বাঘারু তার মাচান থেকে শালগাছটারই নীচের ডালে নামে, সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে সামনের একটা উঁচু ডাল ধরে ঝুলে নীচের একটা ডালে নামার পর বোঝে এটা পাশের সিসু গাছটা। সেই ডালটা ধরে মাথাটা নুইয়ে তরতর করে খানিকটা এগিয়ে যাবার পর বাঘারু আবার ডান দিকের একটা ডালে, শালগাছের, পা দেয়। শালগাছের ডালগুলো এত শক্ত যে বাঘারুর ওজনে জলে তলিয়ে যেতে পারে কিন্তু নিজে বেঁকে না। সেই ডালটা ধরে হেঁটে, আরো তলায় নেমে যেতে, বাঘারুকে সামনে নুয়ে সিসু গাছের ডালের ওপর হাত রাখতে হয়। শালের ডালটা ডুবে জল তার পা ছাপিয়ে ওঠে। বাঘারু এবার শালগাছটা ছেড়ে দিয়ে সিসু গাছটার তলার দিকের একটা মোটা ডাল ধরে জলে নামে। ডালটা জলের গায়ে লেগে ছিল। বাঘারু ঝুলে পড়ায় আরো তলে ডুবতে থাকে। বাঘারুর শরীরটা স্রোতের ধাক্কায় ডালটার সমান্তরালে ভাসে। সমান্তরাল সেই শরীরে সে ডালটা ধরে ধরে আরো তলার দিকে নামে। নেমে গিয়ে একেবারে তলায় যে-গাছটা আড়াআড়ি ছিল তার সামনে পড়ে। এই গাছটা সে এতক্ষণ চিনতে পারে নি। এখন সিসুগাছটার ডাল ছেড়ে ঐ গাছটার যে-কোনো একটা ডাল ধরার জন্যে হাত বাড়িয়েই চেনে, চাপা গাছ।-যে-ডালটাতে তার হাত পড়েছিল সেটা নেহাৎই পাতলাধরতে না-ধরতেই বাঘারু জলের তলায় ডুবে যায়। ডুবতে-ডুবতেই হাত বাড়িয়ে আর-একটা ডাল ধরে মাথাটা তোলে। তার মাথা অনেকগুলো পাতলা ডালের ভেতর আটকে গেলে বাঘারু আবার ডুব দেয়। জলের তলাতেও তাকে আটকে দেয়ার মত আগডাল ছিল কিন্তু বাঘারু দুই হাতে সেগুলো সরিয়ে ও ভেঙে চাপা গাছটাকে পেরিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। এটা গাছটার মাথার দিক-বাঘারু স্রোতের ধাক্কায় তখন চাপা গাছটার সঙ্গে লেপ্টে আছে, সে গাছটার শেকড়ের দিকে সরে যায়, তারপর গাছটার ওপর উঠে বসে। তার মাচান থেকে বাঘারু এই বন্যার স্রোতের ভেতর দিয়ে এমন ভাবে এই চাপা গাছের গোড়া পর্যন্ত চলে আসে, যেন, আসার পথটা তার প্রতিদিনের অভ্যাসে চেনা।
বাঘারু দেখে একটা পোয়ালের বাশ পেরিয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে বুঝে ফেলে সে চরটাতে ঢুকে পড়েছে। মাত্র কয়েকঘণ্টা আগে এখানে মানুষের বসতি ছিল। জলের ঠিক তলায় কোথায় কী উঁচিয়ে আছে তা বলা যায় না। বাঘারু জলে নামতে গিয়ে নামে না। কিন্তু নাইলনের ছড়ির বাণ্ডিলটা অনেকটা খুলে স্রোতের বিপরীতে প্রায় প্রস্তুত হয়ে থাকে যে একটা কোনো শক্ত গাছের ডাল পেলেও ঝুলে পড়বে। বাঘারু দেখে, একটু দূরে-দূরে দুটো-একটা টিনের চাল জেগে আছে কিন্তু সে-সব চালে পৌঁছুনো যাবে না। হঠাৎ গাছগুলো আটকে যায়। গাছের তলার জল ফুলে ওঠে। কোথাও আটকে গেছে। বাঘারু সুযোগটা নিতে চায় কিন্তু সে নড়াচড়া করলে ত বাধাটা সরেও যেতে পারে। বাঘারু কোনো রকমে একটা সরু ডাল ধরে