বাঘারু গাছটা দিয়ে গড়িয়ে আরো খানিকটা নীচে নামে। তার পায়ের পাতা ত জলে ডুবেই যায়, গোড়ালি ভেঙে জল উঠতে থাকে। এইখানে বাঘারু পাশে আর-একটা মোটা ডাল পায়। কিন্তু সেটা ধরে বসেবসেই এই ডাল থেকে ঐ ডালে যেতে বাঘারু পিঠে একবার হাত ঘেঁয়ায় কুড়োলটা আছে ত? এতই বেশি মিশে গেছে কুড়োলটা শরীরের সঙ্গে যে বাঘারুর প্রায় মনেই থাকছে না। মনে ত না-থাকবারই কথা। শুধু কাজের সময় হাত বাড়ালেই যেন পাওয়া যায়। নতুন ডালটাতে পা দিতেই ডালটা ভোস করে জলে ডুবে যায় আর বাঘারু তাড়াতাড়ি আগের ডালটাতেই ফিরে আসতে যায়। ডালটা আচমকা ধাক্কায় আবার ডুবে যায়, আর বাঘারু এতটাই তলিয়ে যায় যে তাকে পুরনো গাছের ডালটায় পা দেয়ার বদলে দুই হাত দিতে হয়। কোমর পর্যন্ত ভিজে গিয়ে সেই পুরনো ডালটা দুই পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে বাঘারু–তার পিঠে জলের ছোঁয়া লাগে। এখন যদি সে একটা ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে ডালের ওপর তুলতে যায়, যা হলে এই ডালটাও ঘুরে জলের তলায় চলে যেতে পারে। ফলে বাঘারুকে ওরকম ঝুলেই থাকতে হয়। কিন্তু রাতের শেষ কয়েক ঘণ্টা ঐ ডালটার ওপরেই ভর দিয়ে এসেছে বলে ডালটাকেও সে একটু বেশি চিনেছিল। বাঘারু নিজেকে জলের ভেতর আরো খানিকটা ছেড়ে দেয়-ফলে তার শরীরটা হাল্কা হয়ে যায়। সেই হাল্কা শরীরটাকে জলের ভেতর দিয়েই সে ওপরে নিয়ে যায়–যেখানে সে বসেছিল সেই জায়গাটিতে। ঝুঁকি লাগলেও ঐ জায়গাটিতে ঘুর লাগবে না।
ভেজা শরীরে বাঘারু আবার তার পুরনো গর্তের ভেতর বসে পড়ে। সেখানে সেঁটে যেতেই বাঘারুর একবার মনে হয়–তার এখান থেকে নড়ার দরকারটা কী? যেখানে গিয়ে ঠেকবে সেখানে তার নামার মত জায়গা থাকলে, নামবে। এ-ছাড়া ত তার কিছু করারও নেই।
পাখিগুলো চিরকাল যেমন, এখনো তেমনি, বাঘারুর নাগালের বাইরে ওড়াউড়ি করে যাচ্ছে। কিন্তু আজ যে বাঘারু আর তারা একটা গাছে চড়ে যাচ্ছে সেটাও অবান্তর হয়ে যায় এই গাছগুলোর উঁচু ডাল-নিচু ডালের পার্থক্যে। পাখিগুলো নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে না যে তারা আর বাঘারু একই গাছে ভেসে আছে।
পাখিগুলো আবার আচমকা ডেকে উঠল–একসঙ্গে, ভয়ার্ত।
বাঘারু এবার ঐ ডাল বেয়েই একটু পেছিয়ে যায়। গাছগুলো পাড় থেকে ছাড়ার সময় সে হাত-পা বুক-পেট দিয়ে ডালের যে-অংশটাকে জড়িয়ে এটে বসেছিল, সেই জায়গাটাতে পৌঁছয়। সেখান থেকে তাকিয়ে বোঝবার চেষ্টা করে–পাখিগুলো সব কটি গাছ জুড়েই এরকম ভয় পাচ্ছে, নাকি, একটা জায়গাতেই। ঐ একটু উঁচু ডাল থেকে বাঘারু দেখে চারটি উৎপাটিত গাছে কত পাখি ও তাদের কত ওড়াউড়ি চলছে সবগুলো গাছ জুড়ে। ফিরে-ফিরে ওড়া কিন্তু বাতাসের ধাক্কা সইতে না পেরে আবার পাতার ভেতর ঢুকে যাওয়া।
কিন্তু পাখিগুলোর ভয় দূর করার দায়িত্ব বাঘারুকে কে দিল?
