এইখানে টিভি নাই?
হ্যাঁ, আছে ত। দেখিবেন? এখন তে লেকচার হছে। খাড়ান, ফিল্ম হবার সময় যাম। কটা বাজে এখন?
কম্যাণ্ড্যার বালিশের তলা থেকে ঘড়ি বের করে দেখে বলে, সাত। কম্যাণ্ড্যান্ট নিজের ঘড়ি দেখে সময়টা মেলাতে গিয়ে আবার দেখে, সাড়ে সাত, তোমার ঘড়ি শ্লো নাকি?
আরে না, মোর ঘড়ি রোজ মিলাই।
আমার ঘড়ি ত ভাই ফাস্ট যায় না।
একটু পরে কম্যান্ডার হো হো হেসে বলে, আরে আপনার ত ইন্ডিয়ার টাইম, হামরালার ত বাংলাদেশের টাইম। এইঠে নটায় ফিল্ম দিবে। দেখব।
আমাদের নর্থ বেঙ্গলে ত বাংলাদেশের টিভিই সবাই দেখে, তোমাদের আর দিল্লির। কলকাতা ত রাই যায় না।
আমাদের সাউথ বেঙ্গলে কলকাতাখান দেখা যায়, শীতকালে।
টিভি এক, নদী এক, ফ্লাড এক, শুধু টাইমটা আলাদা?
কেনে? কহিলেন যে সিগারেট আলাদা, মদ আলাদা
নদীডাও আলাদা হইব।
কোন নদী? তিস্তাবুড়ি?
বুড়ি না ছুড়ি কে জানে। আমাদের ইন্ডিয়ায় ত পাহাড়ের তলায় বিরাট তিস্তা ব্যারাজ বান্ধানো হইচ্ছে।
তিস্তার বাঁধ?
বাধ। স্লুইস গেট। ফ্লাড হবার পারব না। জল আটক থাকব। শীতের সময় ছাড়া হয়। বিরাট নাকি ব্যারাজ-তিস্তার মাঝখান দিয়্যা।
স্যালায় আমরা জল পাম কোটত?
জলের কি অভাব পড়ছে তোমার? প্রতি বছরই ত ফ্লাড পাও।
ফ্লাড হবার তানেই ত রংপুরের এইঠে, পাটগ্রামে, এ্যালায় ফলন ভাল হয়। এ ফ্লাডত আপনাদের মানষি মরে, আর আমাদের ফসল বাড়ে।
সেই জন্যই ব্যারাজ হচ্ছে, তিস্তা ব্যারাজ। ফ্লাডও নাই, মানষে মইরবেও না।
কিন্তু নদীখান ত ভাগ হবা ধরিবে। আপনাদের হাত চাবি–জল দিলে জল পাব, না দিলে শুখা।
শুখা ত শুখা। তখন এক টিভিটাই এক থাইকব-তোমরা কলকাতা দেখবা, আমরা রংপুর দেখব। আর সব আলাদা-নদী আলাদা, ফ্লাড আলাদা, টাইম আলাদা।
আলাদাখান এত বাড়া ভাল না হয়, কম্যান্ড্যার কম্যান্ডান্টের গ্লাশ আবার ভরে দিয়ে, নিজের গ্লাশটাও ভরে নেয়।
.
১১৮.
ঘোষের ইণ্ডিয়ায় একবার প্রত্যাবর্তন
ঘোষ একেবারে একলা হয়ে যায়।
বাংলাদেশের ক্যাম্পে জোয়ানরা জোয়ানদের সঙ্গে মিশে গেছে, কাস্টমসের লোক কাস্টমসের ঘরে গিয়ে উঠেছে। ফোনের লোক ফোনের লোকের ঘরে। কিন্তু ঘোষেরই যেন কোনো ঘর ছিল না।
আসলে আছে নিশ্চয়ই। বাংলাদেশের ক্যাম্পে কি কমাণ্ডার আর জোয়ানদের মাঝখানে আর-কেউ নেই নাকি? কিন্তু ঘোষের সঙ্গে তাদের পরিচয় হওয়ার সময় হয় নি। বাংলাদেশের ক্যাম্পে পৌঁছে, কোনো রকমে এক কাপ চা খেয়েই সে ছজন জোয়ানের সঙ্গে গাড়িটা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েছে। চালডাল যে কবস্তা পারে নিয়ে আসতে হবে-কম্যাণ্ড্যান্ট যেমন বলে দিল।
ঘোষ ও তার লোকজন বাতাসের সঙ্গেই যাচ্ছিল। তাদের ওয়াটারপ্রুফের পিঠ ভিজছিল বুকটা শুকনো ছিল। পিঠে হাওয়া নিয়ে হাঁটার সুবিধে। তাছাড়া, তাড়াও ত একটা ছিল। এখন যদি তাড়াতাড়ি যেতে পারে, ফেরার সময়ের দেরিটা তা হলে পুষিয়ে যাবে। গাড়ি বেশি ভারী হলে টানা মুশকিল হবে।
