বাঘারু ডাল থেকে ডালে চলে আসায় এই গাছগুলোর ডালপালায় যে-আলোড়ন উঠেছিল তাতে পাখিগুলো মাঝে-মাঝেই একটু উড়ে উঠে আবার নতুন জায়গায় বসে পড়ছিল। বাঘারু উঁচু ডালটাতে দাঁড়িয়ে যে-সময়টুকু চারপাশ দেখে, পাখিরা সেই ফাঁকে চার-চারটি গাছের ডালপাতার ভেতরে-ভেতরে ঢুকে যায়। এক-একটা ঝাঁকিতে পাখিগুলো কিন্তু গাছ ছেড়ে বেশি দূর উঠতে পারে না–সেখানে বাতাসের ঝাঁপট লাগে। কিন্তু সেটা পুষিয়ে নিতেই আবার জলের বিপজ্জনক কিনারা পর্যন্ত চলে যায়। বাঘারু ঠিক ভেবে উঠতে পারে না, কী করে পাখিগুলোকে জল আর বাতাস থেকে সমদূরত্বের নিরাপদ ডালপালাগুলিতে ফিরিয়ে আনবে।
কিন্তু এই ডালটা বাঘারুর পছন্দ হয়ে যায়। সবচেয়ে না হলেও, এই ডালটা বেশ উঁচুই। চারদিক দেখা যায়। চারটি গাছের মাঝখানেও। একটাই অসুবিধেমাথার ওপর বড় ভারী কোনো ডালপালা না-থাকায় জল আর হাওয়ার ঝাপটা সরাসরি বাঘারুর গায়ে এসে পড়েছে। বাঘারু আবার তার বায়ে তাকিয়ে দেখে ওদিকে আর-একটা নিচু কোনো ডাল পাওয়া যায় কিনা যেখানে দরকার হলে সে বৃষ্টি আর বাতাসের ধাক্কা থেকে বাঁচার জন্যে গিয়ে মাঝেমধ্যে বসতে পারে।
কিন্তু তেমন কোনো ডাল খুঁজে পাবার আগেই বাঘারু তার পিঠ থেকে কুড়োলটা তুলে আনে। এই ডালটার ওপর একটা মাচান মত বানিয়ে নিতে চায় সে।
মোক ত ভাসিবা নাগিবে, যত দিন এই ফ্লাড চলিবে, তত দিন এই গাছগিলা নিয়া মোক ভাসিবার নাগিবে। যত দিন আসিন্দির জোয়াই আর গয়ানাথ দেউনিয়া মোক খুঁজি না পায় তত দিন মোক ভাসিবার নাগিবে। গয়ানাথ এই ফ্লাডের নদীর ভেতর কোনঠে মোক খুঁজিবার পাবে হে? যেইলা ফ্লাড থামিবে, হেই পাহাড়ভাঙা ফরেস্ট ভাঙাজলগিলা সব নদী খালি করি বহি যাবে, যে-চরগিলা টাড়িগিলা ফ্লাডত ঢাকা পড়ি যাছে, স্যালায় সেগিলা আবার দেখি যাবার পাম, স্যালায় মুই এই গাছগিলাক নিয়া কোটত ঠেকি থাকিম আর গয়ানাথ আর আসিন্দিরজোয়াই মোক খুঁজি পাবে। তত্ত দিন ত মোক ভাসিবার নাগিবে–
এই সব কথা কখনো কখনো ভাবার জন্যেই বলতে বলতে বাঘারু তার কুড়ালিয়া দিয়ে ছোট-ছোট নানা ডাল কেটে যায়। কাটা ডালগুলো ওখানেই ঝুলে থাকে, দুটো-একটা ডাল পড়ে গিয়ে নীচের ডালে আটকে যায়। কাটার সময় বাঘারু কোন ডালই কুড়োয় না। সে কখনো বা হাতে একটা ছোট ডাল নামিয়ে এনে তার গোড়ায় ডান হাতে কোপ দেয়–একটা। তারপর বা হাতটা ছেড়ে দেয়। কাটা। ডালটা আটকে থাকে। কখনো বাঘারু ডান হাতটা একটু লম্বা করে দূরের কোনো ডালের গোড়ায় কোপ দেয়। সেটা এক কোপে না নামলে, আর একটা কোপ তাকে দিতে হয়। কিন্তু তার দুই হাতের সমবেত শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন হয় এরকম কোন ডাল সে কাটে না।
