কিন্তু লোকটা চালের ওপর থেকে সুপুরি গাছে উঠলই বা কেন আর উঠলই যদি, তা হলে আবার চালে নেমে আসছে না কেন? বাঘারু চালের সঙ্গে লাগানো সুপুরি গাছটা থেকে পাশের সুপুরি গাছ ধরে সেখান থেকে যে তার গাছের মাচানে চলে গেছে সেটা এই বাধ থেকে দেখাও যায় না, বোঝাও যায় না। রবিবারের ভরদুপুরে যতই ঝড়বৃষ্টির অন্ধকার নদীর ওপরের আকাশকে আচ্ছন্ন করে রাখুক, বাঁধের এই এতগুলো লোক ত স্পষ্ট দেখতে পেল অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর একটা লোক বসে আছে,, চলাফেরা করছে, তারপর একটা সুপুরি গাছের ওপর উঠে চলে গেল, আর নামল না। সুপুরি গাছের। ওপর কেউ বসে থাকতে পারে না। আর, টিনের চালের মত এত প্রশস্ত জায়গা থাকতে হঠাৎ সে সুপরি, গাছের মাথায় উঠতেইবা যাবে কেন। আর, যদি কোনো কারণে ওঠেই, তাহলে উঠে আর ফিরে নামবে না? এই বাঁধের ওপর থেকে দেখা গেল–জ্বলজ্যান্ত একটা লোক ভেসে এসে উঠল, বেশ অনেকক্ষণ বসে থাকল, তারপর, সুপুরি গাছে উঠে হাওয়া হয়ে গেল?
সুপুরি গাছ থেকে বাঘারুর নেমে আসার সময়টা যখন সব হিশেবের বাইরে চলে যায়, আর চোখের সামনে তিস্তার জলস্রোত নতুন বেগে ফুলে উঠছে মনে হয়, তখন, গত কদিন ধরে একঘেয়ে এই ঝড়ো বাতাস, মাটির প্রায় সমান্তরাল বৃষ্টি ও আবছা আকাশের মধ্যে যেন নতুন অর্থ একটা সঞ্চারিত হতে থাকে। এই বাতাস ও এই বৃষ্টি যেমন চলছে, তেমনই চলবে–কোথাও তার কোনো বিরতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যে-জল নদী বেয়ে আসছে, তারও কোনো বিরতি নেই, যেন অনন্তকাল ধরে এই জল বয়ে আসবে। প্রতিদিনের যে-মানচিত্রের ভেতর এই নদীর বয়ে যাওয়া সেই মানচিত্রটি এমন ভাবে বদলে গেছে, যে এখন আর কোনো বদলও চেনা যাচ্ছে না। আর-মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রাত্রি আসবে। সেই রাত্রিতেও এই ঝড় বইবে, এই বৃষ্টিবাতাস ভেজাবে, নদীর এই জল বাড়তে থাকবে। অথচ একটা মানুষকে সামনে ডুবে থাকা চরের একটা জেগে থাকা চালে দেখা গেল, আর সে সুপুরি গাছ বেয়ে উঠে আর নামল না–এমন একটা ঘটনাকে মেনে নিতে হচ্ছে, এতগুলো মানুষকে এক সঙ্গে মেনে নিতে হচ্ছে? তিস্তার এমন বন্যায় কোথাও কোনো গাছের মাথায় একা-একা বাঁচতে বাঁচতে কেউ-কেউ কখনো কখনো এমন কোনো-কোনো দৃশ্য দেখে থাকতে পারে। কিন্তু, এখানে রাত জেগে, রেড়িয়ে শুনে, ফোন:করে, পাহাড়ের জলের হিশেব কষে, চর থেকে যে-মানুষজন বাধে গরুবাছুর ঘরসংসার নিয়ে এসে উঠেছে তাদের সবার পক্ষে ত এটা মেনে নেয়া শক্ত। কারণ, এমন একটা ঘটনা মেনে নিলে, বুঝতে হবে, এই বন্যাটা স্বাভাবিক বন্যা নয়, এই তিস্তাও রোজকার তিস্তা নয়–কোনো দৈবী খেলা চলছে এই বন্যায়, জল আর হাওয়ায়। যে-মানুষটা চোখের সামনে ঐ টিনের চালের ওপর ছিল, সে টিনের চাল থেকে উধাও হয়ে যাবে–এমন ঘটনা দেখলেও মেনে নেয়া যায় না।
বাঘারুর অন্তর্ধান এই বাঁধের লোকজনের মধ্যে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। আর দেখতে-দেখতে এমন লোকের সংখ্যাই বেশি হয়ে যায় যারা বাঘারুকে চালের ওপরও দেখে নি। তারা জিজ্ঞাসা করতে থাকে-তোরা দেখিছিলু ত? মানষিডা ছিল, না, ছি-না?
