ইতিমধ্যে ঘোষের নির্দেশে ভারতীয় বাহিনী এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আবার স্ট্যাণ্ড এ্যাট ইজ হওয়া মাত্র ভারতীয় কম্যাণ্ড্যান্ট গিয়ে বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যারকে জড়িয়ে ধরে। বাংলাদেশের কম্যাণ্ডার ভারতীয় কম্যাণ্ড্যান্টকে জড়িয়ে ধরে বলে, আরে দাদা, আপনি ত আমারে ডর খাওয়াইয়্যা দিবার ধরিছেন, এলায় রাইফেল কাঁধে মিলিটারি মার্চ করি ঢুকি পড়িসেন। এ ত সীমান্তে গুলিবিনিময় হওয়া ধরিত, চলেন, চলেন, বলে কম্যাণ্ড্যান্টকে জড়িয়ে বারান্দার দিকে এগতে গিয়ে কম্যাণ্ড্যার হাত দিয়ে একটা ভঙ্গি করে যাতে সকলকেই আসতে বলা হয়। বারান্দায় ওঠার আগে কম্যাণ্ড্যান্ট হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলে, আরে ভাই, দাঁড়াও। ঘোষ।
ঘোষ আসতেই বলে, ঐগুলো কিচেনে পাঠাও।
সে কী? কিচেনে আবার কী? কম্যাণ্ডার জিজ্ঞাসা করে।
আরে দুইডা ভাতে সিদ্ধ দেয়ার মতন পাঠা ছিল। ওদের ঐখানে রাইখ্যা আইলে ত সর্দি লাইগ্যা। মরত। তার থিকা ভারতবাংলাদেশ মৈত্রীর ভোগে লাগুক, চলো, চলো, এবার কম্যাণ্ড্যান্টই আগে পা বাড়ায়।
কম্যাণ্ড্যান্ট আর কম্যাণ্ড্যার বারান্দায় উঠতে না-উঠতেই বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে সবাই হৈ হৈ করে মাঠে নেমে যায়, ভারতীয় জওয়ানদের প্রায় হাতে ধরেধরে বারান্দায় তুলে নিয়ে আসে। বারান্দাতে উঠেই ভারতীয় জোয়ানরা প্রথম মাথার টুপি খুলে ফেলে, তার পর ওয়াটারপ্রুফের বোতামে হাত দেয়। বাংলাদেশের প্রায় সবারই পরনে লুঙি, কারো কারো গায়ে গেঞ্জি। তাই এই সময়টুকুতে সত্যি মনে হতে থাকে যে ভারতীয় বাহিনী এই ক্যাম্পে নিমন্ত্রণ খেতেই এসেছে।
ভেজা ওয়াটারপ্রুফগুলো বারান্দার বাটামে ঝোলানো, ভেজা গামবুটগুলো খুলে একপাশে রাখা–এই সবে প্রথম দিকের কয়েকটি মিনিট যায়। এর মধ্যে গাড়ির ভেতরে প্যাকেট করে নিজেদের লুঙি বা পাজামা, গামছা ইত্যাদি জোয়ানরা নিয়ে আসে, এক জোয়ান গিয়ে কম্যাণ্ড্যান্টের প্যাকেটটা দিয়ে আসে কম্যাণ্ড্যারের ঘরে। এই নানা ছুটোছুটি হৈহৈ-এর মধ্যে যখন ভারতীয় জোয়ানরাও কিছুক্ষণ পর লুঙি বা পাজামার ওপর গেঞ্জি চাপিয়ে গল্প করতে বা তাস খেলতে বসে যায় তখন দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে চেহারাগত আর-কোনো পার্থক্য থাকে না। বাংলা ভাষার উচ্চারণের বৈচিত্র্য বাংলা দেশের বাহিনীর ভেতরে যতটা, ভারতীয় বাহিনীর মধ্যেও ততটাই। রামাশিস আর পরশমণি শুধু আলাদা। বাংলাদেশের ক্যাম্পে কোনো হিন্দিভাষী ছিল না, নেপালি ত নয়ই। রামাশিস আর পরশমণি এক ফাঁকে কিচেনে গিয়ে জেনে আসে, মাংস-ভাত ছাড়া কিছু হচ্ছে কিনা।
কিচেনে এখানে বাংলা দেশের সীমান্তরক্ষীরাই রান্না করছে। তারা বলে, কেন্ দাদা, ডাইল হইব, ছোলার ডাইল।
রামাশিস বলে ব্যস, ব্যস, হামলোগ ভেজ খায়গা, দোঠো আলু কি বেগুন সিদ্ধ লাগাবেন, ব্যস।
কিচেনের লোকরা প্রথমে ভেজটা বুঝতে পারে না। বোঝার জন্যে তাদের একটু ভাবতে হয়, নিরামিষ খাবেন? মাংস খাবেন না? ক্যা?
