পুব পার থেকে পশ্চিম পারের, বা, পশ্চিম পার থেকে পুব পারের তিস্তা দেখার বা বন্যা মাপার প্রধান। নিরিখ হচ্ছে তিস্তার মাঝখানের কোন-কোন চর অদৃশ্য হয়ে গেল সেই হিশেব : নদীর এক পার থেকে অন্য পারের দৃশ্য ত সারা বছর দেখতে-দেখতে মানুষের চেনা হয়ে যায়। দোমোহনির পুরনো ডিসট্যান্ট সিগন্যাল, নিতাইদের চরের কোনো বড় গাছ, জলপাইগুড়ির কমিশনারের বাড়ির পেছনের অর্জুন গাছ, বার্নেশের সামনে ভামনি বনের চরটা, কাশিয়াবাড়ির কাছে নদীর তিনমুখো ধারার মাঝে-মাঝেই চিকচিকে বালির চরগুলো–এই সবই মোটামুটি ভাবে নদীটার সীমা সরহদ্দ ঠিক করে রাখে। রবিবার সকালে সূর্য উঠতে না উঠতে দেখা গেল–এই সব সীমাচিহ্নই লোপাট, যতদূর চোখ যায় তিস্তার ঘোলাটে জল ছড়িয়ে গেছে।
রাতের অন্ধকারে জলটা ছড়াল আর ভোরে সূর্যের আলোতে সেটা সকলের চাক্ষুষ হল–তা ত নয়। এখন শুক্লপক্ষ চলছে, সুতরাং রাতে তত অন্ধকার ছিল না। কিন্তু সেই যে বৃহস্পতিবার থেকে আকাশের ঘোলাটে মেঘ জল-ডাঙা মিলিয়ে চরাচরকে ঢেকে দিয়েছে, আর ঝড়ের মত বাতাস বৃষ্টির সঙ্গে বয়েই চলেছে–তার ভেতর দিয়ে কতটুকু আলো আর গলতে পারে? তবু, সারা রাতই রাতের শেষ প্রহরের মত একটা আবছা ভাব ছড়িয়ে ছিল। সেই আবছায়ায় অবিশ্যি আরো বেশি মনে হতে থাকে যে এমন-কি আকাশের ভেতরেও তিস্তার বান ঢুকে গেছে। ভোর হওয়ার আগে সেই আবছা আলোটা মুছে যায়। চঁদ ডোবা আর সূর্য ওঠার মাঝখানে কিছু সময়ের একটা অন্ধকার বিরতি ছিল। সেই বিরতিটা সূর্যোদয়ে একেবারে কাটে তা না, কারণ, ঐ ঘোলাটে আকাশের কোন তল্লাটে সূর্য উঠেছে। তার হদিশ পাওয়া ভার। কিন্তু সেই অন্ধকারটা কাটতে না কাটতেই ধীরে ধীরে যেন বোঝা যায় সারা রাতের মধ্যে তিস্তার জল একটুও কমে নি। তারপর আলো আর-একটু স্পষ্ট হলে বোঝা গেল, জল পাড় ছাপিয়ে উঠে এসেছে। নিজের পাড়ে তিস্তার জলের বাড় দেখে তখনো আশা থাকে, জল তাহলে এদিকেই গড়িয়েছে বেশি, অন্য পাড় তাহলে এখনো ভাসে নি। ঘোলা আলো আর-একটু বাড়তে না বাড়তেই দেখা যায়, শনিবার সন্ধ্যায় চিরকাল দেখা যেসব গাছগাছালি, বা ডিসট্যান্ট সিগন্যাল, বা বালি, বা বাক একে-একে অদৃশ্য হতে-হতে তিস্তার অপর পারটাকে মুছে দিল সেগুলোর কিছুই আর ভোরের আলোতেও দেখা যাচ্ছে না। যেন রাতের আবছা আলোতে তিস্তার দুই পাড় তিস্তার বন্যায় ভেসে-ভেসে নতুন কোনো জায়গায় এসে পৌঁছেছে-নদীর মাঝখান থেকে নতুন সেই দুটো পাড়। দেখতে হচ্ছে। যেন, কেউ আর নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে নেই-সকলেরই সামনে-পেছনে নদীর দুই পাড়। আলো আরো একটু বাড়লে প্রথম দেখার সেই বিভ্রমটুকুও কেটে যায় আর চোখের হিশেব দিয়ে তখন মাপতে-জুগতে হয়-তিস্তা কোন পারে কোথায় কদ্দূর ঢুকল। রাতের আবছায়ায় তিস্তার এই এমন আক্রমণের ভেতর যেন কোথাও অবিশ্বস্ততা আছে, বা, নিজেদের অপ্রস্তুতির ভেতর আছে অসহায় আত্মসমর্পণের অনিবার্যতা–সেটা কেটে যায় আলো আরো একটু বাড়তেই। তখন বোঝ যায়–আকাশ যেমন ছিল সেই বৃহস্পতিবার থেকে, রবিবার সকালেও তেমনই আছে, বৃষ্টি যেমন ছিল সেই বৃহস্পতিবার থেকে, রবিবার সকালে তেমনই। আর তখনই দিনের আলোয় এই হিশেবটা কঠিন সত্য হয়ে ওঠে–জলও ত তা হলে যেমন সেই বৃহস্পতিবার থেকে বাড়ছে, তেমনি বাড়তে থাকবে। আর তেমনি বাড়তে থাকলে কী হবে?