.
১৩৬. ফোনে বাঘারুউদ্ধারের আহ্বান
বেলা আড়াইটে নাগাদ বাঁধের ভিড়টা প্রায় ছোটখাট একটা হাটের ভিড়ের মত হয়ে গেল।
রায়পুর বাগানের বাবুরা, বাবুদের বাড়ির মেয়েরা, চাবাগানের কুলিকামিনরা, রংধামালি বন্দরের লোজন, রংধামালি হাটের দোকানদাররা, দল বেঁধে-ফ্লাড দেখতে এখানেই এসে ওঠে।
তিস্তা দেখার জন্যে এদের এতদূর না এলেও চলত। এমন-কি রায়পুর বাগান থেকেও ত উত্তরে বাঁধের যে-কোনো একটা জায়গায় উঠে তিস্তা দেখে নেয়া যায়। আর হাটের লোকজন ত বাঁধের পারেই। কিন্তু এখানে এলে তিস্তার ফ্লাড ও সেই ফ্লাডে ভেসে আসা এই চরের লোকজনকে একসঙ্গে দেখা যাবে–সেটা নদীর পারের এদের এতদিনে জানা হয়ে গেছে। প্রত্যেক বছরই বন্যায় রায়পুরের উল্টোদিকের এই চর যে ভাসে, তা নয়–কোন চর ভাসে, কোন চর ভাসে না, তা নির্ভর করে তিস্তার জল কোন দিক দিয়ে যাবে তার ওপর। কিন্তু যদি তিস্তা পশ্চিম পাড় ঘেঁষেই বয়, তা হলে এই চরটা ভাসবে আর চরের লোকজন এসে বাঁধের ওপর উঠবে–এটা জানা কথা।
জানা কথা হলেও ত সব সময় জানা যায় না।
আজ সকালে বাঁধ থেকে দুটো ছেলে সাইকেলে রাইপুর বাগানে গিয়ে খবর দিয়েছিল, তিস্তার বন্যায় এখন জ্যান্ত মানুষ ভেসে আসতে শুরু করেছে; এসে, তাদের ডোবাচরের গাছগাছালি ও টিনের ওপর আটকে আছে; এদের রেসকু করার জন্যে যাতে মিলিটারির নৌকো আসে সে জন্যে টাউনে ডি-সিকে যেন ফোন করে দেয়া হয়। রায়পুর বাগানটি ঐ চরের লোকজনের অপরিচিত নয়। রংধামালির হাটে বাবুদের সঙ্গে মুখচেনাও আছে অনেকের। ফলে, তারা যখন এই খবর দেয়, তখন বাবুদেরও কেউ-কেউ তাদের খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করতে চায় তাদের চর কখন ভাসল, তারা কখন বাধে উঠল, কখন থেকে তিস্তার লোক ভেসে আসতে দেখেছে তারা। এ ঘটনা জেনে নিতে চায় বাবুরা–ফ্লাডের মত একটা ঘটনা আর মানুষ ভেসে আসার মত আরো বড় ঘটনা যদি তাদের হাতের নাগালে কিন্তু চোখের আড়ালেই ঘটে গিয়ে থাকে, তাহলে অন্তত এই ছেলেগুলোর মুখ থেকে তার কিছু প্রত্যক্ষ বিবরণ শুনে নেয়া উচিত।