গাছগিলা গয়ানাথের, পাখিগিলা গাছের, পাখিগিলা গয়ানাথের না হয়। গাছগিলার চামড়ার নাখান পাখিগিলা গাছের ডালত বাসা বান্ধির ধরেছে। যেইল বাও দিবার ধরে, ঝড়ের নাখান বাও দিবার ধরে, বাওড় গাছগিলার ডালপালা ওলটপালট খাবার ধইচছে–এ্যানং ওলটপালট য্যান গাছের মাথাগিলা মাটিত নামি আসিবে আর গাছের শিকড়খান আকাশত উঠি যাবে–স্যালায় বৃক্ষের কুনো প্রাণী বৃক্ষ ছাড়িবেন না। পাখ-পাখাল ডালপালা আঁটি ধরি থাকিবেন, পিপিড়া গাছের গাওত সিন্ধি যাবে, সাপখোপ গাছের গর্তত ঢুকি যাবে। সেই বৃক্ষখান যদি ঝড় উলট খায়, পড়ি যায়, স্যালায়ও বৃক্ষের কুনো প্রাণী বৃক্ষ ছাড়িবেন না। তারপর বাও থামিবেন, বৃষ্টি থামিবেন, বৃক্ষের পাতা পচি খসি যাবার ধরিবেন–স্যালায় পাখপাখাল, সাপপিপিড়া নতুন গাছত বাসা বান্ধিবার ধরে। গয়ানাথের ঝড় গয়ানাথের গাছক উপড়ি দিছে। গয়ানাথের বাঘারু মুই, গয়ানাথর গাছক ভাসি দিছি। গায়ানাথের বাঘারু মুই গয়ানাথর গাছ নিগি ভাসিছু। তিস্তার এই বানাত ভাসি যাছু। তিস্তার বানার নাখান এই ঝড় আর বৃষ্টির বানাত ভাসি যাছু। গয়ানাথর বাঘারু মুই গয়ানাথর গাছ নিগি ভাসি যায় গয়ানাথর জোয়াই আর গয়ানাথ ভটভটিয়াখান চড়ি সদর আস্তা (রাস্তা) দিয়া তামান চর আর কায়েম দেখি-দেখি খুঁজিবার ধরিবেন–কোটে গিয়া ঠেকি গয়ানাথর গাছ আর গয়ানাথর বাঘারু। মোর আর কী কষ্ট? বসি আছু, খাড়ি আছু, তিস্তার বানা মোক টানি নিয়া যাছে। গয়ানাথ দেউনিয়াখানের বড় কষ্ট। আসিন্দির জোয়াইখানের বড় কষ্ট। এ্যালায় এ্যানং বানা। কোটৎ চর, কোট টাড়ি। আর এ্যানং ঝড়। এ্যানং বৃষ্টি। কোটত মোক খুঁজি-খুঁজি বেড়িবার লাগিবে। মুই চিল্লি পারি–হে দেউনিয়া মুই এইঠে। কিন্তুক কায় শুনিবেন সেই চিৎকার। কী আর করিবেন রে দেউনিয়া? তোমরালার গাছগিলা আর বাঘারুক য্যালায় ভাসি দিছেন, স্যালায় ত তুলি নিবার নাগিবে। না-হয় ত সবখানই তোমার লস্, পুরাখান লস, এই চারিখান গাছ ল, এই বাঘারুখান লস্। জ্বালিয়া যেইলা জালখান নদীতে ফেলেন, স্যালায়, ত গুটিবার নাগিবেই। না হয় ত জালখানই লস্,। তোমরালার গাছ গিলাক আর বাঘারুখানক যেইলা ভাসি দিছু স্যালার গুটিবার নাগিবেই। এই ঝড়ত, এই বৃষ্টি তোমায় ভটভটিয়াখান নিগি বাহির হওয়া নাগিবে। কিন্তু গাছের এই পাখিগিলা ত গয়ানাথ দেউনিয়ার না-হয়। পাখিগিলা গাছের। গাছখান ফ্লাড়ত ভাসিরার ধরিছে ত পাখিগিলাও ভাসিবার ধরিছে। এ্যালায় ঝড়ত কাঁপছে, বৃষ্টিত ভিজিছে কিন্তুক পাখিগিলাই আন্ধার কাটি দিছে। পাখিগিলার কুনো গয়ানাথ নাই রো, কিন্তুক পাখিগিলার ত বাঘারু আছো, মুই আছো। মোক দেখিবার নাগিবে না কেনে ভয় খাছে পাখিগিলা? এই সব কথাবার্তা ভাবনাচিন্তার ভেতরই সেই বৃষ্টিপাত-ও ঝড়ো হাওয়া আক্রান্ত সূর্যোদয়ের আচ্ছন্নতার সময় জুড়ে বাঘারু ব্যস্ত থাকে। সেই ব্যস্ততায় সে থই হারিয়ে ফেলে কখন ও কেমন করে গাছের পাতাগুলোর সবুজ, দৃশ্য হয়ে ওঠে, এবং এমন-কি খয়ের গাছের পাতার সবুজের সঙ্গে শালগাছের পাতার সবুজের পার্থক্যও, এমন-কি, একই গাছের বিভিন্ন পাতার আকার ও রঙের পার্থক্যগুলিও। বাঘারুর চিন্তায় তরপরম্পরা যেমন আছে, আরো সব মানুষের মতই, তেমনি তার চিন্তার পরম্পরাহীন। জট পাকিয়ে যাওয়াও আছে, আরো সব মানুষের মতই, কিন্তু সেই আর-সব মানুষ থেকে তার পার্থক্যও আছে। গয়ানাথের জমিতে হাল দিতে-দিতেই হোক, গয়ানাথের বাথানের মোষ-গরুগুলিকে নিয়ে চলতে-চলতেই থোক আর গয়ানাথের গাছগুলো নিয়ে জলে ভাসতে-ভাসতেই হোক–বাঘারুকে আজও সব মানুষের মতই একা-একা ভাবতে হয় বটে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তাকে কথাও বলতে হয়। একা-একাই। যদি সে কথা বলে উঠতে পারে তা হলে তার মাথার ওপরে আকাশ, পায়ের তলায় মাটি বা জল থাকলেই যথেষ্ট। এর আগে তার কোনো-কোনো বাক্যোদগমের সময় কখনো কোথাও কোনো অনির্দিষ্ট অফিসার বা নির্দিষ্ট এম-এল-এ থাকতে পারে, এখন তেমনি এই নতুন দিনে তিস্তার বন্যার সীমান্ত ধরে-ধরে গাছগুলোকে খুঁজবে যে-আসিন্দির আর গয়ানাথ, সেই তারাও তার কথা বলার উপলক্ষ হতে পারে। হয়ও।