এই হিসেবনিকেশের একটা স্তরপরম্পরা আছে। তিস্তা যদি সেই বৃহস্পতিবার থেকে এই একই বাতাস আর একই বৃষ্টির সঙ্গে একই বেগে বেড়ে থাকে, তা হলেও গত তিন দিনের সেই বাড়া আর এখন এই রবিবারের বাড়ার অর্থ এক নয়। বৃহস্পতিবার থেকে তিস্তা বাড়ছিল প্রথমে নিজের খাতটা ভরে ফেলে, তারপর সেই খাতের মধ্যে ছোটখাট নানা চরজমি ভাসিয়ে, তারপর আরো একটু চর ভেঙে, কখনো পুব কখনো পশ্চিম পাড়ে ছোটখাট ভাঙচুর ঘটিয়ে। তারপর শুক্রবার রাত্রি থেকেই ত শুরু হয়ে গেছে–পুরনো কায়েম চরও ভাসানো। কিন্তু তারও একটা হিশেব ছিল। তিস্তার জলের তলার মাটির ঢালের হিশেব। সে হিশেবের কোনো মাথামুণ্ডু নেই। কারণ কেউ কি জানে, কয়েক বছর ধরে কোন জায়গায় পাহাড়ের বালি, পাথর, মাটি জমিয়ে তিস্তা তার তলদেশকে উঁচু করে ফেলেছে কতটা? বা, পাহাড়ের খাজে-খাজে যেসব হ্রদে জল জমে থাকে সেগুলো ভেঙেচুরে তিস্তায় বৃষ্টির জল ছাড়াও বাড়তি জল ঢুকেছে কতটা? কিন্তু মাথামুণ্ড না থাকলেও ত সবাই একটা আন্দাজ করতে চায়। সেই আন্দাজের, কাল শনিবারের সন্ধ্যা পর্যন্তও, একটা মানে ছিল। এমনকি কাল রাতেও ছিল। তখন ত আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না যে তিস্তা সব আন্দাজ কেমন ভাসিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আজ রবিবার ভোর হতে না-হতেই, তিস্তার জলপ্রান্তর ঐ নিচু আকাশের তলায় দৃশ্য হতে না-হতেই বোঝা গেল, তিস্তা আর-কোনো হিশেবের মধ্যে নেই, কোনো আন্দাজ দিয়ে আর বোঝা যাবে না জল কী ভাবে বাড়বে, কী ভাবে ছড়াবে। নদী এখনো দু পাড়ের বাঁধের অনেক নীচে, বোল্ডারের জালের অনেক দূরে। বোন্ডারের জালের নীচে, পাড়ে, যদিও জল এসেছে, তাহলেও বোঝা যায়, ওটা স্রোতের ধাক্কায় আসা জল। ঐ জায়গাগুলো এখনো বানের জলে ভরে নি। কিন্তু বানের জল ঢোকার জন্যে ত ঐ জায়গাগুলোই মাত্র এখনো বাকি আছে। পাড়ের ঐ জায়গাতেও যদি জল ঢুকে যায়, তা হলে ত এখন বাকি থাকবে বোল্ডারে জাল। ঐ বাধা পাথরের সঙ্গে এখন স্রোতের ধাক্কাধাক্কি শুরু হবে। কিন্তু তার আগেই ত কোথাও, কোনো নিচু পাড়ে বন্যার জল ঢুকে বোল্ডারের ফাঁকগুলো দিয়ে বাঁধের গোড়ায় চলে যেতে পারে। এই এত জলের এত স্রোত কোথাও যদি বাধে এক চুল ভাঙন ধরাতে পারে তা হলে সে বাধ রক্ষা করে সাধ্য কার? সেরকমই ত হয়েছিল, আটষট্টিতে। সেই রবিবারের সকালে তিস্তার ওপর আটষট্টি সালের স্মৃতি যেন বাস্তব হয়ে উঠল।
