এই দুই ক্যাম্পের লোকজন পরস্পরের চেনা। অনেকেই অনেককে নাম ধরে ডাকে। হাটে দেখা হয়। ডিউটি করতে গিয়ে দেখা হয়। চৌকি মারতে গিয়ে দেখা হয়। সেই ঘনিষ্ঠতা না থাকলে বাংলাদেশের সীমান্ত ক্যাম্পের কম্যাণ্ড্যারের পক্ষে কি আর সম্ভব হত বন্যার মুখে তাদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা?
কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতায় ত কোনোদিন এরকম এক জায়গায় থাকাখাওয়া হয়নি। তাই যেটুকু আনন্দ হচ্ছে–সেটা পিকনিকের আনন্দের মত। সেই আনন্দটুকুকেই সবাই একটু বাড়িয়ে নিতে চাইছে।
বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যার ভারতীয় কম্যাণ্ড্যান্টকে জিজ্ঞাসা করে, দাদা, একডা স্কচ রাইখছি আপনার তানে। বাহির করি?
কম্যাণ্ড্যান্ট আধশোয়া হয়ে বলে, করেন।
.
১১৭.
দুই সেনাপতির সংলাপ
কম্যাণ্ড্যারের ঘরে দুটো ক্যাম্পখাট পাতা–দুটোর মাঝখানে দেয়াল ঘেঁষে একটা টেবিল, টেবিলের ওপর একটা লণ্ঠন, আর পায়ের দিকে দুটো দরজা–দু দিকের বারান্দায় যাওয়ার। ঘরটাতে দুটো খাটই পাতা থাকে। আর-এক জন যে থাকে সে হয়ত আজ অন্য কোথাও শোবে, বা, হয়ত দুটো খাট পাতা থাকলেও ব্যবহার হয় একটাই।
কম্যাণ্ড্যান্ট লুঙি আর স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরে উত্তর দিকের খাটটাতে বসে। তার রিভলবারসহ বেল্ট খুলে বালিকাকেশ টেনে বের করে। খাল। ডালাটা পুরো খুলতে ওপর রেখে, তালা বন্ধ খুলে বালিশের পাশে রাখা। কম্যাণ্ড্যার টেবিলের ওপর দুটো গ্লাশ রাখে, তারপর চৌকির তলা থেকে এক টিনের সুটকেশ টেনে বের করে। আবার উঠে টেবিলের ড্রয়ারের ভেতর থেকে একগোছা চাবি নিয়ে কোমর ভেঙে সুটকেশের তালাটা খোলে। ডালাটা পুরো খুলতে হয় না, বা হাতে তুলে রেখে ডান হাতটা ঢুকিয়ে একেবারেই বোতলটা বের করে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রেখে, তালা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় কম্যাণ্ড্যার। তারপর চাবিটা ড্রয়ারে রেখে পা দিয়ে সুটকেসটা আবার খাটের তলায় ঠেলে দেয়।
আপনাদের ভাই এই একটা বড় সুবিধা–সিগারেট, পান ফার্স্ট ক্লাশ, মদও পান ফার্স্ট ক্লাশ, বেনসন এ্যান্ড হেজেস-এর প্যাকেটটা হাতে তুলে কম্যাণ্ড্যান্ট বলে।
সে ত দাদা আপনাদেরই বা কম কেনে? যারা স্কচ খাওয়ার তারা স্কচই খায়, কম্যাণ্ড্যার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বোতলের ছিপি খোলে।
আরে যারা খাওয়ার, তারা ত খাইবেই, আপনাদের এখানে যারা না খাওয়ার তারাও ত খাইতে পারে, ইচ্ছা কইরলে।
উল্টাটাও ত আছে দাদা।
উল্টাটা আবার কী?
যেইলা স্কচ চায় না, দেশী চায়, স্যালায় খাবেটা কী?
অ। ফরেন লিকার তৈরি হয় না?
