ঘোষ সেই আপাদমস্তক ভেজা মেয়েটাকে স্রোতের মত বাতাসের ভেতর ভেজা মাটিতে শোয়ায়।
চরপর্বটা এখানেই শেষ করা যায়। এর পর ত এই মেয়েটি ক্যাম্পে যাবে। সেখানে সে আরো সব বানভাসি মানুষের সঙ্গে থাকবে। সেই বানভাসি মানুষদের বেশির ভাগেরই পরিবার আছে, ঘরবাড়ি আছে, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ত আছেই। আবার, এই মেয়েটির মত দু-চারজনও আছে। সেখানে মেয়েটি আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারবে। ঘোষ যে তাকে এই ভেজা শরীরে ভেজা মাটিতেই শোয়াল–সেটা তার জীবনে এতই ঘটেছে যে গল্প করার কিছু নেই।
পর্বের শেষ অধ্যায় হিশেবে ধর্ষণটা ঠিক লাগসই হল না। এ যেন প্রায় পরস্পরের সম্মতিতেই ঘটল। তবুও ত একটা ধর্ষণই, অসম্মতির কোনো সুযোগই যেখানে নেই। ক্যাম্পের বানভাসি লোকজন ত খানিকটা জানাই–সেখানে আর ফিরে যাওয়ার দরকার নেই।
বরং চরপর্ব এখানেই শেষ হোক।
.
পাহাড়ের তলা থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত তিস্তার ভেতর ত কতই চর। কোনো চর ডাঙার চেয়েও স্থায়ী। কিন্তু ডাঙা যেমন ভাসে, এই সব চরও ত তেমনি ভাসতে পারে। প্রতি বছরই নানা বন্যার সময় এই সব চরে মানুষকে ঘরছাড়ার ভয় পেতে হয়।
চরে যারা আবাদ করে তারা জল আর মাটির সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্কটাকেই বড় করে দেখে। তেমন। ভাবনাচিন্তা করে দেখে না, শরীরের অভ্যাসে দেখে। ভাল মাটি, যদি খাটা যায় ফসলও পাওয়া যাবে। আর, সব জমিরই নিজস্ব ফসল আছে। সেইটি বুঝে নিতে হয়–কোন জমিতে কী ফলবে? আগে কেউ কখনো শুনেছে তিস্তার বালুবাড়িতে এত ভাল তরমুজ হয়?
জলের সঙ্গেও সেই মৈত্রীর সম্পর্কটাই অটুট থাকে। তুমি জলের একেবারে ভেতরে এসে ডাঙার ফসল ফলাচ্ছ–জল তার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে বলেই না ফলাচ্ছ!
কিন্তু বছরের এই কয়েকটি মাসজলের সঙ্গে সেই মৈত্রীর সম্পর্কটা ভেঙে যায়। জল যে সব সময়ই তার হারানো জায়গার দখল নেয়, তা নয়। জলের শক্তি তখন মানুষের শক্তির চাইতে অনেক গুণ বেশি। তখন জলের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে যাওয়ার মানে মৃত্যু, শত্রুতা করতে চাওয়ার মানেও মৃত্যু। তখন জলকে পথ ছেড়ে দিতে হয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, জল নেমে গেলে মানুষ আবার তার পুরনো, ঘরবাড়ি ফিরে পায়। কিন্তু দু-একটা চর আর চর হয়ে জাগতে নাও পারে। সেই অনিশ্চয়তাটুকু থেকেই। যায়। তা থেকে পরিত্রাণ নেই, তা থেকে উদ্ধারও নেই। সেই কারণেই চরের মানুষ চর ছাড়তে-ছাড়তেও ছাড়ে না, যেন, না-ছাড়লেই চরটা তাদের থেকে যাবে।
জল, আকাশ, এর কোনো কিছুই ত দেশীয় সীমান্তের উর্ধ্বে নয়। বাতাসের আর, আলোর কোনো সীমানা নেই–তা ছাড়া সব কিছুরই আছে। সেই সীমানা যখন লোপাট হয়ে যায়, তখন সেই সীমানানির্ধারক শাসনকাঠামোও লোপাট। সীমানায়-সীমানায় এত ভাগাভাগি আঁটাআঁটি সত্ত্বেও ত কত মানুষমানুষীই আছে যাদের কোনো দেশই নেই, কোনো সীমান্তই নেই। সীমান্ত শুধু তাদের ধর্ষিত জীবনকে আরো একটু বিড়ম্বিত করে মাত্র! সে বিড়ম্বনা থেকে তিস্তা-পারেরও দেশহীন মানুষেরও কোনো মুক্তি নেই।
