নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটাকে আবার গলায় ঝুলিয়ে বাঘারু ডালের ওপর পা দিয়ে তার মাচানের ওপর উঠে গিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে চারপাশে সামনে-পিছনে, ডাইনেয়ে, ওপরে-নীচে তাকায়। দাঁড়িয়ে ও তাকিয়ে তার এত ভাল লাগে যে সে একবার ঐ মাচানের ওপর বসে পড়ে, তারপর সেখানে আধশোয়াও হয়, তারপর আবার উঠে দাঁড়ায়।
দাঁড়ানো, বসা বা শোয়ার সময় বাঘারুকে একটু সাবধান হতে হয় বটে যাতে ডালগুলো সরে না যায়, কিন্তু তাতে তার আনন্দ কিছু কমে না। এতক্ষণে সে যেন এই বন্যা, এই বৃষ্টি, এই হাওয়া ও এই গাছগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ পায়। সে ছোটখাট ডালগুলো কাটায় তার দৃষ্টিপথও অনেকটা খুলে গিয়েছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল, স্রোত ঠেলে তার এই চার গাছের বহর প্রায় একটুও না হেলে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। স্রোত এই গাছের বহর ও তাকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই যেতে হচ্ছে বটে কিন্তু এই মাচানের ওপর বসে চারপাশ দেখতে পাওয়ায় বাঘারুর মনে একটা ভাব আসে যে সে গাছগুলোকে, এবং স্রোতটাকেও, অনেকখানি নিজের খুশিমত চালাতে পারছে।
নিজের এই মনে হওয়ার সমর্থনের জন্যে বাঘারুর একটা লাঠি দরকার–বেশ লম্বা ও সোজা একটা লাঠি, এখান থেকে যে-লাঠি দিয়ে জল ঘেঁয়া যাবে, আবার দরকার হলে যে-লাঠি আকাশেও ভোলা যাবে। আকাশে তোলার কোনো দুরকার বাঘারু ভাবে না–কিন্তু লাঠি একটা থাকলে সেটা ত আকাশে তোলাই যায়, নইলে আর সেটা লাঠি কেন?. এ অভাবটা বাঘারু রাখতে চায় না।
সে-কুড়ালিয়া খান আবার পিঠ থেকে খুলে এনে, ডান হাতে ঝুলিয়ে, স্রোতের দিকে মুখ করে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে, নিজের চারপাশের ডালপালা-ঘঁটা ফাঁকায় দাঁড়ায় আর এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে লাঠি বানানোর মত একটা ডাল খোঁজে। যে-খয়ের গাছটাতে সে রাত কাটিয়েছে সেটাকে এখন মনে হয় কত দূরের–তার ডালপালাগুলোকেও মনে হয়, ঘন। সিসু গাছটাও ত পাশেই; সেটার পাতাগুলো গায়ে গা লাগানোবাতাসের ধাক্কায় সব একদিকে হেলে আছে। বাঘারু সেদিকে তাকিয়ে ভাবে–সিসুগাছের ডালাপালুর মধ্যে সে তার পছন্দমত একটা লম্বা সরু ডাল পেয়ে যেতে পারে। এবার সে স্রোতের উল্টোদিকে তাকায় যে-গাছটাকে সে আগে চিনে উঠতে পারে নি সেই গাছটা দেখতে। কিন্তু, কুড়ালিয়া হাতে ঝাপানোর জন্যে প্রস্তুত ভঙ্গিতে সে বোঝে ঐ গাছটাতে পৌঁছনো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার।
