সোম-মঙ্গলবার থেকে ক্রান্তিহাট-গাজোলডোবা-আপলাদের আকাশও ভারী হয়ে নীচে নেমে আসে; বাতাস আর বৃষ্টি বইতে থাকে। কিন্তু ভাটির বৃষ্টি আর বাতাসের চাইতে ওপরের বৃষ্টি আর বাতাসের প্রকৃতি আলাদা। ভাটিতে বাতাস আকাশ থেকে বা আকাশের সীমান্ত থেকে, অবলম্বনহীন ছুটে আসে। আর ওপরে, এই ফরেস্টের কাছে বাতাসটা মাটির ভেতর থেকে উঠে আসে। খ্যাপা হাতির ত পাল হয় না। তা হলে বলা যেত–এ বাতাস খ্যাপা হাতির পালের মতন।
এরকম বাতাস আর বৃষ্টি থাকলে তিস্তার জল বাড়বেই। কিন্তু কতটা বাড়বে, কত দিন থাকবে তার ত আর-কোনো আন্দাজ পাওয়া যায় না। গয়ানাথ জোতদারের জমিজমা চারদিকে ছড়ানো। সে এই অংশ-জমির মালিকানা নিয়ে সিবিলকোর্টে মামলা করতে পারে, সে এই জমিতে পূর্বাবস্থা বহাল রাখার জন্যে ফৌজদারিও করতে পারে কিন্তু তাই বলে তার সব কাজকর্ম ফেলে সে ত আর এই জমিতে পাহারা দিতে পারে না।
পাহারা দিক আর না-দিক, শুক্রবার বিকেলেই গয়ানাথের কাছে খবর আসে আরো ওপরে তিস্তা ভাঙছে। তাতেও গয়ানাথের কিছু যায়-আসে না। কারণ, ওদিকে গয়ানাথের জমি নেই আর গয়ানাথের বাড়িঘর তিস্তা থেকে দূরে। কিন্তু শনিবার দুপুর নাগাদ গয়ানাথ যখন খবর পায় তিস্তার ভাঙন গাজোলডোবায় শুরু হয়েছে সে তার জামাইকে ডেকে বলে, ভটভটিখান বাহির কর, জমিখান দেখি আসি।
আসিন্দিরের পেছনে বসে গয়ানাথ তার পূর্বাবস্থাবহাল জমির হাল তিস্তা কোনোভাবে বদলে দিচ্ছে কি না দেখতে গিয়ে দেখল–ফরেস্টের অত ভেতরে, বাড়িটাড়ি থেকেঅত দূরে তিস্তা ফরেস্টের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। একটা জায়গায় জমি এতটাই খেয়ে ফেলেছে যে সেখানে আলাদা খাড়ি তৈরি হয়ে যাচ্ছে।
তখনই মাথায় বুদ্ধিটা খেলে গেল গয়ানাথ জোতদারের। তার চোখের সামনে একটা অন্তত বছর সাতেকের শালগাছ উপুড় হয়ে পড়ে আছে।
বাঘারুক নিগি আয়, আর টর্চখান, গয়ানাথ সেই স্বরে জলে কথা বলে ওঠে যে-স্বর এখানকার মাটি-গাছপালা-জলের সঙ্গে মেশানো। গয়ানাথ যদি এই হাওয়ার আর এই জলের আওয়াজ বোঝে, তা হলে এই জল আর হাওয়াও গয়ানাথের গলার আওয়াজ বোঝে। সেই তরুণ শালতরুর শেকড়ের ওর পা রেখে গয়ানাথ তার জামাইকে আদেশ দেয়–ভটভটিখান নিগি যা, টর্চ আনিবু, তোর বড় টর্চখান, বাঘারুক আনিবু, ভাল একখান কুড়ালিয়া আনিবু, নাইলনের দড়ি আনিবু এক বাণ্ডিল কি দুই বাণ্ডিল, মোটা নাইলন–তিস্তার দিকে তাকিয়ে গয়ানাথ তার ছোট-ছোট হাতের রোগা আঙুলগুলোর মাথা বুড়ো আঙুলের সঙ্গে মিলিয়ে কত মোটা সে চায় তার একটা আন্দাজ দেয়, দুই হাতের আঙুলগুলো দিয়েই আন্দাজ দেয়। আসিন্দির পেছন ফিরলে ঘাড় ঘুরিয়ে গয়ানাথ বলে দেয়–চিড়াগুড় আনিবু, সারা রাইত থাকা নাগিবা পারে।