চালডালটা যদি নষ্ট হত তা হলে তাদের কোনো ক্ষতি ছিল না, বরং লাভ ছিল। হেডকোয়ার্টার থেকে নতুন রেশন আসত, এগুলো কম দামে বেচে দিয়ে কম্যাণ্ড্যান্টও সে ভাগ করে নিতে পারত। ফ্লাডের পর এ-সব জিনিশের চাহিদা থাকে। কিন্তু নতুন রেশন আসতে দেরিও হতে পারে। দেরি হবেই। অন্তত সেকদিনের রেশন বাঁচাতে হবে। ঘোষ মনে-মনে হিশেব কষতে কষতে হটেকত বস্তা চাল বাঁচালে নতুন রেশনের সময় পর্যন্ত চালানো যাবে অথচ বেচার মত অন্তত কয়েক বস্তা ভেজা চাল থেকে যাবে। নদীতে জল যা দেখেছে তাতে আজ তাদের ক্যাম্পে জল উঠবেই। জলটা কতদিন থাকবে–সেটা অবিশ্যি এখনই বোঝা যাচ্ছে না। ঘোষ মাঝেমধ্যে নদীর দিকে টর্চ মারে কিন্তু টর্চের আলো জলের কুয়াশায় বেশিদূর যায় না।
জোয়ানরা গাড়িটা টানতে-টানতে প্রায় দৌড়ে-দৌড়ে আগে চলে যাচ্ছে। ঘোষকে একা-একাই হাঁটতে হয়। ওরা আগে পৌঁছেও দাঁড়িয়ে থাকবে–গুদামের চাবি তার কাছে।
ঘোষ পায়ের কাছে ও আশেপাশে দু-একবার টর্চ মেরে বুঝতে চেষ্টা করে যাওয়ার সময় কম্যাণ্ড্যান্টের সঙ্গে সে যে হ্যাঁড়িগুলোতে তিস্তার জল ঢুকতে দেখেছিল সেগুলো কোথায় গেল। সে ও কম্যাণ্ড্যান্ট ত সে রকম নিচু জায়গা বারকয়েক পেরল।
টর্চ নিবিয়ে বা দিকে তাকিয়ে ও আকাশের দিকে চেয়ে ঘোষ আন্দাজের চেষ্টা করে-সেই খুঁড়িগুলো পেরিয়ে এল কি না। সে আর কম্যাণ্ড্যান্ট ত তাদের ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে গেল, তারপর নদীর পাড় দিয়ে এগল। তা হলে কি ওগুলো আসলে খুঁড়ি ছিল না? নদীর পাড়ই ছিল? কিন্তু তখন তা হলে সেটা নজরে পড়ল না? সে আর কম্যাণ্ড্যান্ট ত ঐ খুঁড়ির জল দেখলও কিছুক্ষণ।
ঘোষ দাঁড়িয়ে পড়ে। তার পথ ভুল হওয়া সম্ভব নয়। সোজা হাটছে।
কিন্তু আরো কয়েক পা গিয়ে তার মনে পড়ল–ওগুলো যদি খাড়িই হবে তা হলে গাড়িটা সেখান দিয়ে নামিয়ে তোলা হল কেমন করে? তা হলে নিশ্চয়ই খাড়ি ছিল না–পাড়টাই ভেঙে আর-একটু ভেতরে ঢুকে গেছে। কিন্তু সে আর কম্যাণ্ড্যান্ট ত সে-সব জায়গা দিয়ে হাঁটলও। তা হলে গাড়িটা চলেছে কিন্তু সে টের পায় নি নাকি? তার রাস্তা ভুল হচ্ছে না ত? ঘোষ দাঁড়িয়ে পড়ে।
দাঁড়িয়ে পড়ার পর সে পেছন থেকে হামলে পড়া বাতাসের আওয়াজ দুই কানের পাশে পায়। কিন্তু বৃষ্টি পায় না। তার ওয়াটারপ্রুফের ওপর বৃষ্টির ছাট লাগার আওয়াজ সঁ সঁ করে কানে বাজে। বৃষ্টিটা বোধ করার জন্যে সে ঘুরে দাঁড়ায়। মুখের চামড়ার ওপর বৃষ্টির ছাটগুলো একসঙ্গে এসে বেঁধে। ঘোষ আবার ঘোরে ও হাঁটতে শুরু করে। আর, কয়েক পা হাঁটতেই সে যেন চেনা জায়গার একটা আভাস পায়। সে দাঁড়িয়ে পড়ে টর্চটা জ্বেলে বাঁ দিকে আরো কয়েক পা হাটে, হ্যাঁ, তাদের ক্যাম্পের কাটাতারের বেড়া শুরু হল। সে তা হলে পথ হারায় নি। কিন্তু খাড়িগুলো গেল, কোথায়।