দেখতে-দেখতে বাঘারু নিজের জন্যে যেন আকাশটাকে পরিষ্কার করে ফেলে। তাতে বৃষ্টি আর হাওয়ার ঝাঁপটের মুখে সে আরো পড়ে যায় বটে কিন্তু চারদিকটা বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়। সেই শেষ রাতের অন্ধকার থেকে সে যেন এই চার গাছের সঙ্গে আরো একটা গাছ হয়ে ভেসেছে–এতক্ষণে সে গাছ আর নদীস্রোতের ওপর তার প্রভুত্ব দেখাবার মত একটা আসন তৈরি করতে পারছে।
কুড়ালিয়াটাকে আবার পিঠে খুঁজে নিয়ে বাঘারু কাটা ডালগুলো টেনে আনতে শুরু করে। ততক্ষণে এই ডালটার ওপর তার হাঁটাচলা এতই স্বাভাবিক হয়ে যায় সে অনেক সময় দুই হাতেই কাটা ডালগুলো, তুলে এনে এখানে এই ডালটার ওপর আড়াআড়ি ফেলে। ফেলতে-ফেলতে একবার তাকিয়ে দেখে যথেষ্ট ছোট ডাল কাটা হয়েছে কিনা।
বারু এবার নীচের একটা ডালে নেমে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে সে দুই হাতে ঐ ছোট ডালগুলোকে ওপরের বড় ডালের ও পাশাপাশি আরো নানা ডালের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি মেলে দেয়। মেলে দিতেই একটা মাচানের মত হয়ে যায়।
এইবার বাঘারু নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটা গলা থেকে খুলে সামনে এনে একটু ভাবতে বসে। এই ছোট ডালগুলোকে বড় ডালটার সঙ্গে বেঁধে না দিলে ডালগুলো ত খসে পড়ে যাবে কিন্তু এত মোটা গাছ বাধা নাইলনের দড়ি দিয়ে সে ঐ টুকু টুকু ডাল বাধবে কেমন করে? সুতলি থাকলে হত। বাঘারু সামনে দাঁড়িয়ে গাছগুলোর দিকে তাকায় যেন ওখানে কোথাও পাটের সুতলি থাকতে পারে। একটু দূরে একটা লতা মত দুলছিল। বাঘারু হাত বাড়িয়ে সেটা ধরতেই ছিঁড়ে যায়। সেটা বাঘারুর হাতেই লেগে থাকে। ততক্ষণে সকালের আবছা আলোয় ঘোলাটে আকাশ ও ঘোলাটে নদীস্রোতের ওপর দিয়ে নিজের দৃষ্টিটা একবার বুলিয়ে নিয়ে আসে–কোথাও কি পাটের সুতলি থাকতে পারে? অগত্যা বাঘারু তার হাতের নাইলন দড়ির বাণ্ডিলটার দিকেই তাকায়। এই চার-চারটি গাছের সব বাধন এই বাণ্ডিলটার সঙ্গে বাটা। কোনো গাছ কোথাও আটকে গেলে বা সরে গেলে সে এই বাণ্ডিলের টানে বুঝতে পারবে। এই বাণ্ডিলটা থেকে একটা টুকরো কেটে নিয়ে তার প্যাঁচ খুলে-খুলে ছোট-ছোট সুতলির মত দড়ি হয়ত বের করা যেত কিন্তু তা হলে ত বাণ্ডিলটাকে কাটতে হয়। কাটলে সে কী করে টের পাবে–গাছগুলো ঠিক আছে কিনা। গয়ানাথকে যেমন বাথান বুঝিয়ে দিতে হয়, তেমনি ত এই ফরেস্টও বুঝিয়ে দিতে ইর।
.
১৩০. পাখিরা জলে ঝরে যায়
শেষে বাঘারু একটা বুদ্ধি বের করে।
বুদ্ধিটা যে বের করে তা নয়–হাতে আছে এক মোটা নাইলনের বান্ডিল, সুতরাং যা করার তাকে এই দড়ি দিয়েই করতে হয়। ঐ ছড়িয়ে রাখা ছোট ডালগুলোর ওপর দিয়ে নীচ দিয়ে সে নাইলনের দড়িটাকে দু দিকের মোটা ডালগুলোর সঙ্গে আড়াআড়ি বাধে। মোটা ডালগুলোর সঙ্গে দড়িটা পেচিয়ে দেয়াতে ঐ মাচানটা যেন নাইলনের মোটা দড়ির জালে আটকা পড়ে যায়। তাতে ঐ ছোট ডালগুলো খুব শক্ত করে বাধা হল না বটে কিন্তু ঐ মাচানের ওপর থেকে বাঘারুর পড়ে যাওয়ার ভয় আর-থাকল না–দড়ির জালে আটকে যাবে।
