বাঘারু একটু যেন হেসে ফেলতে পারে।
মোর দেউনিয়াখান অর্জুনগাছখান চাহিবার পারে, কিন্তু কাটিবার না দিবে। কাটিবার ত টাইম নাগিবে। কাটিবার ত আওয়াজ উঠিবে। স্যালায় কায় জানে কোটত কোন ফরেস্টের গার্ড আসি খাড়ি যাবে। স্যালায় অর্জুনগাছে কুড়ালিয়ার দাগ ত আর মুছি ফেলা না যায়। মোর দেউনিয়াখান সারা রাত বসি থাকি, কিন্তু কহিল্ না, বাঘারু হে কাটি ফেল, অর্জুনগাছখান কাটি ফেলা। এক অর্জুনগাছোখান মোর চাঁদখান ডুবি দিলা। এ্যালায় এই আন্ধারত মুই না জানো কতখন ভাসি যাছি, জানো না কতখন ভাসি যাম। চাদাডোবা আন্ধার ত বেশি টাইম থাকিবার কথা না হয়। মোর ত মনত খাছে কি সারা রাতি এই আন্ধার দিয়া ভাসিছু। বাঘারু খুক করে হাসে।
ভাসি যাছু, না, মোর ভটভটিখান চড়ি যাছু। বাঘারু আবারও খুক করে একটু হাসে। আসিন্দির জোয়াইয়ের ভটভটিখান ডাঙার উপর দিয়া যাছে, মোর ভটভটিয়াখান জলের উপর দিয়া যাছে। বাঘারু টাকরায় জিভ লাগিয়ে মোটর সাইকেলের মতন একটা আওয়াজ তুলতে চায়। আওয়াজের কথা ভেবে আবার একটু হাসে বটে, তবে আওয়াজটা তোলে না। জিভটা টাকরা থেকে নামিয়ে নেয়। কিন্তু দু দিকের ডালটা ধরে, যেন মোটর সাইকেলের হ্যান্ডেল।
একটু পরে সেরকম মনে হওগার খেলাটা শেষ হয়ে যায়। তখন বাঘারুর মনে হয়, তাকে তার দেউনিয়া যে বলদ বলে ডাকে সেটা কতটা সত্য। সে এই গর্তটা পেয়ে যেন বতুতে গেছে, হাতের ভেতর ডাল পেয়ে যেন আশ্রয় জুটে গেছে তার। কিন্তু সে এরকম ভটভটিয়া চালাবার মত করে ডালের ওপর বসে আছে কেন? এই গর্তটাতে সেঁটে থেকেই ত সে উল্টে যেতে পারে, পা দুটো ডাল বরাবর ছড়িয়ে দিতে পারে, মাথাটা ডালে হেলিয়ে দিতে পারে-তাতে তার এক রকমের শোয়াই ত হতে পারে। এমন-কি, সে চোখও বুজিতে পারে। তারপর যখন অন্ধকার কাটবে, কাটবে।
গর্তটার ভেতর বাঘারু এমনই হেঁটে গিয়েছিল যে নিজেকে ঘোরাতে তার অসুবিধে যেটুকু হয় সেটা এই কারণে, নিজে ঘুরতে গিয়ে গাছটাকে যেন দুলিয়ে না দেয়। এই স্রোতের মধ্যে গাছে যদি সে ঝাঁকি দিয়ে ফেলে তা হলে গাছটা ঘুরে যেতে পারে। তাতে, যেটুকু জায়গা গুছিয়ে নিতে পেরেছে বাঘারু, সেটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।
বাঘারু দুদিকের ডাল ছেড়ে এই ডালটার মাথাটা ধরে কোমরটাকে তোলে, তারপর পা দুটোকে আস্তে করে ডালের সঙ্গে লেপ্টে লম্বা করে দেয়। মাথার ওপর লম্বা করে দেয়া হাত আর ডালের সঙ্গে লম্বা করে দেয়া পা–এতেই তার এতটা আরাম হয় যে বাঘারু ভাবে কী দরকার আর চিত হওয়ার, বরং এরকম উপুড় হয়ে থাকা যেন তার অভ্যেস হয়ে গেছে, কী দরকার আবার একটা নতুন ভঙ্গিতে যাওয়ার? বরং এই ভঙ্গিতে থাকলে, দরকার হলেই সে সোজা হয়ে বসে পড়তে পারবে।
