সেন্ট্রিবক্সের গেটটা খোলাই ছিল–গাড়ি গেছে। গেটটা পেরতেই ছপ করে জলে পা পড়ল। ঘোষ পায়ের কাছে টর্চ জ্বালে, গামবুটের নীচে ঘোলা জল, টর্চের আলোতে পাতলা দেখাচ্ছে। ফ্লাডের জল তা হলে ক্যাম্পে ঢুকে গেছে। টর্চ নিবিয়ে কয়েক পা ছপ ছপ করে হাঁটে ঘোষ। আকাশে খোলা চাঁদনি–তাতে মেঘ দেখা যায় বা মেঘের আভাস পাওয়া যায় মাত্র। এখন মাটির দিকে তাকালে জলে সেই মেঘের আবছায়া পাওয়া যায়। ঘোষ আবার টর্চ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার টর্চের আলোকবৃত্তের মধ্যে জলের দ্রুত সরলরেখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে না মিশে বা থেকে ডাইনে যাচ্ছে আর বৃষ্টির ছাটে। নুয়েপড়া ঘাসগুলো জলের টানে সোজা হয়ে যাচ্ছে।
টর্চটা বাতাসে নাড়িয়ে ঘোষ আঁকে, এই, তোমরা এসে গেছ?
ক্যাম্পের বারান্দা থেকে টর্চ জ্বলে ওঠে, দু-তিনটে। ওরা চিৎকার করে কিছু বলে শোনা যায়, বোঝা যায় না। মাঠটা পেরিয়ে ঘোষ একেবারে গুদামের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দার নীচেই গাড়িটা লাগিয়ে রেখেছে।
সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠতে-উঠতে ঘোষ বলে, জল ত ঢুকে গেছে।
জোয়ানদের একজন বলে, হ্যাঁ স্যার। ওরা ত কেউ নামল না, আর্মারির বারান্দা থেকে। টর্চটা ধরো ত, গুদামের তালা খুলতে-খুলতে ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, কী, জল কি বারান্দায় উঠবে নাকি?
তা ত উঠিবার পারে স্যার, যাওয়ার তানে ত জল না আছিল, আর এলায় ত সপসপাছে।
গুদামের দরজা খোলামাত্র বাতাসের ধাক্কায় কপাটটা পুরো খুলে আবার সেই খোলার বেগের প্রত্যাঘাতে ঘোষের মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যায়। গুদামের ভেতরে কোনো খালি টিন ছিল হয়ত–সেটা খুঁটির গায়ে লেগে ঝন ঝন আওয়াজ ওঠে। একসঙ্গে অনেকগুলো টর্চ জ্বলে ওঠে। ওরা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে।
শোনো, তোমরা যা টানতে পারবে, তাই নাও, শেষে রাস্তায় ফেলে দিতে না হয়।
স্যার, এলায় ত নিগিবার কষ্ট হবে। একবস্তা চাউল আর একবস্তা আটা নিগিবার পারি।
তা হলে তাই নাও। আর ডালের ছোট বস্তা নাও একটা।
জোয়ানরা দু জন করে এক-এক বস্তা মুহূর্তে তুলে নেয়। একজন দরজাটা ধরে থাকে, দুটো বস্তা নিয়ে বারান্দার কিনারায় রাখে। ঘর থেকে ওরা বেরিয়ে গেলে ঘোষ টর্চ জ্বেলে দেখে কেরোসিনের একটা সিড় টিন নীচে আছে। একবার ভাবে, জোয়ানদের রওনা করে দিয়ে টিনটা তার ঘরে রেখে দেবে কিনা। মুহূর্তের মধ্যেই আবার ভাবে, পরে দেখা যাবে।
এই শোনো, ঘোষ দরজার দিকে টর্চ ফেলে। একজন জোয়ান এগিয়ে আসে।
