সামলিও।