মুক্তি যখন নেইই, তখন চরপর্বের কাহিনী শেষ হোক-নদীর মত তরল মাটিতে নদীর মতই ভেজা মেয়েকে যখন সীমান্ত ভেঙে শুতে হয়।
৪.১ বৃক্ষপর্ব – বাঘারুর প্রত্যাবর্তন
শনিবার রাত তিনটের সময় আপলাদের ভেতরে তিস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে গয়ানাথ ও আসিন্দির তিস্তার ফ্লাড দেখছিল, ঠিক রাত তিনটেয়। আসিন্দিরের এক হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ, আর-এক হাতের কব্জিতে সিকো ঘড়ি ঢলঢল করে। সেই বাতাস, বৃষ্টি আর ফ্লাডের মধ্যেও আসিন্দিরের কব্জিতে নীল সময় দপদপ করছিল, যদি আকাশে তখন তারা থাকত, তবে সে তারাও দপদপ করত আসিন্দিরের সিকো ঘড়ির মতই। বাঘারু ফ্লাড দেখছিল না। সে গয়ানাথ আর আসিন্দিরের একটু পেছনে দাঁড়িয়েছিল। তিস্তার ওপরে ঘোলাটে আকাশ, ঘোলাটে আলো। কিন্তু পাড়ে, অত গাছগাছড়া থাকায় অন্ধকার। সেই অন্ধকারে বাঘারু আর-একটা গাছের মতই দাঁড়িয়েছিল।
আপলচাঁদ ফরেস্টের ভেতরে গাজোলডোবা যেখানে, সেখানে, শনিবার বিকেল থেকেই তিস্তা পাড় ভাঙছিল। ভাঙতে-ভাঙতে রাত বারটা নাগাদ সেখানে একটা ছোট সোঁতামতই যেন হয়ে যায়। এমন সোঁতা নয় যে তিস্তার জল ওখান দিয়ে হু হু করে ঢুকে আপলাদের ভেতর দিয়ে ছুটবে। কিন্তু এমন একটা সোঁতা যে তিস্তার ফ্লাডের জল এখন ওখানে এসে ধাক্কা মারবে ও আরো মাটি খাবে। পরে, তিস্তার ফ্লাড যখন সরে যাবে–এ সোঁতাটাও শুকিয়ে যাবে। দেখতে-দেখতে গাছগাছালি বা জঙ্গলে গর্তটা বুজে যাবে। এক বছর পরে আর বোঝাও যাবে না যে এখানে তিস্তার একটা সোঁতা ঢুকেছিল।
আসিন্দিরের হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ কিন্তু সে সেটা জ্বালায় না। গয়ানাথ আর আসিন্দির পাড়ে দাঁড়িয়ে তিস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে-যেন তিস্তা থেকে কেউ উঠে আসবে।
গয়ানাথ বলে, কয়টা গাছ পড়িছে দেখ কেনে।
আসিন্দির বলে, কয় দফা দেখিবার নাগে? স্যালায় ত চারিখান পড়িছে, আর পড়ে নাই।
গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, তর মনত খায় কী? অর্জুন গাছটা পড়িবে কি না পড়িবে?
আসিন্দির পাল্টা জিজ্ঞেস করে–তোমরালার মনত কী খায় বাপা? জল কি আরো ধাক্কা মারিবার ধরোছে? না, ছাড়ি দিছে?
এ কথার জবাবে গয়ানাথ তিস্তার স্রোতের দিকে আরো নিবিষ্ট তাকায়। এখন তিস্তার জল আর আকাশের মেঘ একই রকম ঘোলাটে। তাতে তিস্তার জলের আলাদা গতি, বোঝা যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু গয়ানাথ আর আসিন্দির সেই রাত বারটা থেকে দেখে যাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে দেখতে-দেখতে তারা তিস্তার জল চোখ দিয়ে মাপার কতকগুলি পদ্ধতি তৈরি করে নিতে পেরেছে। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকে তারা এখন বুঝতে পারছে, কোন একটা জায়গায় স্রোতটা মোটা হয়ে বয়ে মোড় নিয়ে এই পাড়ের দিকে চলে আসছে। সেই বাকটাতে এই মরা আলোও একটু চকচকায়। স্রোতের আবর্তে যখন বেশি জল ঢুকে পড়ে আর আরো বাক নেয় তখন সেখানে আলোটা আরো একটু বেশি চকচকায়।