হয় এখন একটা ডিস্টিলারিতে। কিন্তু আসলে হামরালার বেশিটাই একেবারে খাঁটি ফরেন।
তা যাই কন। খাইতে চাল্যে ত খাইতে পায়। আর এই সিগারেট–এ ত আপনাদের সব দুকানেই পাওয়া যায়।
আরে ইন্ডিয়ার য্যাম ক্যাপস্টান-ট্যাপস্টান, এইঠে. স্যানং এই সব সিগারেট।
কিন্তু ঐযে কইল্যাম খাঁটি ফরেন। আমাদের ত নিজেদের ফ্যাক্টরি, ফরেন পাব কুথায়?
হামলার একটা স্টেট এক্সপ্রেসের ফ্যাক্টরি আছে কিন্তু সেও ত পুরা ফরেন।
কম্যাণ্ড্যান্টের সামনে গ্লাশটা এগিয়ে দিয়ে কম্যাণ্ড্যার গ্লাশটা নিয়ে নিজের চৌকিতে বসে। কম্যাণ্ড্যারের বয়স বেশি নয়, রংপুরের রাজবংশী ছেলে, তার কথার মধ্যে রাজবংশী ভাষা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা আছে। কিন্তু রংপুরেরই এই বর্ডারে কাজ করছে বলে সে-সুযোগ খুব একটা বেশি পাচ্ছে না। ভবিষ্যতে যদি যশোহরের দিকে বদলি হয়, তা হলে বেশ খানিকটা কাটিয়ে উঠতে পারে। কম্যাণ্ড্যান্টের বয়স বেশি–সেই সুবাদে এর আগেই দুজনের দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বটে কিন্তু তা না হলেও কম্যাণ্ড্যান্ট এই দুজনের মধ্যে সব সময়ই বড়র স্বীকৃতি পেত। কম্যাণ্ড্যান্ট এখানে লুঙিগেঞ্জি পরে বসে আছে ত অত বড় একটা দেশ ইন্ডিয়ারই লোক হিশেবে-বাংলাদেশের কাছে সেটা একটা মহাদেশই বটে। গ্লাশটা তুলে ধরে কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, কী? টোস্ট করব্যান নাকি? কী কইবেন? ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী?
কম্যান্ড্যার একটু হাসে, সে যাদের করার করিবার দেন। আপনি ত আর এই ফ্লাড না হইলে আসিতেন না। ফ্লাডের নামে টোস্ট করি।
হে-হে করে কম্যাণ্ড্যান্ট হেসে ওঠে, আরে, আপনার ত বুদ্ধি আছে খুব। ত কোন ফ্লাডের নামে কইরবেন–যে-ফ্লাডের ভয়ে এইখানে আসছি, না যে-ফ্লাডের চোটে এইখানে আরো দুই দিন থাকব?
কম্যাণ্ড্যার হো-হো হেসে ফেলে-কোন ফ্লাড কায় জানে। গ্লাশটা তুলে এগিয়ে দেয়, কম্যাণ্ড্যান্টও গ্লাশটা তার গ্লাশের সঙ্গে মেলায়, কম্যাণ্ড্যার বলে–থ্রি চিয়ার্স ফর ফ্লাড়।
কম্যাণ্ড্যান্ট চুমুক দিয়ে গ্লাশটা রেখে বলে, আপনাগ এইখানে নাকি ফ্লাডের লোকজন আইস্যা উইঠছে? কোথায়?
কম্যাণ্ড্যার তার মাথার দিকের বেড়াটা দেখিয়ে বলে–ঐ দিকে, রান্নাঘরের পাছত ত্রিপলের দুইখান ছাউনি ফেলি দিছি। বিকালে ত শুনিলাম শ-খানেক হবা পারে, এ্যালায় আরো বাড়ি গিছে নিশ্চয়। ইন্ডিয়ার লোজকনও ত আসিছে শুনিছু। বিকালের টাইমত ইন্ডিয়াই বেশি আসিছে। এখনো।
তা ইন্ডিয়ার ক্যাম্পসুষ্ঠু আইসছি, মানষেরা যাবে কোথায়? আপনারা কি ক্যাম্প খুইলছেন নাকি?
আরে না না, ত্রিপলের ছাউনি কিছু, মাথাখান বাঁচিবে আর জল নামিলে ত চলি যাবে। এই ডাঙাখান ত অনেক উচা।
