ঘোষ চমকে যায়। টর্চটা জ্বালতেই মেয়েটি গেট দিয়ে বাইরে চলে আসে। গেটটা আর ঠেলে না দিয়ে টর্চটা জ্বালিয়ে রেখেই ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, কী ব্যাপার?
না বাবু, মুই ক্যাম্পত যাম, তোমার নখত।
ক্যাম্প? কিসের ক্যাম্প?
বানভাসির ক্যাম্প বাবু। মোর গাঁওখান ভাসি গেইসে।
ও, ঘোষ গেটটা ঠেলে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে, মেয়েটিও তার পেছন-পেছন চলে। গাড়িটা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে, বাতাসে আওয়াজ আসছে। এতক্ষণ বাতাস পিছে নিয়ে আসতে-আসতে তাড়াতাড়ি পা ফেলাটা যেন রপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই ভাবে পা ফেলতে গিয়ে বাতাসের প্রথম ধাক্কায় একটু পেছিয়েই যায় ঘোষ। তারপর বুকটা ঝুঁকিয়ে হাঁটতে শুরু করে। আর মাঝে-মাঝে টর্চ ফেলে।
কয়েক পা যাওয়ার পর তার সন্দেহ হয় মেয়েটা কি আসছে। ঘাড় ঘুরিয়ে টর্চ ফেলে দেখে, মেয়েটা ত আসছেই। সঙ্গে একটা কুকুরও।
হাঁটতে-হাঁটতে ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, তুমি কোন গাঁয়ের?
দক্ষিণপাড়ার বাবু।
তুমি একা-একা এই রাত্তিরে যাচ্ছ কেন? তোমার বাড়ির সবাই কোথায়?
মোর ত বাড়ি নাই বাবু। মোর মানষিও নাই। মুই নিদ গেছু। আর-সব মানষি জল দেখি কোটত চলি গেইছে!
মেয়েটির কথা ঘোষ শুনতে পায় না। সে আর-একটু আস্তে হাঁটে, মেয়েটি প্রায় তার পাশাপাশি চলে আসে। তারও প্রায় পাশাপাশি সেই কুকুরটি।
তুমি গ্রামের লোকের সঙ্গে গেলে না কেন?
মোক ত ডাকছি। কিন্তুক মুই যেইলা গেইছি, দেখি নৌকা নাই।
ও। তোমাদের লোকজন নৌকো করে ক্যাম্পে গেছে? ঘোষের যেন খুব খারাপ লাগে না একা-একা যাওয়ার বদলে গল্প করতে করতে যেতে।
সব নৌকা করি চলি গেইল। তার বাদে মুই হাঁটা ধরিছু।
তুমি ওদের সঙ্গে গেলে না কেন, যারা গাড়ি নিয়ে গেল– ঘোষ হাত তুলে সামনেটা দেখায়।
ডর খাইছু বাবু। অত মানষি চিল্লাছে। ভাবিছু উমরায় আগত যাক, মুই পাছত-পাছত যাম। ত দেখি, তোমরালা একেলা আসিবার ধরিছু। স্যালায় ভাবিছু, এলায় এই বাবুটার সাথত যাম।
তুমি কি ইণ্ডিয়ার?
না বাবু, মুই কারো না হয়।
না। তোমাদের গ্রামটা কি ইণ্ডিয়ায় না বাংলাদেশে?
না বাবু। মুই কারো না হয়।
তোমার বাড়ি নেই?
না বাবু। বাড়ি নাই রে।
তোমার কোনো লোকজনও নেই?
না বাবু। মোর কুনো মানষি নাই।
তোমার ইণ্ডিয়া বাংলাদেশও নেই?
না বাবু। মুই কারো না হয়।
এ ছিটমহলের কোথায় কতটুকু ভারত, আর কোথায় কতখানি বাংলাদেশ বোঝা মুশকিল। মেয়েটি ইণ্ডিয়ারই কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যে একটু ভেবে ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, তুমি কার নাম শুনেছ রাজীব গান্ধী না এরশাদের?
না বাবু, মুই শুনো নাই রো। মুই নাম শুনো নাই।
তোমার ওখানে ভোট ফর হয়? পঞ্চায়েত হয়?
