তা হালে তাড়াতাড়ি চলো, না হইলে আবার অন্ধকার হইয়্যা যাব। তোমাদের সঙ্গে টর্চ লাইট আছে ত? কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে।
হা স্যার, আছে, একজন জোয়ান ওয়াটারপ্রুফের বোতাম খুলে টর্চটা দেখাতে গেলে কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, থাক, থাক, থাইকলেই হইল।
ওরা নদীর পাড় ধরেই একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করে। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে বাতাসের ধাক্কা জোরে লাগে, পা পেছিয়ে যায়, বুক আর ঘাড়টা এগিয়ে আসে। ওরা ঘাড়টা নিচু করে হাঁটে-মুখে যাতে বৃষ্টির ছাট কম লাগে। কম্যাণ্ড্যান্ট হাত দিয়ে একবার মুখ মুছে নেয়। এই বাতাস আর বৃষ্টির বিপরীতে এদের ঐ চলা দেখে বোঝা যায় এদের প্রত্যেকেরই স্বাস্থ্য কী রকম পেটানো। সেই স্বাস্থ্যই নিশ্বাসের আওয়াজে প্রমাণিত হয়ে ওঠে–চারজনের নিশ্বাসের আওয়াজ এই বাতাসনদীর আওয়াজের ভেতরেও শোনা যায়। কখনো কখনো তাদের ছোট-ছোট খাড়িমত পার হতে হচ্ছিল নদীর জল যেখানে ছোট-ছোট নালী দিয়ে ঢুকে পড়ছে।
একটু এগিয়ে তারা গাড়িটা গায়। পাঠাদুটো তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। তাদের আর গাড়িটার মাঝখানে বেশ খানিকটা মাঠ। চেঁচালে শুনতে পাবে না। ঘোষ বলে, পাঠাদুটোকে বোধহয় ত্রিপল চাপা দিয়েই মেরে ফেলল। এই, ওদের গিয়ে বলো ত ত্রিপলের ঢাকনাটা খুলে দিতে।
একজন জোয়ান ছুটে গেলে কম্যাণ্ড্যান্ট ডাকে, ঘোষ।
ঘোষ কোনো জবাব দেয় না। কিন্তু কম্যাণ্ড্যান্ট যখন কিছু বলে না, ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, কিছু বলছিলেন নাকি?
কম্যাণ্ড্যান্ট হাঁটতে-হাঁটতে ঘোষের দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলে না। এরা বেশ তাড়াতাড়িই হাঁটছিল। শ্বাসের আওয়াজ উঠছে জোরে-জোরে। কম্যাণ্ড্যান্ট কিছু ভাবছে।
কম্যাণ্ড্যান্ট আবার ডাকে, ঘোষ।
এবার ঘোষ বলে, বলুন।
আজ ত পাঠাটাঠা কাইট্যা পিকনিক হবে নে। হ্যাঁ। তা ত হবে। ওরা ত নেমন্তনই করেছে। আমাদের পাঠা কি আর আমাদের খাওয়াবে?
সেই জোয়ানটা গাড়ির কাছ থেকে ফিরে আসছে। এবার বাতাস পেছনে বলে, একটু তাড়াতাড়িই।
হ্যাঁ। আজ না হয় অগ পাঠাই খ্যাইলা। কাইল ত তোমাগো পাঠা খাইতে হব। অগ ত আর পঁঠার ফরেস্ট নাই।
হ্যাঁ। তা, নাই। বলছেন কাল দুপুরেও এ-বৃষ্টি ছাড়বে না?