পরশমণি বলে, না, হামরা ত খাই না। এমনি ভেজই খাব।
বাংলাদেশের একজন হঠাৎ বুঝতে পারে, আরে দাদা বলে গিয়ে রামাশিসকে জড়িয়ে ধরে হে-হে করে হেসে ফেলে। তারপর তার অন্যান্য সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বলে, দাদারা ভাইবছে আমরা বড় গোস্ত খাওয়াইয়্যা দিব নে–হে-হে-হে-হে।
এত বড় একটা খবর ত আর চেপে রাখা যায় না। রামাশিস আর পরশমণিকে নিয়ে কিচেনের সবাই গিয়ে বারান্দায় ওঠে। তারপর যে-হলঘরটাতে সবাই মিলে গুলতানি করছে তার দরজায় দাঁড়িয়ে একজন চিৎকার করে–এই শুনো ভাই সবাই।
এতজন লোক দরজায় এসে চেঁচামেচি করায় সকলেরই নজর পড়ে এদিকে। তখন কিচেনের সেই কর্মীটি রামাশিস আর পরশমণিকে দেখিয়ে বলে, ইন্ডিয়ার এই দাদারা কিচেনে গিয়া কয় কি, লোকটি ভেজ শব্দটি মনে করতে পারে না, নিরামিষ খাইব। ক্যা? না, দাদারা ভাইবছে আমরা বড় গোস্ত খাওয়াইয়্যা দিব নে।
সকলে মিলে হেসে ওঠায় রামাশিস দু হাত তুলে বলে, আরে না, না, আমরা ভাবলাম কিয়া পাকা হ্যায়, দেখভাল করে আসি। পরশমণি আর রামাশিস বসে পড়ে। কিচেনের লোকজন আবার কিচেনে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়ায়। একজন মুখ বাড়িয়ে বলে, দাদার মুরগাটার চারটা ঠ্যাংই রাইখ্যা দিব।
ভেতর থেকে একজন তাদের পেছনে চিৎকার করে–ল্যাজ আর শিংখানও দিস দাদারে।
পরশমণি আর রামাশিস তাড়াতাড়ি একটা তাসের দলের পেছনে ভিড়ে যায়।
এখন এই ঘরটার চারদিকে তাকালে চট করে বাংলাদেশীদের আর ভারতীয়দের আলাদা করা যাবে না–সবাই এমনই মিশে গেছে। মানুষরা মিশে গেলেও তাদের পোশাক-আশাক এবং আনুষঙ্গিক কিছু-কিছু জিনিশ মিলছিল না। এখানে এই ঘরের দেয়ালে দুই রক্ষীবাহিনীর বন্দুকই সার দিয়ে দাঁড় করানো। কিন্তু বন্দুকগুলো দেখতে একরকম নয়। এই ঘরের ভেতরে টাঙানো দড়িতে দুই বাহিনীরই কিছু-কিছু ইউনিফর্ম ঝুলছে। তার রং আলাদা। দেয়ালে, জানলায় ও দরজার কপাটে, সিনেমার নায়ক-নায়িকার ছবি সাঁটা–তার ভাবভঙ্গি আর চেহারা ভারতীয়দের পরিচিত না। তাস খেলতে-খেলতে বা নেহাৎ শুয়ে-শুয়েই কোনো জোয়ান হিন্দি গান গুনগুন করে। বাংলাদেশের কেউ বলে, আরে দাদা জোরে করেন না, শুনি। দুইদেশের সিগারেট প্যাকেট আলাদা।
