হয় বটে, কিন্তু সে-জন্যে বাঘারুর পক্ষীসন্ধানে কোনো ছেদ পড়ে না। সে ঐ মাস্তুলের মত গাছের কাণ্ড থেকে দেখে, পাখিগুলো আসলে এই নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে কখনো কোথাও-কোথাও এক সঙ্গে ভয় পাচ্ছে। তারা গাছের ডালপাতার মত স্থায়ী ও অনড় আশ্রয়েই আছে, অথচ বন্যার স্রোতে ঐ বেগে ভেসে যাচ্ছে–এর ভেতর মিলটা কোথায় তারা বোঝে না। ফলে, সকালবেলার অভ্যস্ত ছোটাছুটি করতে করতে গাছগুলোর পাতার ভেতর দিয়ে একেবারে জলের কাছ। পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, এমন-কি জল ছুঁয়েও ফেলছে–আর তার পরই ভয়ে চিৎকার করে ওপরে উঠে আসছে।
এই প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করে যখন বাঘারু, তখন সে বুঝে উঠতে পারে না–কিছুপাখি স্রোতে পড়ে ভেসে গেছে কিনা। যদি স্রোতে ডানা লেগে থাকে তা হলে আর উঠতে পারে নি, ভেসেই গেছে)। কিন্তু বাঘারু কী করে পাখিগুলোকে এই গাছগুলোর ডালপালার ভেতরে যাওয়া থেকে আটকাবে? নীচের ডালপাতার ভেতরে ঢুকে গেলে নীচের বন্যায় তাদের ভেসে যাওয়া ঠেকাবে কী করে বাঘারু? পাখিগুলোও কখনো দেখে নি, ডাল থেকে ডালে গেলে জলে পড়তে হয়।
বাঘারু জলস্রোতের কাছ থেকে পাখিগুলোকে বাঁচাতে চায়। সে হেট হেট করে গাছটার ডালে ঋকি দেয়। তাতে ওপরের ডালের পাখিগুলো ডাল ছেড়ে আকাশে উড়ে আবার ডালে বসে। বাঘারু, দেখে, পাখিগুলো যেন বেশি করে ডালপালার ভেতর দিয়ে জলের কাছাকাছি যেতে চায়। কেন চায়, সেটা বাঘারু বুঝে ফেলে–ডালপাতার অত ভেতরে গেলে ঝড়ো বাতাসের ও বৃষ্টির ঐ ঝাপ্টা থেকে বাঁচছে। কিন্তু পাখিগুলো বাতাস আর বৃষ্টি চেনে, বন্যার স্রোত ত আর চেনে না। তাই জলের কতটা ওপরে থাকলে তারা আত্মরক্ষা করতে পারবে হিশেব করতে পারে না।
বাঘারুর চোখের সামনে এতক্ষণে স্পষ্ট হল–একটা শাল, একটা খয়ের, একটা সিসু, আর-একটা গাছ এখনো সে চিনতে পারছে না–একেবারে পরস্পরের সঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু নীচের যে-গাছটাকে সে চিনতে পারে না সেটা আড়াআড়ি এই তিনটি গাছের তলায় লেগে আছে স্রোতের ধাক্কায় নাকি নাইলনের দড়ির বাধনে। যাতেই হোক, লেগে ত আছে। বাঘারু সেদিক থেকে একেবারে বা দিকের গাছটার সীমার ডালে দাঁড়িয়ে। সে যদি মাঝখানের শালগাছটারও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াবার একটা জায়গা পেত তা হলে সেখান থেকে সে সবগুলো গাছকেই ও সেই গাছের পাখিগুলোকে দেখতে পেত।
বাঘারু ঠিকই করে ফেলে সে ঐ গাছগুলোর ঠিক মাঝামাঝি যে-শালগাছটা তারও মাঝখানে যাবে। এখন চারপাশ ফরশা হয়ে আছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকেও দেখা যাচ্ছে। তিস্তার স্রোত–যতদূর পর্যন্ত চোখ যায়, ততদূর পর্যন্ত একই রকম ঘোলাটে। তাকালে মনে হয় না, এই বিরাট জলপ্রান্তরের কোনো স্রোত আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্রোতের সেই বেগে মাথা ঘোরে।
