অমূল্যর ডাক শুনে নিতাই প্রথমে পেছনে তাকায়, তারপর সেখান থেকে অমূল্য নরেশের কাছে চলে আসে।
অমূল্য জগদীশকেও ডাকে, কাহা।
কী কস? বলে জগদীশও এগিয়ে আসে, রমণী সরকারকে ডাক।
আরে থামেন ত। কিছুর মধ্যে কিছু নাই, এর মধ্যি ডাকাডাকির কী হইল?
আপনে আইসেন না এই দিকে। কী কস্ অমূল্যা?
অমূল্য বলে, কই কি–নিতাইদা ডেপুটি কমিশনারকে একটা ফোন কইর্যা দ্যাও রায়পুর বাগান থিক্যা।
কী কব?
কবা, এইখানে দেখতাছি তিস্তা দিয়া মানুষ ভাসি আইস্যা চরের চালে বইস্যা আছে।
নিতাই একটু ভাবে। নরেশ বলে, যা নিতাই, ফোন কইরা দে, মানুষ ত সত্যি-সত্যি বইস্যা আছে।
জগদীশ বারুই কাপড়ের গিঠ থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা নিতাইকে দিয়ে বলে, যা, কইর্যাই দে ফোন।
নিতাই বিড়িটা ধরিয়ে চুপ করে টানে। অমূল্য বলে, ভাবো কী, নিতাইদা।
নরেশ নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা পায় নিতাই কী একটা ভাবছে।
না। কই কী–আমি ভাবছিলাম এ্যাইন ভোলারে নিয়্যা সাইকেল কইর্যা, নিতাই সাইকেল চড়তে জানে না, ভোলা তাকে নিয়ে যাবে, শহরে যাব রিলিফের জইন্যে। খাওয়া লাগব ত এতগিলা মানষির। এ্যাহন যদি ডেপুটি কমিশনারকে ফোন কইর্যা বলি মানুষ সব উপুর থিক্যা ভাইস্যা আসতেছে তা হালি রিলিফের কথা আর শুইনবে কেডা? সব ত তখন রেসকুতে লাইগবেনে। আমাগো কি এ্যাহন বানভাসি মানষি খুঁইজব্যার লাগব, না নিজেগার চাইল-ডাইল-গম-চিড়া জোগাড় কইরব্যার লাগব? নিতাই বিড়িটা টানতে-টানতে বলে।
কিন্তু মানুষ একখান যে ভাইস্যা আইসছে? জগদীশ স্বগতোক্তির মত বলে।
সে ত মোটে একখান মানষি, কোটত ভাসি আসছে কায় জানে, নিতাই যুক্তি খোঁজে।
.
১৩৫. বাঘারুর কমলেকামিনীতুল্য অন্তর্ধান
শেষ পর্যন্ত অবিশ্যি বোঝা যায় সমস্যাটা এমন কিছু কঠিন নয়। ঠিক হয়, ভোলাকে নিয়ে, নিতাই যেমন ভেবেছিল, তেমনি জলপাইগুড়ি শহরে যাবে রিলিফের খোঁজে। এখান থেকে তাকে পার্টি অফিসে যেতে হবে। সেখান থেকে পার্টির কোনো নেতাকে ধরে যে-অফিসারের কাছে গেলে রিলিফের ব্যবস্থা হবে তার কাছে যেতে হবে। আজ রবিবার–সুতরাং রিলিফ বললেই ত আর রিলিফ হবে না। চাল-ডাল-চিড়া-গুড় জোগাড় করতে হবে। বৃষ্টির রকমসকম অর ফ্লাড দেখে ব্যবসায়ীরা সেসব গুদামে লুকিয়ে রাখতেও পারে। তার ওপর সরকার এখন রিলিফ ঘোষণা করবে কী না সেটাও দেখতে হবে। কংগ্রেসের সরকার হলে না হয় মিছিল নিয়ে গিয়ে ঘেরাও দেয়া যেত। কিন্তু এখন ত সব বুঝেশুনে কাজ করতে হয়। রিলিফ একবার দেয়া শুরু করলে ত সব জায়গাতেই দিতে হবে। শহরে গেলে ফ্লাডের খবরও কিছু পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং নিতাই শহরেই যাক–আজ না হলেও, কাল অন্তত রিলিফ পাওয়া যাবে।