সে মাচানটি থেকে পাশের সিসু গাছটাতেই যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে দেখে তলায় একটা ডাল উল্টো হয়ে পড়ে আছে, কাটা দিকটা ওপরে। আগাটা কোথায় গিয়ে পড়েছে দেখা যাচ্ছে না। সে কুড়ালিয়াটা পেছনে খুঁজে ঐ ডালটাকে টেনে তোলে। আর বেশ ভেতর থেকে উঠে আসে লম্বা একটা হিলহিলে ডাল। বাঘারু ডালটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে–আগার দিকটা একটু বেশি সরু কিন্তু আপাতত তার কাজ চলে যাবে। সে মাচানে ফিরে এসে বসে। পিঠ থেকে কুড়ালিয়াটা খুলে ডালটাকে পরিষ্কার করে। সব পাতাটাতা ঝরিয়ে দেবার পর ডালটাকে বেশ একটা চাবুকের মত দেখায়। বাঘারু লাঠিটাকে সামনে ধরে দেখে। গায়ের চামড়াটা খুলে দিলে ভেতরের রঙটা বেরিয়ে পড়ত। কাঁচা সিসু কাঠের ভেতরের রং সরষের তেলের মত ঝকঝক করে। কুড়ালিয়ার হ্যান্ডেলটা ডান বগলে চেপে ধরে সে গোড়া থেকে একটু-একটু চাছতে শুরু করে। এতক্ষণে, ঐ ঝড়ো বাতাস সত্ত্বেও ফরেস্টের কাঁচা সবুজের গন্ধ বাঘারুর নাকে আসে—ডালটার চামড়ার ভেতর থেকে উঠে আসছে। এই গন্ধটাতে বাঘারু নিজের অজ্ঞাতেই একটু স্বস্তি পায়। গাছের ওপর এ রকম একটা মাচান পেতেছে, তার হাতে ডালের রস লাগছে, নাকে ফরেস্টের গন্ধ-বাঘারু যেন বন্যায় ভেসে যাচ্ছে না, ফরেস্টেরই ভেতর দিয়ে হাঁটছে, বা চা বাগানের ভেতর দিয়ে।
একটা হ্যান্ডেলমত তৈরি হয়ে যাওয়ার পর বাঘারু ছাল ছাড়ানো বন্ধ করে। কুড়ালিয়াটা পাশে রেখে হাত তুলেই আবার হাত দিয়ে চেপে ধরে–যদি জলে পড়ে যায়। সে সেটা পিঠে গোজে।
তারপর দাঁড়িয়ে উঠে, দুই পা ফাঁক করে বাঘারু দুই হাতে লাঠিটা মাথার ওপরে বৃষ্টি আর বাতাসের ভেতর ঘোরায়। ঘোরাতে-ঘোরাতে তার বেশ মজাই লাগে–যেন তার লাঠিটা দিয়ে বৃষ্টি আর হাওয়ার ঐ তোড়টা ভেঙে দেয়া যাচ্ছে। সেই মজাতেই বাঘারু লাঠিটাকে নামিয়ে আনে যেন আরো বাস্তব প্রতিরোধের সঙ্গে লড়ে আনন্দ পেতে আর গাছের ডালপালাগুলোর ওপর মারতে থাকে-হে-হে-হে-হে–এই রকম আওয়াজ তুলে।
হঠাৎ লাঠির ঘায়ে ডালগুলো থেকে, এবং আরো নীচের ডাল থেকেও, পাখিগুলোর একটা ঝাক বাঁচার তাড়নায় ফরফর করে আকাশে উঠে যায়। সে যে পাখিগুলোকে নীচে জলের কাছ থেকে ওপরে তুলে আনতে চেয়েছিল সেটা বাঘারুর মনে পড়ে যায়। সে এতক্ষণে সম্বোধনের সুযোগ পায়, উঠি আয় কেনে, জলের কাছতঠে উঠি আয় বলে সে লম্বা লাঠিটাকে আরো নীচে ডাইনোয়ে চালায়।
তেমন চালায় বলেই আর মাথা তুলে দেখে না। তলা থেকেও পাখিগুলো ডাকতে-ডাকতে ওপরে আসে, তারপর ডাল ছেড়ে আকাশে উঠে যায়।
তখন বাঘারু দেখে, তার লাঠির ভয়ে পাখিগুলো আওয়াজ করতে করতে ডাল ছেড়ে বড় বেশি ওপরে উঠে গেছে–এতটা ওপরে যেখান থেকে তারা আর নামতে পারছে না, ঝড়ো বাতাসের ধাক্কায় তাদের স্রোতের বিপরীতে চলে যেতে হচ্ছে আর চার-চারটি গাছের বহর নিয়ে বাঘারু তাদের তলা থেকে স্রোতের টানে সরে আসছে। সেই বাতাসের ভেতর পাখিগুলোর তলায় জল ছাড়া কোনো আশ্রয়। নেই। এ পাখিগুলো হাওয়ার বিপরীতে উড়ে এই গাছের কাছে ত আসতে পারছেই না, হাওয়া এত জোরে বইছে যে অনুকূলে পাখা মেলেও থাকতে পারছে না। নদীর ওপরে হাওয়ার, ভেতরে পাখির আঁকটা কেমন শুকনো পাতার মত ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। বাঘারু আরো সরে যেতে-যেতেও দেখতে পায়–দুটো একটা পাখি যেন আকাশ থেকে নদীতে পড়ে গেল, ঐ শুকনো পাতার মতই।
