তিস্তার এই জলপ্রান্তরে এখন কোনো কিছু দাঁড়িয়ে নেই, নিজের দিকচিহ্নগুলো উপড়ে ফেলেছে তিস্তা, এখন সে সব তিস্তার জলের অংশ। ঘরের চাল, গাছ, সব ভেসে যাচ্ছে। কচুরিপানার মত সবুজের আভাস দিয়ে ধূসর জলে চকিতে ভেসে যায় ফরেস্টের গাছ। ওপরে কোথাও তিস্তা কোনো ফরেস্টের ভেতর ঢুকে পড়েছে। তা হলে তিস্তা কি নতুন কোনো ফাঁক পেয়ে গেছে? সেখান দিয়ে এই জল অনেকটা বয়ে যেতে পারবে? তা হলে এই ভাটিতে জল পাড় না-ভাঙতেও পারে? নাকি ঐ ওপর থেকেই তিস্তা সব পড়াতে-ওপড়াতে আসছে? কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ত জলে ফরেস্টের গাছ দেখা যায় নি! রাতে কখন শুরু হল–এই ফরেস্ট-উৎপাটন?
.
১৩৪. কমলেকামিনীদর্শনতুল্য চালে বাঘারুদর্শন
এরকম অবস্থায় রায়পুর রংধামালির বাঁধের ওপর থেকে দেখা গেল নিতাইদের চরের একটা টিনের চালের ওপর একটা লোক এদিকে মুখ করে বসে আছে। ঐ চালটা অশ্বিনী রায়ের বাড়ি। বাঘারু তার গাছের বহর নিয়ে যখন ঐ চরে ঢুকেছিল সেটা কারো চোখে পড়েনি-চোখে পড়ার কথাও নয়। সকাল থেকেই ত মাঝনদী দিয়ে ফরেস্টের গাছ ভেসে যাচ্ছে। বাঘারু তার গাছগুলোর ভেতরে যে-ভাবে মাচানে বসে ছিল, গাছগুলো নিয়ে যেভাবে চরে ঢুকল, সুপুরি গাছে যে-ভাবে গাছগুলোকে বাধল–সে সব এই রায়পুর-রংধামালির বাঁধের ওপর থেকে দেখা যেত। কিন্তু কেউই ত সে রকম ভাবে ওদিকে তাকিয়ে থাকে নি। বরং তিস্তা আরো কত নতুন-নতুন দিকে ছড়িয়েছে সে-সব আঁচ করাটা ছিল দরকারী। কিন্তু লোকটা যখন অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর পা ছড়িয়ে বসে এদিকেই তাকিয়ে থাকে তখন সেই লোকটা আর বাধটার মাঝখানে কোনো বাধা থাকে না। তাকে দেখতেই হয়–এই বাঁধের ওপর থেকে সবাইকে এক সঙ্গেই দেখতে হয়। আর দেখামাত্রই কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, মানষি ভাসি যাছে, মানষি ভাসি যাছে।
এই কথাটা ভয়ঙ্কর। তিস্তা তার পাড়ের ফরেস্ট উপড়ে আনছে–সেটা বোঝা যায়। কত জায়গাতেই ত তিস্তা আর ফরেস্ট পাশাপাশি, গায়ে গা লাগানো। সেখানে ফরেস্টের দু-চারটে ব্লক এমন ফ্লাডে ভাসতেই পারে। কিন্তু গাছ নয়, মানুষ ভেসে আসছে, মানে ওপরের কোথাও কাল রাতে সকলের অজান্তে তিস্তা টাড়িতে গায়ে ঢুকে গেছে, বস্তি ভাসিয়ে দিয়েছে। মানে, ওপরে কোথাও আটষট্টি ঘটে গেছে। নিশ্চয়ই এমন কোথাও ঘটেছে, যেখানকার মানুষ এমন ঘটবে ভাবে নি। নইলে মানুষ ভাসবে কেন? কিন্তু চোখের সামনে ত এই দেখাই যাচ্ছে, আপাদমস্তক একটা মানুষ তিস্তার জলে ভেসে এসে অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর বসে আছে।
বাঁধের লোকজন ব্রাঘারুর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে তিস্তা ধরে উত্তরে তাকায়–আরো মানুষ ভেসে আসছে কিনা দেখতে। মানুষ ভাসলে ত আর একটা মানুষ ভাসতে পারে না। কিন্তু এ মানুষটিকে যেমন ভাসতে দেখা যায় নি, একবারেই অশ্বিনী রায়ের চালে দেখা গেছে–তেমনি অন্য মানুষদেরও হয়ত কেবল তখনই দেখা যাবে যখন তারা এরকম কোনো গাছের মাথায় বা চালের মাথায় উঠবে।
কিন্তু তার ভেতরই ছোটদের মধ্যে কেউ চিৎকার করে ওঠে, ঐ একখান ভাসি আসিছে, ঐ একখান।
কোটত কোটত?
