এতক্ষণ ঐ আবছা আলোটা নদীর ওপরের ফাঁকটায় ছিল। সেই ফাঁক থেকে ফরেস্টে যেটুকু নদীর পাড়ে, সেই অংশটাতেও একটু ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু আর-একটু ভেতরে ঢুকতে সে-আলো আর পারে নি। এখন নদীর ওপর থেকে ঐ আবছা আলোটাও মুছে গিয়ে আঁধার ছড়িয়ে পড়ল। সেই ফাঁকা থেকে ফরেস্টের নদীর কিনারাতেও ঐ আধার ছড়াল। ফরেস্টের ভেতরটা হয়ে উঠল আরো অন্ধকার। নদীর ওপরে ঐ আঁধারটা ছড়িয়ে পড়তেই নদীর জলটাও যেন বদলে গেল। এতক্ষণ নদী আর আকাশ জুড়ে ছিল একটাই ঘোলা স্রোত। সেই ঘোলা স্রোত জলের ধাক্কায় মাঝেমধ্যে চলকাচ্ছিল, এই-যা। এখন আকাশের অন্ধকার নদীতেও ছায়া ফেলে। কিন্তু সেই অন্ধকারের ফলেই যেন ঘোলাটে ভাবটা কেটে গেল বলে একটা বিভ্রম হয়। নদীর জলটা হঠাৎ ঘোলাটে থেকে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে যেন, যেন জলের মধ্যে জল রুপোলি চলকায়। আর নদীর অন্য পাড়টাও যেন দেখা যাচ্ছে। সবই বিভ্রম, বিভ্রম।
আসিন্দির অধৈর্য হয়ে ওঠে, এ্যালায়ও যদি না ছাড়েন, তা হালি আর আইত (রাত) জাগিবার কামটা কী আছিল?
হ্যাঁ, ছাড়ি দিম, ছাড়ি দিম, বলে গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, বানার ক্যানং টান, কোনঠে গিয়া ঠেকিবে আন্দাজ করিবার নাগে।
এ্যালায় কী আন্দাজ করিবেন? কালি মোটর সাইকেল নিয়া দেখিবার নাগিবে। নাইলনের দড়ি দিয়া বান্ধা আছে, সগায় বুঝিবে কারো সম্পত্তি নাগে। আর ঠেকিলে ঠেকিবে ত চরত, মানষি সব ত চর ছাড়ি চলি গেইসে। ভয় না খান। কায়ও তোমার সম্পত্তি না নিবেবাপা। না-হয় ত গাছের গাওত লিখি দাও কেনে গয়ানাথ এণ্ড কোম্পানি।
গয়ানাথ আসিন্দিরের কথার কোনো জবাব দেয় না। সে তিস্তার ওপরের অন্ধকারটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন তিস্তার ফ্লাডটা আন্দাজ করার জন্যে ঐ অন্ধকার ছাড়া আর-কোনো অবলম্বন নেই। এখানে দাঁড়িয়ে বাতাস আর বৃষ্টির যে-ধাক্কা তারা খাচ্ছে সেটা গত নদশ ঘন্টায় শরীরেরই অংশ হয়ে গেছে। এ্যানং করি গাছগিলাক বান্ধা গেইল, এ্যালায় ভগোয়ানের নাম করি ছাড়ি দিম এই বানার মুখত? তারপর কোটত খুঁজি বেড়াম রে? গয়ানাথ বেশ জোরেই বলে, কিন্তু তার স্বরের মধ্যে স্বগতোক্তি ছিল। আসিন্দির হয়ত গয়ানাথের কথা সব শুনতেও পায় না–সে ত পেছনে দাঁড়িয়ে। শুনতে পারে বাঘারু, কারণ গয়ানাথ কথাগুলো বাঘারু আর তিস্তার দিকে তাকিয়েই বলে।
য্যালায় গিয়া গাছগিলা ঠেকিবে, স্যালায় হয়ত কায়ও নাই, তার পুব-পশ্চিম দিয়া বানা বহি যাছে, কায় আর দেখিবে?
এ গাছগুলো যেন ভেলা, সেই ভেলায় এ প্রলয়ে গয়ানাথ যেন তার প্রিয়তম কাউকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কোথায় গিয়ে এ-ভেলা এই বন্যায় ঠেকবে? কী করে খুঁজে পাবে গয়ানাথ যদি এই বন্যা পুবপশ্চিম সব পাড়ই ভাসিয়ে নেয়? চার-চারটি গাছে কত-কত হাজার টাকা তা হলে লোকসান? যেন, এই হাজার-হাজার টাকা গয়ানাথ তার কাছার গিট থেকে খুলে বন্যায় ভাসাচ্ছে! এই চার-চারটি গাছ বন্যার এই রাত ধরে তার তেমনই আপন হয়ে গেছে, তেমনই আপন।
মউয়ামারির চরচরুয়াগিলান আছে, প্রেমগঞ্জের চর, ভাটিয়াগিলান আছে, বাকালির চরত মুসলমানের ঘর আছে, কশিয়াবাড়ি পার হইয়া এই বৃক্ষগিলান কি পাকিস্তান চলি যাবার ধরিবে?
