বাঘারু বিহ্বল হয়ে ঘুরে সামনে যত দূর চোখ যায় তত দূর ঘোলা জলের দিকে তাকিয়েই মাচানের ওপর আবার ঘুরে পেছনে বাতাসের ভেতর পাখিগুলোর ঝরে পড়ার দিকে তাকায়। কিন্তু তখন সে আরো দূরে সরে এসেছে।
৪.২ বাঘারুর বিষাদ
সকাল আরো কিছুটা বাড়তেই বাঘারু মাচানে বসে দেখতে পায়, তার ডান হাতের, মানে তিস্তার পশ্চিম দিকের, পাড়। বাঘারু বিমর্ষ হয়ে বসে ছিল তার মাচানে–দুই হাঁটু দুই হাতে জড়িয়ে, তার লাঠিটাকে পাশে শুইয়ে। গলায় নাইলনের দড়ির বাণ্ডিল আর পেছনে কুড়ালিয়াখানও ছিল–কিন্তু বাঘারুর বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল সেসব আর সে কখনোই ব্যবহার করবে না। না বুঝে, না ভেবে অতগুলো পাখিকে গাছ থেকে ঝড়ের বাতাসের ভেতর উড়িয়ে দিয়ে যে সে মেরে ফেলল, তারপর থেকে বাঘারুর আর নড়াচড়া করে না। প্রথমে ত তার মনে হয়েছিল গাছের সবগুলো পাখিকেই সে উড়িয়ে দিয়েছে। পাখিগুলো ঐ বাতাসে ভেসে যেতেও পারল না, গাছগুলোর ওপর ফিরে আসতেও পারল না। তারপর অবিশ্যি বাঘারুর খানিকটা সান্ত্বনা জুটেছে–এই শালগাছটাতে ও আরো তিন-তিনটি গাছে আরো পাখি থেকে গেছে দেখে। একটা ঝাকই অমন আচমকা উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আর বাঘারুর পাখিদের সঙ্গে নেই। পাখিরা ডালপালার ভেতর দিয়ে দিয়ে ওড়াউড়ি করতে করতে যদি জলে পড়ে ভেসে যায়, যাক। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা বাঘারু আর করতে যাচ্ছে না। এমন-কি, তাকে যদি এ গাছ থেকে ও গাছে যাতায়াত করতে হয় তাহলেও সে পাখিদের দিকে ফিরে তাকাবে না। সে না-তাকালেই পাখিগুলো তাদের মত উড়বে, থাকবে, ভাসলে ভাসবে, মরলে মরবে। বাঘারু তাই তার মাচানের ওপর স্রোতের দিকে মুখ করে দুই হাতে দুই হাঁটু জড়িয়ে দেখে তার ডান হাতে তিস্তার পশ্চিমপাড়ের ফরেস্টটা দেখা যাচ্ছে আর মাঝেমধ্যে বাধ, মাঝেমধ্যে বাড়িঘর।
বাঘারু ও-সব চেনে না। কিন্তু সে বোঝে যে-স্রোত গাছসহ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেটা পশ্চিম পাড়ের দিকেই ছুটছে। এই স্রোতটাকে ঐ পাড়ে নিয়ে গিয়ে ঠেকিয়ে দিতে পারে। আবার ওদিক থেকে আর-একটা স্রোত তাকে পশ্চিম পাড় থেকে টেনে সরিয়েও নিতে পারে। বাঘারুর হাতে যদি লম্বা সরু লগি থাকত তা হলে পাড়ের কাছাকাছি গেলে সে সেই অল্প জলে লগি ঠেলে পাড়ে ভিড়বার চেষ্টা করতে পারত। একটা পাড়ে আটকে গেলেই তার কাজ শেষ। বাকি কাজ ত গয়ানাথ আর আসিন্দিরের–মোক খুঁজিবার আর গাছ খুঁজিবার। ঠিকেই খুঁজি পাবে। গয়ানাথ গন্ধ পাবার পারে–কোটত গাছ আর বাঘারু।