কিন্তু যে-গর্তটার জন্যে সে বসার একটা জায়গা পেয়েছিল, সেই গর্তটার জন্যেই সে অমন উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। কোমরটা গর্তের ভেতরে ঢুকে যায়। বাঘারু তখন কোমরটা উঁচু করে ডালটার ওপর কাত হয়–বা দিকে। কাত হয়েও সে ডালের ওপর লম্বালম্বি থাকতে পারে। একটু থাকেও। তার এই চিত হওয়ায়, কাত হওয়ায় ডালটা বা গাছটা সামান্য একটু নড়লেও, তারপরই স্থির হয়ে যায়। বাঘারু এবার গর্তটার ভেতর তার পেছনটাকে চিত করে দেয় প্রথমে, একটু অপেক্ষা করে, তারপর জলস্রোতের তালে-তালে নিজেকে চিত করে ফেলে। তার পা দুটো ডালের সঙ্গে লম্বা করে ছড়ানো, এখন হাত দুটো দুদিকে ছড়িয়ে ডালের ওপর রাখা। যদি তেমন দরকার হয় তা হলে সে চট করে বসতে পারবে। কেমন করে পারবে সেটা বোঝার জন্যে পা দুটো দ্রুত গুটিয়ে আনে। হ্যাঁ, পারবে। আবার পা দুটো মেলে দেয়। আর তখন পিঠে গোজা কুড়োলটা পিঠে লাগে।
প্রথমে বাঘারু সেটাকে অগ্রাহ্য করতে চায়। কিন্তু স্রোতের দোলায় যখনই ডান দিকে হেলে তখনই কুড়োলের ধ্বরটা তার চামড়ায় লাগে। সে বোঝে, জোরে একটা ধাক্কা লাগলে কুড়োলটা মাংসের ভেতর সেঁদিয়ে যেতে পারে। সে ডান হাতটা বেঁকিয়ে পিঠের দিকে নিয়ে যায়; তারপর কুড়োলের লোহাটা ধরে সেটাকে তুলে নিয়ে আসে। এনে,দু হাতে কুড়োলটাকে চোখের সামনে মেলে ধরে। এত অন্ধকার দিয়ে ক্ষণ, নিজে ঘুরতে গিমনই হেঁটে গিয়েছিলরে। তারপর যৎ
যে কুড়োলের ধারটাও চমকায় না। লোহাটার ওপর হাত বোলায় বাঘারু। ভিজে গেছে। বাঁ হাতে কুড়োলটা ধরে ডান হাতের পাতা দিয়ে কুড়োলটা মোছে। তারপর শুয়ে-শুয়েই পা দুটো ফাঁক করে, শুয়ে-শুয়েই কুড়োলের কাঠটা ধরে, শুয়ে-শুয়েই কুড়োলটাকে বাতাস আর বৃষ্টির ঝাঁপটের মধ্যে তোলে আর নিজের দুই পায়ের মাঝখানে ডালটার ওপর নামিয়ে আনেকুড়োলটা গভীর গেঁথে যায়। বাঘারু পা দুটো আবার ডালের ওপর লম্বা করে দেয় মাঝখানে কুড়োলের লোহাটা বেষ্টন করে। হাত দুটো দু দিকের ডালে ছড়িয়ে রাখে। এইবার যেন সে একটু চোখ বুজতে পারে। বাঘারু চোখ বোজে।
যেন এতক্ষণ চোখ খোলা ছিল বলেই বাতাসের আর বৃষ্টির গর্জন সে শুনতে পাচ্ছিল না। চোখ বুজতেই তার শরীরের তলা থেকে জলের অন্তর্ঘাতী কল্লোল উঠে এসে তার শরীরের ওপরে হাওয়ার পরাক্রান্ত আক্রমণের সঙ্গে মিশে যায়। এই দুই আঘাতের মাঝখানে চোখ বুজে বাঘারু ভেসে থাকে। ভেসে থাকতে-থাকতে সেই দুই আওয়াজও তার শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। সে আর-কোনো আওয়াজ। শুনতে পায় না।