হবা পারে বাবু। ভোট হবা পারে। হবা পারে।
ঘোষ বাঁয়ে তাকায়–ঘোলাটে চাঁদনি তিস্তার জলের ওপর পড়ে আছে এমন, মনে হচ্ছে তিস্তাটা একটা দেয়ালের মত আকাশে উঠে গেছে। ঘোষ ডাইনে তাকায়–দুই সীমান্তের মাঝখানে মালিকানাহীন প্রান্তর এখন জলে ডুবছে। বাংলাদেশের দিক থেকে ভারতের দিকে বাতাস ফ্লাডের মতই ছুটে আসছে। ঘোষ মেয়েটির ওপর টর্চ ফেলে, দাঁড়িয়ে। মেয়েটিও দাঁড়িয়ে পড়ে। সে প্রথমে টর্চের দিকে তাকায়, তারপর চোখ কোচকায়। কুকুরটা মেয়েটির পায়ের কাছে টর্চের আলোর বৃত্তের মধ্যে এসে দাঁড়ায়।
কী দেখিলেন বাবু? মোক দেখিসেন?
টর্চ নিবিয়ে ঘোষ আবার হাঁটা শুরু করে। এত সপসপে ভিজে গেছে মেয়েটি যে দেখেও কিছু বোঝ যায় না। বাতাসের বেগ ঠেলে যেতে হচ্ছে বলেই হোক, বা অন্য কোনো কারণেই হোক, ঘোষের গতি একটু কমে আসে। ক্যাম্পে তার ঘরে নিয়ে যেতে পারলে মেয়েটিকে একটু শুকিয়ে দেখে নেয়া যেত। ক্যাম্পটা ত এখন সুনসান। যাওয়া যায়। কিন্তু আমারির বারান্দা থেকে ওরা যদি টর্চ ফেলে? ঘোষ আগে গিয়ে, মেয়েটিকে পরে আসতে বলতে পারে। কিন্তু মেয়েটি যদি তখন না আসে? সেন্ট্রি বক্সটায় যাওয়া যায় অবিশ্যি।
ঘোষ একটা ঢোক গিলে জিজ্ঞাসা করে, ক্যাম্পে তোমার কে আছে।
কায়-না-কায় ত থাকিবে বাবু।
তোমার ত বাড়ির কেউ নেই বললে?
না বাবু। মোর বাড়ি নাই রো।
না। বাড়ির লোকজনও ত কেউ নেই বললে?
না বাবু। মোর মানষি কুনো নাই রো।
ইণ্ডিয়া বাংলাদেশও নেই?
না বাবু। মোর ঐলা কিছু নাই রো।
তোমার দেশ নেই? একটা?
না বাবু। মোর দেশ নাই রে।
তা হলে ক্যাম্পে আর তোমার কে থাকবে?
মানষিলা ত থাকিবে বাবু, বানভাসি মানষিলা।
গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া জোয়ানদের অতর্কিত চিৎকার ঘোষ আর শুনতে পায় না। ওরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বা, তিস্তার আওয়াজটাই এখন প্রবলতর। তা হলে কি পায়ে-পায়ে ওরা তিস্তার কাছেই চলে এসেছে, পাড়ে? ঘোষ বায়েটর্চ ফেলে মাটিতে ঘোলাটে জল, তারপর তিস্তার ওপরের ঘোলাটে কুয়াশা। সেই আলোটাই ঘুরিয়ে মেয়েটার ওপর আবার ফেলে। মাথায় চুল থেকে সারাটা শরীর সপ সপ করছে, নিংড়োলে জল বেরবে। মেয়েটি এবার মুখ তুলে আবার জিজ্ঞাসা কর, কী দেখিসেন বাবু? নদীতে বান উঠিছে?
টর্চটা জ্বালিয়ে রেখেই ঘোষ মেয়েটির দুই কাঁধে হাত দিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। মেয়েটির ঘাড়ের পেছন থেকে টর্চের আলো সীমান্ত-অন্তবর্তী এলাকায় অকারণ ছড়িয়ে থাকে। তাতে দেখা যায় কুকুরটা অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। এতদিন সীমান্তে সীমান্তে চাকরি করছে ঘোষ–সে নিশ্চিতরূপে জেনে যায় এই মেয়েটিও বর্ডারের আরো অনেক তাদের মত, যাদের বাড়িঘর নেই, মানুষজন নেই। এমন-কি। দেশটেশও নেই।
