এর পর, কতক্ষণ পর বোঝা যায় না, সে আওয়াজ পায় পাখির ডাকাডাকির–অন্ধকার কেটে যাচ্ছে, সে আওয়াজে বোঝা যায়।
.
১২৭. জলস্রোতে নিদ্রাভঙ্গ
বাঘারু পাখির ডাক শুনে চোখ খোলে না। পাখির ডাকটা কোনো আওয়াজের মত করে তার কানে পৌঁছয় না। যেন অনেকক্ষণ ধরেই এক-আধবার আওয়াজটা হচ্ছে, তারই মধ্যে এক-আধবার সে শুনতে পাচ্ছে, এক-আধবার শুনতে পাচ্ছে না, যেমন রোজই হয়। তারপর, এক সময় সে শুনতেই পায় পাখি ডাকছে। মানে, ভোর হয়েছে। ভোর হওয়ার কথাটা মনে হতেই বাঘারু চোখ মেলতে চেয়েছিল বটে, কিন্তু মেলে নি। আর এই না মেলার সময়টুকুর ভেতরেই বাতাসের বিপরীত ঝাঁপট আর স্রোতের কল্লোলের উঠে আসা তার কানে বাজে। তা হলে কি সে একটু ঘুমিয়েও গিয়েছিল? কিন্তু চোখখোলা আর ডাল থেকে হাত সরিয়ে কুড়োলের হাতলটা ধরার মধ্যে কোনটা আগে ঘটে বোঝা যায় না। বাঘারু দেখে তার কিছুটা ওপরে গাছের পাতাভরা ডাল, সে-ডালে দু-একটা পাখি।
এতক্ষণ পর, বাঘারুর সচেতনতা পুরো ফিরে আসে। সে কুড়োলের হাতলে হাত দিয়ে মাথার ওপরের সেই ডালটার দিকে, বা ডালের পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্ধকারটা কাটে নি কিন্তু এখনই শুরু হল সূর্য ওঠার আগের আলোর আভাস ছড়ানো। এখনো বাঘারু তার মাথার ওপরের পাতার রং দেখতে পাচ্ছে না, শুধু আকারটা দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু পাখি? তা হলে কি গাছটাছ নিয়ে সে কোথাও ঠেকে গেছে? কোনো পাড়ে কিংবা কোনো চরে? তার নীচে ত সে স্রোতের আওয়াজ পাচ্ছে। সে ত কোথাও ঠেকে গেলেও পাওয়া যেতে পারে। যে-ডালটায় সে শুয়ে আছে সেটাও ত দুলছে। তাও ত কোথাও ঠেকে গেলে দুলতে পারে। বাঘারু তার মাথার ওপরের ডালগুলোকে দেখে-দুলছে। সেও ত কোথাও ঠেকে গেলে বাতাসে দুলতে পারে। কিন্তু কোথাও ঠেকে না-গেলে পাখিগুলো ডেকে-ডেকে উঠছে কেন? নাকি এগুলো এই গাছেরই পাখি–গাছগুলোর সঙ্গেই ভেসে আসছে? নাকি এগুলো এই পাড়ের বা চরের পাখি–গাছের ডাল পেয়ে উড়ে এসে বসেছে?
বাঘারু যেন নিজের সঙ্গে একটা খেলাই পায়। তার ত এখন কিছু করার নেই। অন্ধকারটা কাটছে মানে, তার প্রায় আর-কোনো বিপদ থাকল না–এখন ত সে সব কিছু দেখতেই পাবে, ভাসমান গাছের কোথায় পা দিতে পারবে সেটা দেখেই বুঝবে। এখন ত সে দড়ি দিয়ে টেনে-টেনে গাছগুলোকে আরো কাছাকাছি এনে ফেলতে পারবে–প্রায় ভেলার মত। সে সারাটা রাত টেরই পেল না–তার মাথার ওপর এত পাতাওয়ালা একটা ডালের আচ্ছাদন ছিল? আর এখন সে বুঝতেই পারছে না সে কোথাও ঠেকে আছে, না ভেসে যাচ্ছে?
