খুলি দে, খুলি দে, দড়িখান খুলি দে–গয়ানাথ চিৎকার করতে করতে গাছের গুঁড়িটার দিকে ছুটে যেতে গিয়ে ফিরে আসে। নদীর পাড়ে তখন নাইলনের দড়ি ঝুলছে–গাছের ভাসমান মাথার ভেতর থেকে যে-গুঁড়িটাতে দড়ি পেঁচানো ছিল, সেই গুঁড়ি পর্যন্ত। সেই দড়ির শেষেই বাঘারু কোনো ডালের ভেতর ঢুকে গেছে। তার উদ্দেশে গয়ানাথ জোতদার চিৎকার করে বলে, হে-এ বাঘারু, অর্জুন গাছখান পাছত ভাসি গেইলে বান্ধি ফেলিস। বাঘারু, অর্জুন গাছখান বান্ধি ফেলিস
আসিন্দির বোঝে নি, বাঘারুও গাছের সঙ্গে ভেসে যাবে। সে বাঘারুকে গুঁড়িটাতে আরো গোটা কতক প্যাঁচ দিয়ে দড়িটাকে আটকাতে দেখল, দড়ি দুলিয়ে পড়ে যেতে দেখল, পাড় থেকে নদীর ভেতরের গাছেও যেতে দেখল। তখন সে বুঝে থাকতেও পারে, নাও পারে। গয়ানাথ যখন চিৎকার করে তাকে গুঁড়িটা থেকে দড়িটা খুলে দিতে বলে তখন আসিন্দির টর্চ জ্বালিয়ে দেখে। হাতে টটটা নিয়ে, ডান হাতে দড়িটা ধরে টান দিতেই ওপরের প্যাঁচটা খুলে আসে। পরের প্যাঁচটা আর একটানে খোলে না, কিন্তু টর্চটাকে মাটিতে রেখে দু হাতে টানতেই খোলেস্রোতের টানে গাছগুলো পাড় থেকে সরে যায়। এই প্যাঁচদুটো বাঘারু শেষে দিয়েছিল। পাড়ছাড়া স্রোতে গাছগুলো যেন আন্দোলিত হয়, সেটা বাঘারু ডালে-ডালে জায়গা খুঁজছে বলেও হতে পারে, স্রোতের ধাক্কাতেও হতে পারে। শেষের প্যাঁচগুলো আসিন্দির দু হাতে টেনে খুলতে পারে না। গয়ানাথও ডান হাত লাগায়। কিন্তু গাছের বাকলের কোনো খুঁজে দড়িটা আটকে গেছে। দড়ি ছেড়ে দিয়ে গয়ানাথ বলে, আঠিয়াল মাটি আনি ঢুকা কেনে। গয়ানাথ এবার টর্চটা ধরে–আসিন্দির সেই অর্জুন গাছের গোড়াতে যায়। শিকড়ের তলাত হাত দে–গয়ানাথ টর্চ ধরে। দু হাতের মুঠো ভরে পাড় থেকে ভেজা মাটি তুলে আনতে আসিন্দিরের সিকো ঘড়ির নীল ডায়াল চমকায়। সেই মুঠোভরা মাটি ঐ দড়ির ওপর দিতেই গুঁড়ির গায়ে লেগে থাকা জলে গুঁড়িটা পিছল হয়ে যায়। কাদামাখা হাতে আসিন্দির দড়িটা ধরে হ্যাঁচকা একটা টান মারতেই দড়িটা অনেকখানি উঠে আসে। বুঝতে পেরে, আর-একটা হ্যাঁচকা টান দিতেই আসিন্দির মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, চোখের সামনের পাহাড়ের মত আড়াল মুহূর্তে সরে যায়, গুচ্ছগুলো ও বাঘারু চোখের পলক না-ফেলতেই দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে যায়, আর তিস্তার বন্যা আবার বাধাহীন পাড়ে ধাক্কা মারে।
.
