এখানে, এই ওপরে, ফরেস্টের ভেতর, বাতাস আর বৃষ্টির ধরনটা আলাদা। নদীর ওপর দিয়ে বৃষ্টি আর বাতাস এই আবছা আলোতে নদীর স্রোতের মত বেগে স্রোতেরই বিপরীতে পাহাড়ের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়তে পারছে না। কিন্তু সেই বাতাসই আবার হু হু করে ফরেস্টের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। এই নিশুত রাতে, তারাহীন, বা বলা যায় আকাশহীন রাতে, হঠাৎ বাধভাঙা বন্যার জলের মত বাতাস নদীর ভেতর থেকে ফরেস্টের ভেতর ঢুকে আর বেরতে পারছে না। গাছের পাতায়-পাতায় আকাশটা এত ঢাকা যে বাতাস আকাশে বেরিয়ে যেতে পারে না। গাছের নীচে মাটির ওপরে এত বেশি ঘাস আর জঙ্গল যে বাতাস সেখানে ঢুকে হেঁটেও বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে, নদীর বুক থেকে হু হু ঢুকে কাণ্ড বেয়ে, ডালপালা বেয়ে, গাছের সংলগ্ন অন্যগাছের ডালপালা দিয়ে ফরেস্টময় স্রোতের বেগে ছড়িয়ে অপর কাণ্ড বেয়েই ছুটে নেমে আসে। মাটির ওপরের জঙ্গলগুলির ভেতর, লুকনো একপাল পশুর মত সে বাতাস ছুটে গিয়ে ঢোকে কিন্তু বেরিয়ে আসতে গিয়ে সাত পথে হারিয়ে যায়। আর সেই বাতাসের বেষ্টনীতে আপাদমস্তক ফরেস্টটা মুচড়ে-মুচড়ে ওঠে।
.
১২২. গয়ানাথ মাটি-গাছ-জলের স্বরে কথা বলে ওঠে
গয়ানাথ বলে, হে-এ আসিন্দির, দেখ ত কনেক, অর্জুন গাছটা খাইছে কি খায় নাই?
আসিন্দির টর্চ জ্বালে আর বলে, ঐ অর্জুন গাছটোর তানে তোমাক শালগাছ গিলা ছাড়িবার নাগিবে, বলে সে টর্চটা নিবিয়ে দেয়। আবার দু জনে চুপ করে থাকে। এখন দু-জনই বসে আছে–একই গাছের গুঁড়ির ওপর। গয়ানাথ তিস্তার দিকে মুখ করে, আসিন্দির ফরেস্টের ভেতরের দিকে মুখ করে। ফরেস্টের সেই ভেতর থেকে আওয়াজ আসছে–বাঘারু শেষ গাছটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে জলে ভাসিয়ে এই বাকি যে-তিনটি গাছ গয়ানাথের সামনের পাড়ের নীচে তিস্তায় রাখা আছে, সেগুলোর সঙ্গে আঁটি বাধার জন্যে টেনে আনবে। অত বড়-বড় গাছের ডালপালা জলের ভেতর থেকে পাড়ের ওপর উঠে এসেছে-একেবারে গয়ানাথের পা পর্যন্তই প্রায়। আবছা আলোয় সেই ডালপালাগুলো কিছুটা ছায়া-ছায়া বলেই অনেক বড় দেখাচ্ছে। এখান থেকে গয়ানাথ তিস্তার ভেতরে জলের, যে উজ্জ্বলতা দেখে জলের তোড় আন্দাজ করছিল–সেই জায়গাটি আর দেখা যাচ্ছে না। তিন-তিনটি গাছের ডালপালা তিস্তাকে প্রায় সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছে। তিস্তা আড়ালে পড়ার পর তিস্তার আওয়াজটা এখন গয়ানাথ আর আসিন্দিরের কানে আসছে। গুমগুম আওয়াজ তুলে তিস্তার জল বয়ে যাচ্ছে–আওয়াজেই যেন বোঝা যায় পেছনে আরো নদী-নদী জল এমন চণ্ড বেগে এই জলটাকে ভাটিতে ঠেলছে। তিস্তার বন্যার সঙ্গে যাদের কিছু পরিচয় আছে তারাই জানে–তিস্তার জল যখন জলের মত ছলছল খলখল শব্দ না করে, বড়-বড় বোন্ডারের সঙ্গে বোন্ডারের ঘর্ষণের মত গুমগুম আওয়াজ তোলে তখন পাতাল থেকে তিস্তার জল উঠতে থাকে, সে জল সব ভাসিয়ে দেবে–গা-গঞ্জ, বাড়ি-টাড়ি সব। এই শেষ রাতে তিস্তার ভাঙনে ফরেস্টের পড়ে যাওয়া গাছ বেঁধেছেদে তিস্তায় ভাসিয়ে, কয়েকদিন পর জল নামলে, ভাটিতে যেখানে ঠেকে থাকবে সেখানে গিয়ে দখল নিয়ে স মিলের কাছে বেচে হাজার-হাজার টাকা লাভের ব্যবসায়ী নেমেছে জামাই-শ্বশুর। কিন্তু, এখন, গাছগুলো ভাসিয়ে দেয়ার ঠিক আগে, এই গাছের থেকেও এই তিস্তার বন্যা তাদের কাছে বেশি সত্য হয়ে উঠল হঠাৎ–যে বন্যা ফরেস্টের এমন-এমন আকাশছোঁয়া গাছকে তাদের পঞ্চাশ-আশি-একশ বছরের শেকড়সুদ্ধ উপড়ে দেয়, সেই বন্যা আসিন্দির আর গয়ানাথকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে চোখের পলক ফেলার আগেই। উৎপাটিত গাছের ডালপালার আড়াল থেকে তারা সেই সর্বনাশের আওয়াজ শোনে।
কিন্তু এ গাছগুলোতে গয়ানাথের এক ধরনের হকও ত আছে!
