এখনো ত জল বাড়ছেই, হাওয়া বাড়ছেই। চারদিকে কোথাও কোনো ইশারা নেই, যা দেখে আন্দাজ করা যায় যে বন্যাটা এবার কমবে। কিন্তু এখন আন্দাজ পাওয়া না গেলেও বন্যা ত একদিন কমবেই। তখন, জলের সঙ্গে-সঙ্গে বাঘারু তার গাছগুলো নিয়েও নামতে থাকবে–এই জলের তলায় কার ঘরবাড়ির আঙিনায় কে জানে? জল নামলেও তখন বাঘারুকে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে–গয়ানাথ কবে তাকে খুঁজতে পাবে তার অপেক্ষায়।
কিন্তু তখন, এই চারপাশের দৃশ্যও ত বদলে যাবে। এখন ত মনে হচ্ছে চারদিকে শুধু জল। এর একটা সুবিধে আছে নানা রকম জিনিশে চোখ আটকে যায় না। কিন্তু তখন ত ডাঙা জেগে উঠবে। ডাঙা মানেই জমি। জমি মানেই আল। আল মানেই মালিক। মালিক মানেই বাড়ি। বাড়ি মানেই টাড়ি। টাড়ি মানেই গাও-গঞ্জ-শহর। তখন চারদিকে কত জিনিশ, কত উঁচুনিচু, কত বাকাচোরা, কত সোজাউল্টো। সে ত রোজ যেমন থাকা তেমনি থাকা। এখন ত রোজকার মতন থাকা না। সেই রোজকার দিনটা এখন জলে ঢাকা পড়ে আছে। জলের কোনো মালিক নেই। তাই জলের কোনো আল নেই। আল থাকলেও বাঘারুর কিছু যায়-আসে না, আল না থাকলেও কিছু যায়-আসে না। কিন্তু এখন এই টিনের চালের ওপর বসে আলহীন জল দেখতে খুব ভাল লাগছে। আরো ভাল লাগছে, এই কথা ভাবতে যে এ-জলে কেউ আল বাধতেও পারবে না। বাঘারুর তাই বেশ মজা লাগে এই ভেজা টিনের চালের মাথায় বসে সামনের একটা জলের ওপারে পশ্চিম পাড়ের বাঁধের লোজন দেখতে।
কিন্তু এটাও একটা টিনের চাল। এখানে ত একটা সুপুরি বাগান। আরো কয়েকটা টিনের চাল, আরো কিছু গাছগাছালি দেখা যাচ্ছে। আবার, এখান থেকে তাকিয়েই বোঝা যায় এরকম কিছু চাল, কিছু গাছগাছালির পর তিস্তার বন্যা তিস্তার বন্যার মতই বয়ে চলে। সেই দূরের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার এই দুটো-চারটে গাছগাছালি টিনের চালের ওপর চোখ ফিরিয়ে আনলে মনে হয়–এগুলোও যেন তিস্তার বন্যায় ভাসছে, যেমন গাছ নিয়ে ভাসতে-ভাসতে বাঘারু এসে গেছে। বাঘারু যে-জলটা অন্ধকারে, আবছা আলোয়, হাওয়ায়, বৃষ্টিতে পেরিয়ে এসেছে, আর এই চালে আর সুপুরি বাগানে আটকে না গেলে সামনের ঐ জলের ধারালো যে-স্রোতে সে এখনো ভেসে যেত-সেই দুইয়ের মাঝখানে তার গাছের বহরকে বেঁধে রেখে এই টিনের চালের ওপর বসে এটা বুঝতে পারে এখানে বাড়ি ছিল, যেমন মানুষের থাকে, এখানে সুপুরি বাগান, খেত, ধানবাড়ি, গোয়ালিয়া ছিল যেমন মানুষের গা-গঞ্জে থাকে। এই জল, এই বন্যা, সেই বাড়িস্টাড়ি গা-গঞ্জকে ঢেকে দিয়েছে শুধু। বাঘারুর ত কোনো বাড়ি নেই, টাড়ি নেই, বাঘারুর কোনো গাছ নেই, আল নেই। বাড়ি আছে গয়ানাথের, টাড়ি আছে। গয়ানাথের, ফরেস্টের গাছ আছে গয়ানাথের, ফরেস্টে গরুমোষের বাথান আছে গয়ানাথের। এই যেখানে সে বসে আছে সেখানেও জলের তলায় গয়ানাথের