১২৪. অন্ধকার ও জলস্রোতের মাঝখানে
পাড় থেকে গাছের ডাল ধরে ঝুলে নদীর স্রোতে ভাসা চারটে গাছের ভেতর সেঁদিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঘারু বুঝে ফেলে সে ডালটা সমেত জলে ডুবে যাচ্ছে। এমন আচমকা ডুবে গেলে তাড়াতাড়ি আরো ওপরের ডাল ধরে ভেসে ওঠার কথা বা তাড়াতাড়ি ডালপালা মাড়িয়ে পাড়ে উঠে আসার কথা। কিন্তু বাঘারু যখনই বোঝে সে যে-ডালটায় দাঁড়িয়ে, সেই ডালসমেতই ডুবছে, তখনই একেবারে দাঁড়িয়ে যায়, যেন মেপে নিতে যে আচমকা তার ওজনে এ ডালটা কতটা ডুবে যায়। বাঘারু নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে না কোনোভাবেই। তাড়াতাড়ি পাড়ে উঠে আসার উপায় যে তখনো আছে তা যেন তার জানাই নেই। বা, ওপরে উঠে যাবার মত ডাল যে নেই এটা তার বড় বেশি জানা আছে। এর একটা কারণ হতে পারে যে বাঘারু জানেই জলেভাসা গাছের ওপর চাপ দিলে তা জলে ডোবে। আর একটা কারণ এও হতে পারে যে বাঘারু আসলে জানেই না কী করে নিজেকে বাঁচাতে হয়। পশুপাখি নিজেকে যেমন বাঁচাতে জানে তেমনই স্বাভাবিক আত্মরক্ষার শক্তি, অথবা পশুপাখি যেমন টের পায় না তার মরণফাঁদ কোথায়, তেমনই স্বাভাবিক আত্মহত্যার শক্তি–এর ভেতর কোনো শক্তির ওপর ভর করে বাঘারু ডালসমেত জলে ডুবে যেতে থাকে তা আন্দাজ করেও বলা মুশকিল। তখন ত বাঘারুকে আর দেখা যাচ্ছিল না। দিনের বেলা হলেও দেখা কঠিন হতচার-চারটি গাছের ডালপালা এমনই ঘন আর ছড়ানো। আর, তখন ত কথাই নেই। নদীর ওপর নেমে আসা ছাইরঙামেঘের আড়ালে দেখতে না-পাওয়া সঁদও অস্তে চলে গিয়ে বাতাস আর বৃষ্টিকে আরো অন্ধকারময় করে তুলেছে। আসিন্দির আর গয়ানাথ মিলে গাছের গুঁড়ি থেকে প্যাঁচগুলো একটার পর একটা খুলে দিয়ে যখন ফিরে যায় তখন বাঘরু ঐ জলের তলায় ডুবে মরে থাকতেও পারত। তার মত সাঁতারুও, বন্যার তিস্তার চার-চারটে শক্ত করে বাধা গাছের ডালপালায় চাপা পড়লে বেরতে পারত না। তার চুল, বা তার শরীরে চামড়ার মত লেগে থাকা নেংটিটাও কোনো ডালে আটকে তাকে জলের তলে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলতে পারত।
কিন্তু বাঘারু দড়ির বাণ্ডিলটা তাড়াতাড়ি গলায় ঝুলিয়ে নিতে নিতে বোঝে, ডালটা খানিক ডুবে আর ডুবল না। তার হাটু পর্যন্ত জল। অর্থাৎ, ডালটা ওখানে পাড়ের মাটি পেয়েছে। সেই সুযোগে সে গাছের ডালের ওপর শুয়ে পড়ে ডালটার সঙ্গে মিশে যেতে চায়–মিশে গিয়ে পাদুটো আর হাতদুটো দিয়ে ডালটাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, যেন সে এই গাছটারই একটা ডাল। তখন চকিতে বাঘারুর একবার মনে হয়েছিল নাইলনের দড়িটা দিয়ে ডালের সঙ্গে সে নিজেকে বেঁধে নিলে পারে! কিন্তু সে ত মাত্র মনে হওয়াই।
ইতিমধ্যে আসিন্দির একটা প্যাঁচ খুলে দিতেই ঐ চার-চারটি গাছ পাড় ছেড়ে স্রোতের ভেতরে ঢুকে পড়ে, মুহূর্তে সেই ডালটা আরো তলিয়ে যায়, বাঘারুর পিঠের ওপর দিয়ে তিস্তার স্রোত বয়ে চলে। এখন গাছগুলোর তলায় মাটি নেই–গাছগুলোর ভেতর দিয়ে জলস্রোত এত জোরে বইতে থাকে যেন সেই স্রোতের ধাক্কায় গাছগুলো আবার সোজা হয়েও যেতে পারে। বাঘারুর মনে হয়–এ-অবস্থাটাই অপরিবর্তিত থাকলে সে ভেসে যেতে পারবে কারণ তার পা থেকে কোমর পর্যন্ত যতটা জল বইছে, কোমর থেকে পিঠের ওপর দিয়ে ততটা জল বইছে না। তার মানে, এই ডালটার যেদিকে তার মাথা সেটা উঁচু ও মোটা। তার মানে, এই গাছটা যখন খাড়া ছিল তখন কাণ্ডের যে-জায়গাটা থেকে ডাল বেরিয়েছিল, সেই মোটা জায়গাটাতেই তার মাথা।