খয়ের গাছের ঐ বাকা কাণ্ডটা বেয়ে বাঘারু তরতর করে নীচে নেমে ঐ জলটা ধরে জলেই নেমে যায়। স্রোতের ধাক্কায় তার শরীরটা ডালের সমান্তরালে ভাসে-দেখিছু ক্যানং সোঁতা হে। কিন্তু এতে তার শালগাছের ডালটা ধরতে সুবিধেই হয়। সে ডালটা ধরায় যে ঝাঁকুনি লাগে, তাতে পাখিগুলো কিচিরমিচির করে ওপরে উঠে যায়। বাঘারুর মনে হয়, শালগাছটাতে পুরো ভর দিলে গাছটা জলের ভেতরে ডুবে যেতে পারে। কিন্তু তা নাও যেতে পারে যদি তলার সেই না-চেনা গাছটার ডালপালা শালগাছটার তলায় থাকে। একবার ডান হাতের ওপর বেশি ঝোঁক দিয়ে দেখে নিতে চায়। সেই ঝোঁকটা দিতে-দিতেই তার বা হাতটা খয়ের গাছ ছেড়ে দেয়। দুই হাতে শালগাছটা ধরতে-ধরতেই শালগাছটা তলিয়ে যায়-বাঘারু সেটাকে আরো একটু তলিয়ে নিয়ে শালগাছের ওপর উঠে বসলে তার হাঁটু পর্যন্ত জলে ডুবে থাকে।
.
১২৯. মাচাননির্মাণ
ডালের ওপর বসে বাঘারু একটু অপেক্ষা করে যে ওপরে তার উঠে বসার ধাক্কা সামলে ডালটা আবার ভেসে ওঠে কিনা। জলের স্রোত তার হাঁটুর পেছনের গর্তটায় সামান্য ধাক্কা মারে কিন্তু স্রোত এতই খর যে জল উছলে ওঠে না। ডালটা একটু ভেসে ওঠে বটে কিন্তু পুরোটা ভেসে ওঠে না। বাঘারু তার ডানে তাকিয়ে আর একটা এমন ডাল খোঁজে যেটা কাণ্ড থেকে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সে তেমন একটা ডাল বাছাই করতে পারে বটে কিন্তু সেটা আবার একটু পেছনে। এই ডাল থেকে ঐ ডালে যাবার হাঙ্গামা পোষাবে কিনা সেটা মাপতে বাঘারু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ডালটা ত দেখেই, তার সঙ্গে-সঙ্গে ডালের আশপাশটাও দেখে নেয়। তারপর সেই ডালটায় যাবার জন্য একই সঙ্গে ডান হাত ও পা বাড়িয়ে দেয়। তাতে এই ডালটা আবার জলে ডুবে যায় বটে কিন্তু তাতে বা হাত, বা পা-টা ঐ ডাল থেকে সরিয়ে আনতে বাঘারুর সুবিধেই হয়। এবার সে অনেকগুলো ছোট-ছোট ডালপালা ভেদ করে, আবার সেগুলোকেই ধরে একটা উঁচু ডালের ওপর দাঁড়াতে পারে ও চারদিকে তাকাতে পারে। একটা উঁচু জায়গায় উঠে যেমন চারদিকে তাকাতে হয় তেমনি তাকিয়েছিল বাঘারু কিন্তু তাকানোর পর, অতটা ফরশা সকালেও সে বুঝে উঠতে পারে না কোথায় এসে পড়েছে, কোন পাড়ের কাছ দিয়ে যাচ্ছে। বাঘারুকে কখনো তিস্তার ওপর দিয়ে তিস্তার দুই পাড় চিনতে-চিনতে যেতে হয় নি, তার পক্ষে নদীর ভেতর থেকে নদীর পাড় চিনে নেয়া এমনিতেই মুশকিল হত। আর, এ নদী তার সারা বছরের চেনা নদীই নয়। সারাটা বছরের মধ্যে দু-চার-দশ দিন এই নদী বাঘারুর অপরিচিত হয়ে ওঠে আর নদী অপরিচিত হয়ে ওঠায় এই নদীর সঙ্গে জড়িত দুই পারের সব বাড়িটাড়ি গাছগাছড়াও অচেনা হয়ে যায়। বছরের তেমনি দু-চার দশ দিন এখন চলছে।