না-ছাড়লে ত বাইল্যা। বাংলাদেশের ক্যাম্পেই থাইক্যা যাবা নে। ছাইড়লে যাবা কোথায়? জল দেইখল্যা না? রাত্তিরের মধ্যে সব ভাইস্যা যাবে।
হ্যাঁ। সেরকমই ত মনে হয়। এদিককার নদীগুলো বড় গোলমেলে। আমাদের ওদিকের নদীগুলো দেখে আপনি বুঝতে পারবেন, টাইম পাবেন। কিন্তু এ ত একেবারে ট্রেচারাস। কোনো আন্দাজই পাবেন না।
আরে, তোমাগো দ্যাশে বৃষ্টির জলে ফ্লাড়, আর এ্যাখন ডিভিসির জলে।
এখানে ত ডিভিসিও নাই, শুধুই বৃষ্টি।
ওরা দ্বিতীয় দলটাকে পেরয়। কম্যাণ্ড্যান্ট, ঘোষ, দুই জোয়ান যাচ্ছে নদীর পাড় দিয়ে আর উপেনদের দলটা যাচ্ছে আর-একটু ভেতরে দিয়ে। কম্যাণ্ড্যান্টদের চলার গতি দেখে ওরাও তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করে।
এখানে পাহাড় আছে। পাহাড় ভাইঙ্গ্যা জল এখানে নামে। শোনো, কই কি, এই গাড়িটা আবার ফেরত পাঠাও। চাইল আর ডাইল আর আলুগুলা নিয়্যা আসুক। এদের ক্যাম্পে কয়দিন থাইকতে হব, কে জানে? আর আমাগো ক্যাম্পে জল ঢুইকলে ত চাইল সব নষ্ট হইয়া যাবে নে।
সব চাল আনতে বলেন?
পারলে তাই। না-পারলে, যা পারে।
ঘোষ একবার পেছন ফিরে দেখে, তারপর সামনে তাকায়, এই কাদামাটিতে অত লোড নিয়ে কি এই গাড়ি আসতে পারবে? ফেঁসে যাবে।
কম্যাণ্ড্যান্ট কোনো জবাব না দিয়ে হেঁটে যায়। তারপর বলে, গাড়িতে যেকয় বস্তা পারবে গাড়িতে আনুক, আর না-হয় ত জোয়ানরা কাঁধে কইর্যা আনুক।
এতটা রাস্তা?
যা পারে তাই আনুক ত।
ওরা সামনের দলের কাছে পৌঁছে যায়। তারা দাঁড়িয়েই ছিল। একটু দূরে বাংলাদেশের ক্যাম্প, সবুজ টিন দেখা যাচ্ছে–সেন্ট্রি বক্স। এখান থেকেই লাইন করতে হবে। সবাই মিলে পেছনের লোকজনের জন্যে অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে আর বাংলাদেশের ক্যাম্পের দিকে তাকিয়ে দেখে। ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী মাত্র এইটুকু দূরত্বে এসে যেন কিছুটা অসহায় বোধ করে ফেলে, এবার সত্যি সত্যি তাদের দেশ ছেড়ে যেতে হচ্ছে। এরা যেমন, সামনে, বাংলাদেশের ক্যাম্পের দিকে তাকায়, তেমনি, পেছনে, তাকায় যে-পথটা দিয়ে তারা এল, সেই পথের দিকেও। ঐ পথেই ত ইন্ডিয়া, তাদের দেশ।
৩.৪ বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী
প্রায় সকলেরই ওয়াটারপ্রুফ আর টুপির সামনেটা ভেজা, পেছনটা সে-তুলনায় শুকনো। বন্দুকগুলো এবার আর কাঁধে ঝোলানো না, হাতে চেপে ধরা। ঘাড় সোজা, মুখ শক্ত। সবার আগে কম্যাণ্ড্যান্ট। সবার পেছনে ঘোষ। তারও পেছনে গাড়িটা। ঘোষের লেফট-রাইট-লেফট-এর তালে-তালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের ক্যাম্পে এসে ঢোকে।
তাদের দেখতে পেয়েই বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যার লুঙি পরে খালি গায়েই বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ভারতীয় বাহিনীর এরকম কুচকাওয়াজে তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে খাকি জামাটা পরে আসে। জামাটা পরতে-পরতেই প্যান্টের দিকে হাত যায়, কিন্তু প্যান্ট মানেই জুতো। তাতে ত আবার একটু সময় লাগবে। সুতরাং বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যান্ট লুঙির ওপর জামাটা চাপিয়েই বেরিয়ে আসে আবার। একজন তার ওপর ছাতা খুলে ধরে সঙ্গে যায়। কিন্তু একটু যেতে না যেতেই বাতাসে ছাতাটা উল্টে গেলে সে তাড়াতাড়ি আর-একটা ছাতা আনতে ছোটে।