বাড়ি, টাড়ি, বাগান, ফরেস্ট, ধানবাড়ি, গোয়ালবাড়ি, গরু মোেষ আছে। জল যখন নেমে যাবে–গয়ানাথ তাকে খুঁজে বের করবে, তার ফরেস্টের চারটি গাছের হিশেবনিকেশ বুঝে নেবে, গয়ানাথের বাঘারু আবার গয়ানাথের কাছে ফিরে যাবে। জল যখন নেমে যাবে–এই এখানকার জলের তলায় জমি জেগে উঠবে, বাড়িটাড়ি জেগে উঠবে, ফরেস্ট জেগে উঠবে। এখন এখানে এই ভেজা টিনের চালের ওপর বৃষ্টি আর হাওয়ার মধ্যে বসে ঘালাটে জলস্রোতের ওপর দিয়ে ঐ পাড়ের মানুষজন, গরু মোষের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বাঘারু যেন ভৈবে ফেলতে চায়–এই জলটাই থাকুক, সব আলবাড়িটাড়ি-ফরেস্ট-গরুবাছুর ডোবানো এই জলটাই থাকুক, যে-জলটা দিয়ে বাঘারু ভেসে এল সেরকম জল দিয়েই বাঘারু আরো ভেসে যাক, এতই ভাসুক যে গয়ানাথ আর আসিন্দির আর তাকে খুঁজে পাবার সুযোগ পাবে না।
বাঘারু যে ঠিক এরকমই ভেবে ফেলতে পারে, তা নয়। ঠিক এতটা এরকম করে ভেবে ফেলার মত অভ্যেসও তার নেই। সে ত ভাবতে পারে কেবল তার শরীর দিয়ে। সেই শরীরেই আসলে বাঘারু এই জলের মধ্যে বসে থাকতে ক্লান্ত বোধ করে না, একাকিত্বও বোধ করে না বরং তার শরীরের ভেতরে কোথাও যেন ভবিষ্যতের এক কুণ্ঠা আগে থাকতেই দানা পাকিয়ে ওঠে যে আবার তাকে কোনো এক দিন এই চাল থেকে মাটিতে নামতে হবে। তার শরীরের ভেতরেই বাঘারু এই মাটিঢাকা, বাড়িটাড়িঢাকা, জমিজিরেত-সুপুরি বাগান-গাছগাছালিঢাকা বন্যার জলের সঙ্গে আত্মীয়তা বোধ করে ফেলে আর সেই আত্মীয়তাবোধ থেকেই জলের তলার মাটি থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাও তার শরীরে এসে যায়।
জলে ভেসে যাওয়া থামতেই, আর এই এখানে এসে নিজেকে বেঁধে ফেলতেই, বাঘারুর শরীর জানান দেয়। তার খিদে পাচ্ছে। বাঘারুর ত এমনি খিদে পাওয়ার অভ্যেস নেই। গয়ানাথের বাড়িতে যখন তাকে খেতে দেয়, তখন তার খিদের একটা অংশ মেটে, কিন্তু এখানে ত বাঘারুকে কেউ ভাত দেবে না। বাঘারু এই সব গাছগাছালির মাথার দিকে তাকায়–সেখান থেকে কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে। একটা সুপুরি গাছে পাকা সুপুরি আছে, অন্য গাছগুলোতেও কাঁচা সুপুরির গোছা। কিন্তু বাঘারুর খিদে কি এত সুপুরিতেও মিটবে?
.
১৩৩. জলের দিগবিদিক
রবিবার ভোর হতে না-হতেই রংধামালি রায়পুর চা বাগানের বাধ থেকে দেখা যায়, পুবপারে তিস্তা একের পর এক গঁ ও বন্দর ছাড়িয়ে প্রায় ময়নাগুড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তার মানে, দোমোহনি ততক্ষণে তিস্তার প্রায় মাঝখানে। জলপাইগুড়ি শহরের কাছারির বাধ থেকে দেখা যায় তিস্তা সেই বানেশ বন্দর ছাড়িয়ে ল্যাটার্যাল রোডের কাছাকাছি চলে গেছে। আবার, তিস্তার পুব পারের বাকালি-পদমতী, বা আরো ভাটির জোড়পাকড়ি থেকে দেখা যায় বুড়ি তিস্তার খাতের মধ্যে তিস্তা ঢুকে যাচ্ছে।