নিতাই চিৎকার করে ওঠে, কেডা দেখছে রে? কায় দেখিছে? দেখা।
জগদীশ বারুই নিজের কপালের ওপর বা হাত দিয়ে চেঁচায়, কেডা দেখলিরে? কয়ডা মানুষ? বেটাছেলে না মেয়েছেলে?
জগদীশের কথায় কেউ-কেউ হেসে ওঠে। কে একজন বলেও, আরে আপনার সেই মানাবাড়ির মাগিটাই ত ভাইস্যা আইসছে। এহন সামলান গিয়া।
জগদীশ রাগ করার সময় পায় না কিন্তু তার ছানিপড়া চোখেও নিবিষ্টভাবে দেখতে চায়। নিতাই আবার চিৎকার করে, কেডা দেখলি রে? দেখা।
ছোটদেরই আর-একজন কেউ বলে, ঐ ত, আরে ঐ ত, ঐ যে, মাথাখান দেখা যায়। এই পাকে, এই পাকে। বাঁ হাত দিয়ে সে দিক বোঝায়।
সকলেই চুপচাপ খুঁজে বের করতে চায়। একজন বলেও, হয়। মাথোখান ডুবিছে আর ভাসিছে, ডুবিছে আর ভাসিছে।
নরেশ পেছন থেকে বলে, আরে, কিছু দ্যাখব্যারই পাই না, তুরা এহেবারে ডোবা ভাসা শুধধ্যা দেইখ্যা ফেললি?
নিতাই হঠাৎ হাত তুলে বলে, খাড়া, খাড়া, এই কুনটা ডুবে-ভাসেরে, এইডা? এই যে ভাসি যায়, এইডা? নিতাই তার আঙুলটা দিয়ে নদীর ভেতরের একটা জায়গা দেখায়।
একটা অনির্দিষ্ট গলায় অনিশ্চিত জবাব আসে, তাই ত, ঐডাই
নিতাই নিজের সন্দেহটা আরো জোর দিয়ে জানায়, ঐডাই ত?
এবার কেউ জবাব দেয় না। নিতাই একটু পরে বলে, মানষি না, কাঠ। কাঠ। কিন্তু নিতাইয়ের কথায় কোনো জোর ছিল না। বলার পরও সে দেখে যায়। এবং যা দেখছিল সেটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে যখন তখন বলে ওঠে, কাঠই ত মনে হইল! তগ কি মানষি মনে হইল রে?
নিতাই কাকে জিজ্ঞাসা করল, সে নিজেই জানে না। কিন্তু বাধসুষ্ঠু সবাই আবার নতুন করে খোঁজে, নদীর সেই ভেতরের জল দিয়ে কোনো মানুষ ভেসে যায় কি না! নিতাইও যেখানে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।
নরেশ পেছনে ছিল। সে কিছুই দেখতে পায় নি, কোনো সন্দেহও প্রকাশ করতে পারে নি। সে হঠাৎ পেছন থেকে নিতাইকে ডেকে বলে, এ নিতাই। অশ্বিনীদার চালের উপর যেইডা বসি আছে, সেইডা ত মানষি, নাকি ঐটাও কাঠ?
তখন সবাই আবার বাঘারুর দিকে তাকায়। বাধ থেকে বাচ্চারা চিৎকার করে হাত নাড়ে। কিন্তু বাঘারু তার কোনো সাড়া দেয় না। বাচ্চারা চিৎকার বাড়ায়। তাতেও বাঘারু সাড়া দেয় না বা হাত নাড়ায় না। অমূল্য ধমক দিয়ে ওঠে, থামা ত চিল্লানি, পাশের মানুষের কথা শুনা যায় না এমন হাওয়া আর ওরা চিল্লাবার ধরছে। তারপর গলা নামিয়ে ডাকে, নিতাইদা।
