বাঘারু একটু দাঁড়িয়ে দেখতে চায় বসে যা দেখছে তার চাইতে বেশি কিছু দেখা যায় কি না, আর, গাছগুলো কী ভাবে বাধা আছে, কোনো গাছ ত খসেও গিয়ে থাকতে পারে!
বাঘারু জানে, কোনো গাছের বাধন আলগা হয়ে গেলে সে বুঝতে পারতই– কারণ গাছগুলোকে ত খুব ভালভাবে বাধা যায় নি, একটা বাধন আলগা হলে সব বাধনই ঢিলে হয়ে যেতে পারত। সব বাধনের মূল ত তার গলায় দড়ির বাণ্ডিলে। যদি জলের ভেতর কোনো স্রোতের বিপরীত টানও থাকত তা হলে স্রোতের আড়াআড়িতে বাধন ঢিলে হয়ে যেতে পারত। এই এত জল এমন টানে একদিকে চলছে যে গাছগুলো ঘুরছে না পর্যন্ত। কিন্তু তবু বাঘারু একবার দাঁড়িয়ে দেখতে চায়।
যে-গর্তটার ভেতর সে বসে আছে সেখানে পা রেখে এই ডালটাতেই ঝুঁকে হাতের ভর দিয়ে খানিকটা দাঁড়াতে পারে বটে কিন্তু সেটা ঠিক খাড়া দাঁড়ানোত হবে না। এমন ভাবে খাড়া দাঁড়াতে চায় বাঘারু যাতে সবগুলো গাছ আলাদা-আলাদা করে চেনা যায়, দরকার হলে নতুন করে আবার গাছগুলোকে বাধা যায়। কিন্তু আসিন্দিরের ভটভটিয়ার মত করে ডালটার ওপর বসে থেকে একবার সামনের আবছা আঁধার আর একবার ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যান্য গাছের দিকে তাকিয়ে বাঘারু বোঝে এখনো অন্ধকার ততটা কাটে নি যাতে সে দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজতে পারে, বা যদিও পায়, সেখানে দাঁড়িয়ে সে গাছগুলোকে বা গাছের বাধনগুলোকে আলাদা করে দেখতে পারবে না। তার জন্যে এই আঁধার আরে কিছু কাটা দরকার। পাখিগুলো যেরকম বেশি-বেশি ডাকছে তাতে বোঝা যায়–আঁধারটা কাটছে।
.
১২৮. বাঘারু ও পাখিদের জাগরণ
বাতাস আর বৃষ্টি সেই একইরকমভাবে নদীস্রোতের বিপরীতে আকাশ দিয়ে বয়ে আসছে। বাঘারু স্রোতের বেগে ধেয়ে যাচ্ছে আর তার গায়ের ওপর বাতাসের ও বৃষ্টির পাল্টা ঝাপ্টা এসে লেগেই যাচ্ছে–এই অবস্থাটা এতই অপরিচিত যে বাঘারু মনে আনার চেষ্টাও করে না যে কতক্ষণ আগে সে গাজোলডোবায় ঐ ফরেস্ট থেকে জলে ভেসেছিল।
এ ক্যানং বসি থাকা বেলা ঠাকুরের তানে? আতির (রাত্রির) আন্ধার কনেক কনেক করি কাটিবার ধরিবে আর পুবপাখে বেলাঠাকুর উঠিবার আগত নাল, হলদিয়া রংগিলা উঠিবে আর মুছিবে। সেগিলা অঙের (রঙের) ছাও পড়িবে জলের উপরত। আর নদীর জল টলটল করিবার ধরিবে অঙত। এ্যানং, চলিবা থাকিবে অঙের খেলা আকাশত্ নদী আর মাঠঘাট, ফরেস্টত। তার বাদে সব অঙ মুছি যাবার ধরিবে। কায় মুছিছেন কায় জানে। য্যাঁলায় রঙগিলা মুছি গিয়া, ধরো কেনে, সারাখান আকাশ গোবরমোছা এগিনার (আঙিনা) নাখান নাগে, য্যান, এ্যালায় সিদ্ধ ধান শুখাবার তানে ঐঠে মেলা দিবার লাগিবে, স্যালায় বেলঠাকুরখান উঠিবেন, লাল টকটক বন্ন ধরি নদীখানের মাঝঠে। বেলাঠাকুর যেইঠে উঠেন সেইঠে মাঝঠে উঠেন। মাঠ দেখো, বেলাঠাকুর মাঠের মাঝতৃটে উঠিবার ধরিবেন। নদীত দেখো, বেলাঠাকুর নদীর মাঝতুঠে উঠিবেন। ফরেস্ট দেখো, বেলাঠাকুর ফরেস্টের মাঝতটে উঠিবেন। আর, এ কী হবা ধরিছেন? আতি আর দিনত বৃষ্টি আর বাও, বাও আর বৃষ্টি। দিনের বেলা আতির নাখান আবছা, আতির বেলা দিনের নাখান আবছা। এ্যালায় থাকো এইঠে বসি–এ আন্ধার পাতলা হওয়ার তানে। থাকো বসি।