আসিন্দির চলে যায় আর গয়ানাথ একা-একা সেই প্রবল বৃষ্টি আর বাতাসের মধ্যে তিস্তার ফ্লাড় আর ফরেস্টের গাছ পাহারা দেয়। সেই কিছুক্ষণ, কয়েক ঘন্টা তিস্তার জলের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে গয়ানাথ সেই লক্ষ-লক্ষ কিউসেক জলের তলার মাটিটাকেও যেন দেখে নেয়–দেখে নেয় সে মাটির ঢাল কোনদিকে কতটা, সে ঢালে বালি আর পাথর জমে আছে কিনা। সেই কিছুক্ষণ, কয়েকটি ঘন্টা ঐ বাতাসের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে গয়ানাথ সেই বায়ুর বেগ মেপে নেয়–মেপে নেয় আকাশের যে-শূন্যতা পূর্ণ করতে এই বাতাস পুর থেকে ছুটে আসছে সে-শূন্যতা আরো কত গভীর; এই বায়ুনিহিত জলরাশির ভেতর আরো কত মেঘ আছে, মেঘে আরো কত জল আছে। তিস্তা, বাতাস, বৃষ্টি আর ফরেস্ট মিলিয়ে গয়ানাথ এই নদী-অববাহিকার আগামী কয়েকদিনের আবহাওয়ার কর্মসূচি ঠিক করে নেয়।
সেই ফ্লাড গয়ানাথের নির্দেশ অনেকটাই মানল–যে-জায়গাটায় ভাঙন ধরেছিল সেখান দিয়ে তিস্তার জল সত্যিই ঢুকল, সেই স্রোতের পথে আরো দুটো গাছ জলেও পড়ল।
আসিন্দির বাঘারুকে মোটর সাইকেলের পেছনে প্রায় বেঁধেই নিয়ে আসে–কারণ চালানোর সঙ্গে সঙ্গে বারবারই বাঘারু পড়ে যায়। বাঘারুর সঙ্গে কুড়োলও আসে, নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলও আসে। আরো একটা গাছ জলে পড়ে। কিন্তু অর্জুন গাছটা আর পড়ল না।
বাঘারু চতুর্থ গাছটিকে ভাসিয়ে আগের তিনটি গাছের কাছে নিয়ে আসে।
.
১২৩. ‘বাঘারু হে, তুই ভাসি যা’
বাঘারু নদীর পাড়ে দাঁড়ায়, তার বা বাহুতে নাইলনের দড়ির একটা বাণ্ডিল, বা হাতের মুঠোতে ধরা দড়ি-গাছগুলোকে টেনে রেখেছে, ডানহাতে কুড়োলটা ঝুলছে। দড়িটা বাঘারুর মুঠোতে ছাড়াও যে-গুড়িটার ওপর গয়ানাথ আর আসিন্দির বসেছিল, সেই গুঁড়িটাতে জড়িয়ে রাখা। গয়ানাথ বললেই বাঘারু তার মুঠোর দড়িটা ছেড়ে দেবে, তখন স্রোতের টানে গাছগুলো কিছুটা দূরে চলে যাবে, তার পর গুঁড়িটা থেকে দড়িটা খুলে দিলেই ভেসে যাবে। বাঘারু দাঁড়িয়ে থাকে, গয়ানাথ কখন ছাড়ি দে বলে তার অপেক্ষায়।
গয়ানাথ আসিন্দিরকে জিজ্ঞাসা করে–কয়ড়া বাজিছেন হে?
আসিন্দির চকিতে ঘড়িটা দেখে বলে–চারিডা।
চারিডা? গয়ানাথ নিজের মনেই বলে ওঠে।
নদীর ওপরে যে-আবছা আলো ছিল সেটা হঠাৎ মুছে যেতে থাকে। অথবা অনেকক্ষণ ধরেই মুছে যাচ্ছিল, এতক্ষণে তাদের নজরে পড়ে। দশমী-একাদশীর চাঁদ হঠাৎ কাল মেঘে ছেয়ে গেলে যে-রকম হঠাৎ আধার ঘনায়, এখন আলোটা সেরকম হয়ে উঠল। বাঘারু আকাশে তাকায় নি। গয়ানাথ আর আসিন্দির তাকায়। তাকিয়ে বোঝে, চঁদ ডুবে গেছে, এখন অন্ধকার আরো বাড়তে থাকবে, যতক্ষণ না সূর্য ওঠে। কিন্তু সূর্য কখন উঠছে, কয়েক দিন ধরে সেটা বোঝাও যাচ্ছে না। না গেলেও আকাশটা আবার ঐরকম আবছা আলোয় ভরে যাবে, রাতের চাইতে আর-একটু কম আবছা।