বাঘারু বা দিকে, তিস্তার পুব পারে, তাকায়। কিছু দেখা যায় না। সূর্যটা যে ঐ দিক থেকেই উঠেছে সেটা বোঝা যায় ঘোলা আকাশে মেঘের আঞ্চলিক উজ্জ্বলতা থেকে। আর, দেখা যায় রেল লাইনের একটা ডিসট্যান্ট সিগন্যাল আর খুর আবছা কিছু গাছপালা। কিন্তু এসব জুড়েই তিস্তার জল ছড়িয়ে গেছে, এখনো ছড়িয়ে যাচ্ছে যেন। বাঘারুর মাচান থেকে মনে হয়, সমস্ত বন্যাটা ছড়িয়ে পড়ছে তিস্তার পুব পারে। মাচানে বসে সামনে জলের স্রোতের দিকে তাকিয়েও মনে হয় সেই দূরের পুব দিকেই জলস্রোত ধেয়ে যাচ্ছে। জল যাছে পুব পাখে, মুই গাছগিলা নিয়া যাছ পশ্চিম পাখে বাঘারু যেন রহস্যে পড়ে যায়, কিন্তু সে রহস্য নিয়ে আর-কোনো দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ নেই। মোক ত ভাসি দিছে, গয়ানাথ ভাসি দিছে, মোক, যেইটে নিগাবে, মুই যাম।
কিন্তু আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঘারুকে উঠে দাঁড়াতে হয়। কারণ, ততক্ষণে তিস্তার পশ্চিমপাড়ে চা বাগানের ফ্যাক্টরির চোঙা আর বাধ দেখা যায় ব আর, আরো একটু পরে বাঘারুর চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তিস্তার মাঝখানে কিছু গাছের মাথা আর টিনের চাল। সেই গাছ আর চালগুলোর গলা পর্যন্ত জল-চর আছিল, মানছিলা চলি গেইছে। বাঘারুর গাছের বহর সেই চরের দিকেই ধেয়ে যাচ্ছে। বায়ারুকে তার মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে প্রস্তুত থেকেও ভাবতে হয় সে কি ঐ চরের জেগে থাকা টিনের চাল আর গাছের মাথায় গাছগুলোকে বাধবার চেষ্টা করবে?
বাঘারু তার মাচানে দাঁড়িয়ে যখনই এই ভাবনা শুরু করে, তার মনে হয় জলস্রোত যেন তখনই আরো তীব্র হয়ে সেই চরের দিকে ধেয়ে যায়, এই গাছগুলোসহ তাকে সেখানে আছড়ে ফেলার জন্যেই যেন এই জলরাশি ছুটছে। যতক্ষণ, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবার ছিল না, ততক্ষণ এই জলস্রোতের গতির তীব্রতা বাঘারু যেন বুঝতেই পারে নি–এক কাল অন্ধকারে ভেসে যাবার মুহূর্ত ছাড়া, কিন্তু তারপর, বিশেষত রাত শেষ হওয়ার পর থেকে, এই স্রোতের সঙ্গে বাঘারুর যেন একটা সহাবস্থানই চলছে। যদিও বাঘারু স্রোতে ভেসে যাচ্ছে–তবুও যেন তার এই ভেসে যাওয়া স্রোতনিরপেক্ষ। তেমনি এই স্রোতও বাঘারুনিরপেক্ষভাবেই বয়ে চলেছে। কিন্তু এখন বাঘারু যখন একটি সিদ্ধান্তের মুখোমুখি তখন হঠাৎই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যে-সিদ্ধান্তই নিক বাঘারু তা কার্যকর করতে হবে এই জলস্রোতের সঙ্গে লড়ে। বাঘারু প্রতিপক্ষ হিশেবে জলস্রোতের দিকে তাকাতেই জলস্রোতের বেগ ও শক্তি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর, অনেক, অনেকক্ষণ পর বাঘারু জলের উচ্চকিত কল্লোল শুনতে পায়। এতক্ষণ এই কল্লোল ওপরে বাতাসের সঙ্গে মিশে একটাই আওয়াজ হয়েছিল–সেই একটা আওয়াজ ভেদ করে বাঘারু তার গাছ নিয়ে যাচ্ছে।