দাঁড়িয়ে দেখে দু-তিনটে সুপুরি গাছের ভেতর গাছগুলো আটকা পড়েছে। কিন্তু স্রোতের বেগে এই চাপা গাছটাই ঘুরে সামনে চলে যাচ্ছে। বাঘারু প্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। চাপা গাছটা আর-একটু ঘুরতেই দেখে, সুপুরি গাছগুলোর পশ্চিমে একটা টিনের চাল। বাঘারু বসে পড়ে জলে তার দুই পা নামিয়ে দেয়। যেই সুপুরি গাছগুলোর কাছাকাছি আসবে সে জলে ভেসে ঐ টিনের চালে উঠবে একটা সুপুরি গাছের সঙ্গে দড়িটা পেঁচিয়ে দিয়ে। কিন্তু চাপা গাছটা আর ঘোরে না, থেমে যায়। বাঘারু কোনাকুনি জলে ঝাঁপ দিয়ে মুহূর্তে একটা সুপুরি গাছের মাথা জড়িয়ে ধরে হেলে পড়ে।
নিতাইদের চরে বাঘারু তার গাছগুলো নিয়ে থেকে যাওয়ার জায়গা পেয়ে যায়। কারো একটা সুপুরি বনে গাছগুলো আটকে গেলে জলের ওপর জেগে থাকা সুপুরি গাছের মাথায় উঠে পড়ে বাঘারু, তারপর এক সুপুরি গাছ থেকে আর এক সুপুরি গাছ করে এই টিনের চালের মাথায়। বাঘারুর পক্ষে বাছাই করা মুশকিল–গাছগুলোর ভেতরে বানানো মাচানে বসে থাকা, সুপুরি গাছের আগায় ওঠা আর এই টিনের চালে পা ছড়ানোর মধ্যে কোনটা বেশি লোভনীয়। কিন্তু এখানে ত আর তার কোনো পছন্দের ব্যাপার ছিল না। যেন এখানে আটকে যাবার জন্যেই গয়ানাথ তাকে ভাসিয়ে দিয়েছিল–গাছগুলো এমনই এখানে আটকে যায়। আর, এত বাছাবাছিরই বা কী আছে? টিনের চালে বসে থাকতে খারাপ লাগলে সুপুরি গাছের মাথায় চলে যাবে। সেখানে ঝুলে থাকতে খারাপ লাগলে আবার দোল খেয়ে গাছের মাচানে ফিরে যাবে নাইলনের ঐ দড়ি দিয়ে গাছগুলোকে এমনই প্যাচাতে-প্যাচাতে এসেছে বাঘারু যে এখান থেকে সেগুলো আর ভেসে যেতে পারবে না।
বাঘারু টিনের চালের ওপর পা ছড়িয়ে বসেছিল রায়পুর রংধামালির বাঁধের দিকে তাকিয়ে। সেই একই হাওয়া, একই বৃষ্টি, একই বন্যা অথচ এই চালের থেকে ঐ বাধটাকে কত রঙিন দেখাচ্ছে। এমন-কি মানুষজনের চলাফেরা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গরুগুলোর রঙও আবছা চিনতে পারছে বাঘারু। একটা বা দুটো মোষও আছে। মেয়েদেরও চেনা যাচ্ছে। শুধু এদের কারোরই মুখ বোঝা যাচ্ছে না। এই টিনের চালের ওপর বসে বসে শুধু জল ছাড়া ওপরের বাঁধের এই সব দৃশ্য দেখাটা ত খুব আরামের।
বাঘারুর পক্ষে কোনো দৃশ্য দেখে ক্লান্ত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ সে সব সময়ই দৃশ্যের অংশ। এই এত বনা আর এত জল দেখেও সে ক্লান্ত নয়। কিন্তু ক্লান্ত না হলেও সে ত দৃশ্যান্তর বোঝে। এখন, এই টিনের চাল থেকে ঐ বাধ একই দৃশ্যান্তরের কাজ করে যাচ্ছে। তা ছাড়া, একটা কাজও ত শেষ হল। তাকে গাছের সঙ্গে গয়ানাথ ভাসিয়ে দিয়েছিল ত কোথাও এরকম আটকে যাওয়ার জন্যেই। আটকে থাকার জন্যেও। এখন আসিন্দির জোয়াই-এর ভটভটিয়ার পেছনে বসে গয়ানাথ তাকে যখন খুঁজে পাবে তখন পাবে। বাঘারুর আর-কিছু করার নেই।