নিতাইয়ের চরের যারা এই বাধে উঠেছে তারা ত আগে থাকতে সাবধান হয়েই উঠতে পেরেছে। ফ্লাড আসার আগেই তারা সব কিছু নিয়ে আসতে পেরেছে–ফলে অবস্থা এমন না যে সরকারি চালডাল না-পেলে না-খেয়ে থাকতে হবে। যার যা সংসার বাঁধের ওপর সেই সংসারই বহাল আছে। সকাল থেকে বাঁধের পশ্চিম চালে বাতাস থেকে আগুন বাঁচিয়ে রান্নাটান্নার কাজ শুরুও হয়েছে। তবু ফ্লাড হলে, বাঁধে উঠতে হয়, বাধে উঠলে রিলিফ চাইতে হয়। যে কদিনের রিলিফ পাওয়া যায়, সে কদিনেরই লাভ।
কিন্তু সেই অনির্দিষ্ট রিলিফের চাইতে এই চোখের সামনে অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর বসে থাকা মানুষটি অনেক বেশি কাছের। লোকটিকে প্রথম দেখার পর নদীর স্রোতে যে আরো মানুষ খোঁজা হচ্ছিল, তাতে এখন আর কেউ ব্যস্ত নেই। কিন্তু অন্তত একটা মানুষও ত সারা রাত ধরে ভেসে এসে এই চালে উঠে বসে আছে! তা হলে ওপরে কোথাও কোনো বড় রকমের ভাঙন হয়েছে। সেই কথাটি এই লোকটির মুখ থেকে জানা দরকার। তাই দুই জনকে সাইকেল দিয়ে রায়পুর বাগানের ম্যানেজারবাবুর কাছে পাঠানো হল–ম্যানেজারবাবু যেখানে যেখানে ফোন করার ফোন করে জানাক যে রায়পুরে সামনের বাঁধের উল্টোদিকের চরে একটা মানুষ, জ্যান্ত মানুষ, ভেসে এসে একটা টিনের চালের ওপর বসে আছে–তাকে রেসকু করা এখনই দরকার। ম্যানেজারবাবুই ভাল বুঝবেন, রবিবার দিন কোথাও ফোন করলে কী কাজ হবে।
বাঘারুকে নিয়ে যখন বাঁধের ওপর এই সব নানারকম আলাপ-আলোচনা চলছে, তখন সে এই বাঁধের সামনে আরো বেশি করে একটা দৃশ্য হয়ে যায়। বাঁধের লোকজনের সামনে এখন তিস্তার বন্যা মাপা ছাড়া বাঘারুকে দেখাটাই একটা বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে, যেন, তিস্তা দিয়ে কী বন্যা এখন আসছে সেটা তিস্তার জল দেখে যতটা বোঝা যাবে, তার চাইতে অনেক বেশি বোঝা যাবে বাঘারুকে দেখে।
বাঁধ থেকে বাঘারুকে যতটা দেখা যাচ্ছিল, নদীর ভেতর চালের ওপর থেকে বাঘারু যেন বাধটাকে ততটা ভাল করে দেখতে পাচ্ছিল না। বাঘারুর কাছে বাধটা একটা বড় দৃশ্য–যেমন তিস্তাটা একটা বড় দৃশ্য। সেখানে কোনো একটা বিশেষ কিছু ত আর বাঘারু দেখতে পাচ্ছে না। অতগুলি মানুষের নড়াচড়া, কিছু রং, বাঘারু দেখতে পাচ্ছিল বটে, কিন্তু তার বদলে বাঁধের মানুষজনও বাঘারুকে পুরোটাই দেখতে পাচ্ছিল।
তাই বাঘারু যখন চালের ওপর থেকে উঠে সুপুরি গাছে চড়ে, তখন অশ্বিনী রায় নিজের মনেই বলতে থাকে–গেইল, গেইল, মোর তামান গুয়াবাড়িটা গেইল। অশ্বিনী রায় চিৎকার করে বলে নি, কিন্তু এই একটা কথাই ঘুরে-ঘুরে সবাইকে বলে যেতে থাকে, সে নিজে ভাল করে দেখতেও পাচ্ছে না। বাঁধের অন্য সকলে ততক্ষণে এইটুকু বৈচিত্র্যে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে যে লোকটি বন্যার ঐ নদীর মধ্যে এক টুকরো চালের ওপর থেকে সুপুরি গাছে উঠে গেছে এবং উঠে যাওয়ার পর আর নামছে না। এই উত্তেজনার মাঝখানে কেউ একজন অশ্বিনী রায়কে ধমকেও ওঠে, তোমরালার গুয়াবাড়িখান কি ফ্লাডত ভাসি গেইছে, না ঐ মানুষটা খাইছে? এই এক ধমকেই অশ্বিনী রায় চুপ করে যায়।
