তবু, কখনো কখনো বরং, হাওয়ার আওয়াজটা আলাদা করে সে বুঝতে পেরেছ। গাছের ডালে দাঁড়িয়ে ত তাকে হাওয়ার ঝাঁপটই সামলাতে হয়েছে। স্রোতটাকে ত সেরকম ভাবেও কখনো সামলাতে হয় নি। তাই স্রোতটা আছে, স্রোতের জন্যেই এই গাছগুলো নিয়ে সে ভাসছে, ও-সব সত্ত্বেও স্রোতটাই যেন কেমন অবান্তর হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এখন, যে-মুহূর্তে বাঘারু বুঝে ফেলে এই স্রোত তাকে সামনের ঐ চরের ভেতর নিয়ে যেতে পারে এবং ঐ চরের গাছ বা টিনের চালে সে নিজেকে গাছসহ আটকে দিতে পারে, সেই মুহূর্তে, তার পায়ের তলা থেকে জলের প্রবল শক্তি কল্লোলিত হয়ে উঠে আসে। বাঘারু তার পায়ের তলার জলরাশির দিকে তাকায় না বরং সে তাকিয়ে ছিল একটু দূরেই। সেই দূরের জল দেখেই সে আন্দাজ করতে চাইছিল যদি তাকে এই জলে ঝাঁপ দিতে হয়, তা হলে স্রোতের অনুকূলে ভেসে যেতে চাইলেও কি তার শরীর ঐ স্রোতের তীব্রতার অনুকূলতা করতে পারবে? নাকি, এ জলস্রোতের বেগের কাছে সমর্থন বা বিরোধিতার কোনো আলাদা মূল্য নেই, ভাসিয়ে নেয়ার বেগে এ স্রোত সব কিছুকেই তলিয়ে নেবে? আর,এক হতে পারে বাঘারু এই নাইলনের দড়িতে ফাস বানিয়ে তৈরি থাকল, যদি ঐ চাল আর গাছগুলোর কোনো একটার পাশ দিয়ে তাদের ভেসে যেতে হয়, তাহলে, সেই ফাসটা ছুঁড়ে দেবে। যদি ফাস আটকাল, ভাল। যদি না আটকায়, তাতেও ক্ষতি নেই। কিন্তু এই বিকল্প ভাবতে-ভাবতেই বাঘারু বোঝে সেভাবে আটকানো যাবে না। তাকে জলস্রোতের সঙ্গে একটা সংঘাতে যেতেই হবে যদি সে এই চরে নিজেকে আটকাতে চায়। কিন্তু কী ভাবে সে-সংঘাত তৈরি হবে তার কোনো আন্দাজ বাঘারু করতে পারে না, অথচ তার প্রস্তুত শরীরের সামনে ঐ গাছ আর টিনের চালগুলো ক্রমেই কাছে চলে আসছে, দ্রুত, দ্রুততর।
.
১৩২. অস্থায়ী নোঙর
বিশ বাইশ ঘন্টা আগে যে-চর থেকে নিতাইগজেননরেশরা গরুবাছুরগুলোকে বন্যার ভয়ে বাঁধে তুলেছিল, বাঘারু তার ফরেস্ট নিয়ে সেই চরের দিকেই ভেসে যাচ্ছিল। এখন, জলস্রোতে সেখানে। বসতির চিহ্ন জেগে আছে মাত্র দুটি-চারটি গাছের মাথায় আর টিনের চালে।
বাঘারু এখন সেই চরের দিকে ভেসে যেতে-যেতে দেখতে পায় রায়পুর রংধামালির বাঁধের গায়ে মানুষ আর গরুর সারি। তারা বাঘারুর দিকেই তাকিয়ে আছে কি না, বা, ওখান থেকে বাঘারুকে দেখা যায় কিনা–তার কোনো কিছুই বাঘারু বোঝে না। কিন্তু বন্যায় যে-মানুষ বাঁধের ওপর সংসার নিয়ে ভাসছে, সে নদী ছাড়া আর কোন দিকে তাকিয়ে থাকবে?