বাতাসের আওয়াজের সঙ্গে গয়ানাথের হাহাকার মিশে যায়। এই গাছগুলো যেন তার ময়ূরপঙ্খী, এখন হারা উদ্দেশে সেই ময়ূরপঙ্খীটাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, কোনো দিন আর দেখতে পাবে কি না কে। জানে। জলের তোড়ে গাছগুলোর ডালপাতা গয়ানাথকে ঘেঁয়। বাতাসের বেগে স্পর্শটা বোঝা যায় না।
গয়ানাথ এবার চিৎকার করে ওঠে, হে-এ বাঘারু, যেন বাঘারু তার সামনেই দাঁড়িয়ে নেই, নদীর অপর পারে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গয়ানাথ আবার চিৎকার করে ওঠে, বাঘারু হে-এ।
বাঘারু সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো জবাব দেয় না। দেউনিয়ার ডাকের জবাবে বাঘারু সামনে হাজির হতে পারে, জবাব দিতে ত পারে না। সে এখন ত সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা তিস্তার দিকে মুখ, কিছুটা গয়ানাথের দিকে মুখ। সে গয়ানাথের দিকে আরো একটু ঘোরে–তার হাতের মুঠোয় গাছবাধা দড়ি টানটান হয়ে ওঠে। স্রোতের ধাক্কা গাছগুলোকে পাড় থেকে ভাসিয়ে নিতে টানছে।
বাঘারু হে, তুই যা কেনে গাছগিলার সাথত। এ্যানং অমূল্য বৃক্ষ, কোটত না কোটত ভাসি যাবে, কার না কার ভোগত নাগিবে! তুইও ভাসি যা গাছগিলার সাথত, গাছগিলাক পাহারা দিয়া নিগি যা।
গয়ানাথের চিৎকারের পরবর্তী নীরবতা জুড়ে বাতাস হামলে পড়ে উৎপাটিত গাছগুলোর ডালপাতায় আর স্রোতের টান প্রায় অনিবারণীয় বেগে এসে লাগে বাঘারুর পাঞ্জায়, কব্জিতে, হাঁটুতে। কুড়োলটা মাটিতে ফেলে বাঘারু নরম মাটিতে গোড়ালি পুঁতে গাছগুলিকে টেনে রাখে।
বাঘারু হে, গাছত উঠ কেনে। যেইঠে ঠেকি যাবু, থাকিবু। হামরালা গাছগিলাক আর তক খুঁজি নিম।
গয়ানাথ সেই মুহূর্তে গাছে ওঠা কথাটির অর্থ আমূল বদলে দেয়। বাঘারু তার হাতের দড়িটা আস্তে-আস্তে ছাড়ে। তার ছাড় বোঝামাত্র স্রোত যেন একটানে গাছগুলোকে ভাসিয়ে নিতে চায়। বাঘারু খুব ধীরে ধীরে আর-একটু ছেড়ে, পেছিয়ে, সেই গাছের গুঁড়িটার কাছে যায়। সেখানে সে গুঁড়িটাতে হাটু ঠেকিয়ে দড়িটাকে আরো টেনে এনে তার শরীরের সমস্ত পেশির শক্তি সংহত করে অত্যন্ত ধীরে সেই শক্তি প্রয়োগ করে গুঁড়িটাতে প্যাঁচ দেয়–দুটো-তিনটে। গাছগুলো পাড়ের কাছাকাছি চলে আসা আবার। খালি হাতে বাঘারু সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর দু পা এগিয়ে কুড়োলটা তুলে পিঠের ভঁজে ঢুকিয়ে নেংটিতে গেঁজে। এবার পাড়ে দাঁড়িয়ে-সঁড়িয়ে একটা শক্তমত ডাল সে খোঁজে। তার বাহু থেকে নাইলনের দড়ি শূন্যতায় ঘনঘন দোলে। বাঘারু একটা ডাল পেয়ে যায়। পাখি যেভাবে ডাল পা রাখে বাঘারু সেই ভাবে ডালটার ওপর হাত দুটো রেখে আকাশ-আঁকড়ানো বন্যার আকাশে ঝাঁপ দেয়। ভাসমান গাছের মাথা যেন অতিরিক্ত ঝড়ে কেঁপে ওঠে।