বাঘারু শুয়ে থেকেই তার পা দুটো দুদিক থেকে ঝুলিয়ে দেয়। জলের ছোঁয়া লাগে–স্রোত পা-টা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে ত কোথাও ঠেকে গেলেও হতে পারে। পাখিগুলো আবার ডাকে, কেটু বেশি সমবেত ডেকে ওঠে–যেন তারা তাদের পরিচিত পরিবেশেই আছে। কিন্তু যত পরিচিতই হোক, এই গাছটা ত তাদের চেনা হতে পারে না। তা হলে সেই গাজোলডোবার ফরেস্ট থেকে এই খয়ের গাছ, শালগাছ আর বাঘারুর মত, তারাও, ভেসে আসছে রাতভর? বাঘারু দুদিকের ডালে সামান্য ভর দিয়ে উঠে বসে। দড়ির বান্ডিলটা তার বুকে দোলে। সে দেখে তার সামনের, নদীর পেছনের অন্ধকার থেকে তার এখনকার পেছনে নদীর সামনের দিকে, হু হু করে ছুটে যাচ্ছে। রাতের সেই অন্ধকার জুড়ে বাঘারু এ রকম বেগেই ছুটে এসেছে কিন্তু দেখতে পায় নি। এখন, আধার আবছা হয়ে যাওয়ায় সে স্রোতের সেই গতির দারুণ টান যেন প্রথম বোধ করে।
বোধ করতেই, বাঘারু সেই গতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। সে পেছন থেকে কোনো গতির সঙ্গে নিজেকে মানাতে পারে না–জিপগাড়ির পেছন থেকে ফরেস্টের ভেতর ঢুকতে যেমন তার দিকজ্ঞান নষ্ট হয়ে যায়, এখানেও স্রোতের বিপরীত দিকে মুখ করে সে স্রোতটাকে সামলাতে পারে না। সে কুড়োলটা তুলে পিঠে গোজে, দড়ির বাণ্ডিলটাকেও পিঠের দিকে ঠেলে দেয়, তারপর সেই গর্তটার ভেতর বসেই ঘুরে যায়–স্রোতের টানে নোঙরছেঁড়া কোনো নৌকোর মত গাছগুলো সোজা ভেসে যাচ্ছে। সামনে, বেশি দূর দেখা যাচ্ছে না কিন্তু জলের ওপরকার অন্ধকারটা আবছা হচ্ছে, যেন সেই আবছা অন্ধকারটা এই গাছগুলোর আঘাতেই দূর হচ্ছে। : বাঘারু দেখে কাল সে এই ডালটারই মাথাতে বহুক্ষণ ভয়ে এঁটে ছিল। এখন বোঝে ঐখানেই বিপদ ছিল সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি কোনো ডাল নেই–হাত পিছলে গেলে জলে ত পড়তই, এই গাছগুলোর নীচে চাপাও পড়ত। এই গাছগুলো যে-স্রোতের টানে ভাসছে, সেও সেই স্রোতের টানেই ভাসত, ফলে, গাছগুলোর তলা থেকে বেরতে পারত না। বাঘারু ঘাড় ঘুরিয়ে গাছের ডালপালাগুলো একবার দেখে যেন আশ্বস্ত হতে চায়, সে ঐ উঁচু ডাল থেকে জলে পড়ে গেলেও ডালপালা ধরে আবার জল থেকে মাথা তুলতে পারত! কাল রাতে সে একেবারে মরে যেতে পারত–এমন ধারণাটা তাড়াতে না পারলে যেন বাঘারুর এখনকার বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ হবে না।
ততক্ষণে ঐ গাছগুলোর ডাল থেকে উড়ে আবার গাছের ডালে ফিরে বসা আর ডাকাডাকি করা পাখির সংখ্যা বেড়ে গেছে। এই পাখিগুলোর বাসাসমেতই গাছগুলো জলে পড়েছিল। এই পাখিগুলোর বাসা জলে ভাসে নি বা ভেজে নি। ফলে, অন্ধকারে অন্ধের মত তারা বাসা ছাড়ে নি। এখন স্রোতের টানে গাছগুলোর সঙ্গেই ভেসে যাচ্ছে।