জলের ভেতর ঐ গাছের মাথা আর টিনের চাল বাঘারুকে একটা আশ্রয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল মাত্র, কিন্তু বাঁধের ওপর মানুষ আর গরুবাছুরের সারি, ত্রিপলের উড়ন্ত ছাউনি, আর প্লাস্টিকের চাদরের ওড়া দেখে বাঘারুর ভেতর নিজের অজ্ঞাতেই সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে যায়, এই চরটাতেই সে গাছগুলোসহ নিজেকে বাধবে। এটা প্রাকৃতিক ভাবেই ঘটে। এই বাতাস আর বৃষ্টি যেমন প্রাকৃতিক নিয়মে কয়েক দিন ধরে বয়ে চলেছে, এই জলস্রোত যেমন প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিদিনই এই এত জলরাশি নিয়ে এমন বয়ে চলেছে, তেমনি বাঘারু বাঁধের ওপর মানুষ আর জলের ভেতর টিনের চাল দেখে সেখানেই নিজেকে আটকানোর জন্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রায় কোনো কার্যকারণ ছাড়াই। পাড়ে, বাঁধের ওপরে মানুষ আর গরু দেখার পর বাঘারুর কাছে ঐ জলকল্লোল তুচ্ছ হয়ে যায়। সে যেমন কয়েক ঘণ্টা আগে গাজোলডোবার ফরেস্টের অন্ধকারে গয়ানাথের একটি কথায় ভাসমান গাছগুলোর ভেতর অন্ধকার জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, এখনো তেমনি অত মানুষ আর গরু দেখামাত্র সে বুঝে যায় তাকে এখানেই নামতে হবে। জলস্রোত যতই তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাক–সে এই গাছের মাথায় বা টিনের চালে নিজেকে আটকাবে।
বাঘারু সেই মুহূর্তে কিন্তু এটা ভাবে না যে সে এই চরের মধ্যে কোনো ভাবে নিজেকে আটকাতে পারলে পশ্চিম পাড়ের বাধে গিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু এতগুলো মানুষ আর গরুর এত কাছ থেকে বাঘারু এই সম্ভাব্য আশ্রয় ছেড়ে চলে যায় কী করে? এরপর তার আরো নিরাপদ ও আরো প্রচুর মানুষ জুটতে পারে কিন্তু সেই অনির্দিষ্ট আশায় বাঘারু এমন হাতের কাছের মানুষদের ছাড়ে কী করে? এখানে তার গাছ বাধলেও ত সে বাধটাকে দেখতে পাবে।
বাঘারু এত দ্রুত তার মাচান থেকে নেমে আসে আর ডাল বেয়ে-বেয়ে এই গাছগুলোর পেছন দিকে চলে যেতে থাকে যেন এমন পরিস্থিতিতে তাকে কী করতে হবে সেটা তার বহু অভিজ্ঞতায় জানা। পশু যেমন শুধু তার শারীরিক অনুভবশক্তিতে জেনে যায় তার শরীরকে অনাহত রাখতে, বাঘারু সেরকম ভাবেই যেন জেনে গেছে যে এই গাছগুলোর আগে ঝাঁপিয়ে নয়, গাছগুলোর পেছনে, গাছের ডাল ধরে জলে ভাসলেই সে হাতের কাছে কোনো কিছু পেয়ে যেতে পারে। যদি সেই কোনো কিছু না পাওয়া যায়, বা সেই কোনো কিছু থেকে তার হাত ফসকে যায়, তা হলে ত এই দড়ি ধরে স্রোতের টানেই আবার সে নিজের গাছে ভেসে ফিরে আসতে পারবে।
বাঘারু যে গাছগুলোর ডাল বেয়ে-বেয়ে পেছন দিকে যায় তাতে গাছগুলো দুলে ওঠে, পাখিগুলো আবার ডেকে-ডেকে ওড়ে কিন্তু বাঘারু এখন গাছটা উল্টে যাবে কিনা, ডালটা তার ভার বইতে পারবে কিনা এসব হিশেবনিকেশের মধ্যেই নেই। এমনকি পা হড়কে জলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তার নেই। কারণ সে ঐ পেছনের গাছ থেকে জলে নামতেই যাচ্ছে। যখন বাঘারু ডাঙা ছেড়ে এই গাছের ডাল ধরে ভেসেছে, তখন, ডালপালার সঙ্গে তার শরীরের যে-সাযুজ্য মেপে-মেপে তৈরি করেছিল, এখন সেই সাযুজ্য ভেঙে-ভেঙেই সে এই গাছগুলোর পেছন দিকে যাচ্ছে।