এই টিনটা ঐ বস্তাগুলোর ওপর রেখে দাও, ঘোষ টর্চের আলো দেখায় জোয়ানটিকে। সে টিনটা তুলে চালের বস্তার ওপর রেখে ঠেলে দেয়।
জোয়ানরা সবাই নীচে নেমে গিয়েছিল। ঘোষ গুদামের দরজাটা বন্ধ করার জন্যে টানতেই বাতাসের ধাক্কায় একটা কপাট তার হাত থেকে ছিটকে যায়।
এই, একটু ধরো ত।
এক জোয়ান বারান্দার ওপর ভর দিয়ে উঠে আসে। সে দরজার কড়াদুটো টেনে ধরলে ঘোষ তালা লাগাতে পারে। জোয়ানটা আবার লাফিয়ে নীচে নামে। গাড়ির জোয়ালটা ততক্ষণে দু জন উঁচু করে তুলেছে, আর দুজন পেছনে হাত দিয়েছে।
এই, তোমরা বস্তা তোলার পর গুদামে ক বস্তা থাকল? ঘোষ বারান্দা থেকে সিঁড়ির দিকে যেতে-যেতে জিজ্ঞাসা করলে এরা থেমে যায়। কিন্তু কেউ আর-কিছু বলে না। একটু পর একজন হেসে ফেলে বলে, কিছু ত দেখি নাই রো, খপ করি ধইচছি, গট করি বাহির হছি। বলেও সে হে-হে করে হাসে, আরো দু-একটি অস্পষ্ট হাসির সঙ্গে নিজের স্বর মিলিয়ে।
আচ্ছা, আচ্ছা, যাও, আমি একটু আর্মারিটা দেখে যাই।
ওরা একটা হ্যাঁচকা টানে গাড়িটা চালু করে, তারপর এগিয়ে যায়। আর ওদের দিকে পেছন ফিরে ঘোষ একবার বারান্দা ও সার-সার ঘরের দরজার ওপর দিয়ে টর্চটা ফেলে। বাতাসের আঘাতে দরজাগুলোতে আওয়াজ উঠছে। অথচ জনমনিষ্যি নেই। মাত্র এই একটু আগেও ত তাদের ক্যাম্পটা কী রকম গমগম করছিল, না?
সামনের মাঠটায় দাঁড়িয়েই ঘোষ আর্মারির দিকে টর্চ ফেলে, এই তোমরা ঠিক আছ ত?
বারান্দা থেকে টর্চ জ্বলে, ঘোষ শুনতে পায়, হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছি।
ঘোষ টর্চটা জ্বেলেই একটু এগিয়ে যায়। তারপর গলা তুলে বলে, কাল সকালে তোমাদের বদলি এলে তোমরা বাংলাদেশের ক্যাম্পে চলে যেও।
জল ত বাড়িবার ধরিছে। জল বাড়িলে বদলি আসিবে ক্যানং করি স্যার?
ঘোষ একটু ভাবে। তারপর আবার আর্মারির দিকে কয়েক পা এগিয়ে টর্চটা ফেলে দাঁড়ায়। পেছন থেকে একটা আওয়াজ পেল–গাড়িটা বোধহয় সেন্ট্রি বক্স পেরল।
শোনো, জল বাড়লেও কেউ-না-কেউ আসবে। আর বারান্দায় জল উঠলে তোমরা ছাতে চলে যেও। ঘোষ ছাতে টর্চ ফেলে–ভিজে ত্রিপলের ঢাকনাটা অন্ধকারের মত দেখাচ্ছে।
আমরা ঠিক আছি স্যার, ভাববেন না, বারান্দা থেকে জবাব আসে। ঘোষ এবার ঘুরে তাড়াতাড়ি গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
.
১১৯.
বন্যার মুখে একটু ভেজা ধর্ষণ দিয়ে চরপর্বের শেষ অধ্যায়
ঘাসবনে পা দিয়ে জলের ওপর টর্চটা ফেলে ঘোষ দেখে এখন জলের তলায় পুরো রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে-ঘাসগুলো সোজা হয়ে গেছে। এইটুকুর মধ্যেই কি জল আরো বাড়ল? ঘোষ ছপছপ করতে করতে গেটের কাছে পৌঁছয়। গেটটা খুলেই রেখে গেছে ওরা। বেরিয়ে গেটটা বন্ধ করার জন্যে ঘুরতেই সেন্ট্রিবক্সের তলা থেকে কেউ বেরিয়ে এসে ডাকে, বাবু।