বাঘারু যেন অস্থির হয়ে ওঠে এই স্রোত, বাতাস, বৃষ্টির ভেতরে এই গাছগুলো নিয়ে তার ভেসে যাওয়ার নির্দিষ্ট একটা ভূমিকা তৈরি করে নিতে। কাল রাতের শেষে সে যখন গাজোলডোবার পাড় ছেড়েছে তারপর থেকে প্রতিটি মুহূর্তই যে-ডাল হাতেপায়ে পেয়েছে, সেই ডাল তাকে অন্ধের মত আঁকড়ে থাকতে হয়েছে, একটা আন্দাজ পর্যন্ত পায় নি–কোথায় কতটুকু পা সরাতে পারবে বা হাত নাড়াতে পারবে। আন্দাজে-আন্দাজে একটা বসার জায়গা পেয়ে ডাল বরাবর শুয়ে সে হয়ত একটু ঝিমিয়েও নিয়েছে। কিন্তু সেসব যেন মাঝরাতের অন্ধকারে হঠাৎ জলে পড়ার মত। বাঘারুর কিছু করার ছিল না। অথচ বাঘারু ত গয়ানাথের চার-চারটে গাছ কেটে, বেঁধে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অর্জুনগাছটা পড়লে পাঁচটা গাছ হত। বাঘারুর এই গাছগুলো এক-একটাই ত এক-একটা ফরেস্ট যেন। শাল আছে একটা, খয়ের আছে একটা। বাকি দুটো গাছ খুব ভাল করে দেখেও নি ত বাঘারু। এই গাছগুলো দিয়ে গয়ানাথ তাকে ভাসিয়ে দিয়েছে। তাকে কোথাও গিয়ে ঠেকতে হবে। কোথায়, তা সে জানে না, গয়ানাথও জানে না। এক, নদীর এই ফ্লাড জানলেও জানতে পারে। তার, বাঘারুর কাজ, এই গাছগুলোকে নিয়ে সেই কোথাও ঠেকে যাওয়ার, ঠেকে থাকার। তারপর আসিন্দির আর গয়ানাথ ভটভটিতে করে তাকে খুঁজে বের করে গাছগিলাক আর হামা যা করিবার করিবে। কিন্তু সেইজন্যে ত এখন এই সকাল থেকে এই গাছ আর বানা আর বাতাস আর বৃষ্টি নিয়ে বাঘারুর সচেতন ও সক্রিয় হয়ে ওঠার কথা। তা না, এখনো তাকে এই ডালের ওপর বসে থাকতে হচ্ছে প্রায় অন্ধের মতই।
বাঘারু চোখ মেলে চারদিকে তাকায়। আকাশের দিকে তাকালে সেই ছাই-ছাই মেঘগুলো কোথাও কোথাও দেখা যায়, নদীর জলও দূরে কোথাও-কোথাও চলকায়। কিন্তু এই যে-গাছগুলোর সঙ্গে সে ভেসে যাচ্ছে তার পাতাগুলো কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না, তার রঙও না। এর মধ্যে পাখিগুলি চারটে শোয়ানো গাছের ডালে বসে নদীর জল অথবা কোনো অনির্দিষ্ট সকালের দিকে তাকিয়ে আছে। সকালের পাখি সাধারণত আলোর দিকে মুখ করে থাকে। কিন্তু গাছগুলো এমন কাত হয়ে পড়ায়, ডালপালার যে-বিন্যাসের সঙ্গে পাখিগুলো পরিচিত ছিল, সেটাই কেমন বদলে গেছে। ফলে, তারা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কোন ডালে বসে কোন দিকে তাকালে তাদের পরিচিত আলো দেখতে পাবে। নীচের জলস্রোতের ঐ বেগটাও তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় নেই। তাদের অভ্যাস এতটা ভেঙে যাওয়াতেও কিন্তু পাখিগুলো নিজেদের মত করে একটা রোজকার অভ্যেসে ফিরে যায়–চার-চারটে গাছের মেলানো-মেশানো ডালপালার মধ্যে উড়তে-উড়তে। চার-চারটে গাছ এমনি জটপাকিয়ে আছে যেন মনে হয়–একটাই কোনো এমন বড় গাছ, যে-গাছে সূর্য আড়ালে পড়ে যেত। একটা গাছের সরু মোটা নানা ডালে নানা ভাবে ছোটাছুটি করতে করতে পাখিগুলো হঠাৎ-হঠাৎ একসঙ্গে ভয় পেয়ে ডেকে উঠছে। বাঘারু বুঝে উঠতে পারে না–ভয়টা ওরা পাচ্ছে কেন, এমনই সমবেত ভয়।