গাজোলডোবার কাছে তিস্তা আপলাদের পাড় ভাঙতে শুরু করে শনিবার সকাল থেকেই। এক সময় সেখানেই ফরেস্টের সঙ্গে গয়ানাথের পৈতৃক একখতিয়ানের জমি ছিল। শেষ সেটলমেন্টে সাব্যস্ত হয়ে গেছে–সেখানে গয়ানাথের আর-কোনো জমি ফরেস্টের সঙ্গে নেই, সব জমিই ফরেস্টের খতিয়ানভুক্ত করে দেয়া হয়েছে। গয়ানাথ সেই সেটলমেন্টের বিরুদ্ধে আপিল করে। সেটলমেন্টের সব আপিলেই রায় বহাল থাকে। তখন গয়ানাথ জলপাইগুড়ির কোর্টে সিবল মামলা ঠোকে ও ফৌজদারি কোর্টের কাছে দরখাস্ত করে যে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পূর্বাবস্থা বহাল থাকুক। আদালতও একটা সময় পর্যন্ত কার্যকর রাখার জন্যে এই আদেশ দেন। কিন্তু সেই সময় পার হয়ে যাওয়ার পর গয়ানাথ আবার দরখাস্ত করলে আদালত আর একটু বিশদভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখেন যে ওখানে পূর্বাবস্থা বহাল রাখলেও গয়ানাথ বা সরকারের কারো কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে না। তা হলে আপনারা পূর্বাবস্থা বহাল রাখতে চান কেন–আদালতের এই প্রশ্নের জবাবে গয়ানাথের উকিল জানান যে তাদের ভয় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট তা হলে এই জায়গায় সব গাছ কেটে নেবে। কথাটায় আইনি প্যাঁচ ছিল। যে-সম্পত্তির মালিকানা এখনো আদালতে সাব্যস্ত হয় নি সেই সম্পত্তির ভোগ্রদখল যদি অপরপক্ষ করে বসে তা হলে বাদীর সমূহ আর্থিক ক্ষতি। বিশেষত, যে-জমির মালিকানা নিয়ে মামলা, সে-জমির প্রধান আর্থিক সম্পদ ফরেস্টের এই গাছ। আদালত রঙ্গরসিকতা করে গয়ানাথের উকিলবাবুকে বলেও ছিলেন–আরে ওটুকু না-হয় গয়ানাথবাবু সরকারকে খয়রাৎ করে দিন। আদালতের সম্মান রাখার জন্যে উকিলবাবুও গয়ানাথবাবুকে কানে কানে কথাটা জানান। গয়ানাথবাবুর কথামত উকিলবাবু আদালতকে জবাবে জানান যে স্যার যদি হুকুম দেন তা হলে গয়ানাথবাবু তার নিজ খতিয়ানের যে-কোনো দাগ থেকে মামলাধীন জমির সমপরিমাণ জমি সরকারকে খয়রাৎ করতে রাজি আছেন কিন্তু এখানে ত সম্পত্তির মালিকানার মামলা, সেই মালিকানা ঠিক না হলে গয়ানাথবাবু খয়রাৎকরার কে, তা হলে বরং স্যার রায় দিয়ে দিন যে ঐ জমিতে গয়ানাথেরও অংশ আছে, তার পরে গয়ানাথবাবু ওটা সরকারকে খয়রাৎ করে দেবেন। আইনের প্যাঁচ হাকিমের চাইতেও ভাল জানেন গয়ানাথবাবু উকিল–তিনি জেলার এক নম্বর উকিল। কিন্তু উকিলের চাইতেও ভাল জানে গয়ানাথবাবু নিজেই–তার বাপঠাকুর্দার কাছ থেকে জমির আইন তার শেখা। সরকার পক্ষের উকিল একবার অন্যমনস্ক ভাবে বলেছিলেন, স্যার, এখানে এ-অর্ডার দিলে তিস্তা ব্যারেজ তৈরি করার অসুবিধে হবে। আদালত একটু খুশি হয়েই বলেন, তা হলে তিস্তা ব্যারেজের প্ল্যানটা দেখান আর ওরা এই জমির এলাইনমেন্টে কী করবে সেটা বলুন। কিন্তু সরকারি উকিলের কাছে সে-সব কিছুই ছিল না। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আদালতকে জানান–স্যার ঠিক আছে, এবারও অর্ডার যদি দিতে চান দিন, আমরা পরের ডেটে তিস্তা ব্যারেজের মাস্টার প্ল্যান ও এই জমির ব্যাপারে ইনজিনিয়ারদের রিপোর্ট আদালতে পেশ করব। সরকারি উকিলের কথাতে, পরে, গয়ানাথ হাতে চাঁদ পেয়ে গিয়েছিল। যে-তারিখেই এই দরখাস্ত ওঠে, গয়ানাথের উকিলবাবু বলেন যে স্যার সরকারপক্ষ তাদের কথামত কাজগপত্র জমা দেন নি, সুতরাং পূর্বাবস্থা বহাল রাখার আদেশ বহাল থাকুক। সরকারি উকিলের হাতে আরো জরুরি মামলা। এখন এই এক চিলতে জমির জন্যে কে মাস্টার প্ল্যান আর ইনজিনিয়ারদের রিপোর্ট জোগাড় করবে? ফলে সিবিল কোর্টে জমির মালিকানার মামলা চলতে থাকে আর ঐ জমির ব্যাপারে পূর্বাবস্থাও বহাল থাকে।
