মাটিটা ক্যাটা দাও, কম্যাণ্ড্যান্ট বললে উপেন গেটটা ধরে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে মাটিটায় লাথি মারে। তাতেই নরম মাটি একটু গর্ত হয়ে যায়, গেটটা টান দিতেই কিছুটা খুলে যায়, সঙ্গে সঙ্গে পেছনের জোয়ানরা ধাক্কা দিয়ে গাড়িটা গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, একটু গেলেই গাড়িটা আটকে যায়। উপেনের পাশে তখন বটুক বর্মন গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে দেখে চেঁচায়, এই গেটখান উঁচু করি ধরো কেনে, ধরো উঁচু করি। বলে সে নিজেই গেটটা ধরে টেনে তোলে, উপেন হাত লাগায়, উপেনের বন্দুকটা দুলে সামনে চলে এলে সে সেটাকে পেছনে ঠেলে দেয়, আর দু-জন এসে হাত লাগাতেই গেটটা বেশ খানিকটা উঁচু হয়, পেছনের জোয়ানরা গাড়িটা ঠেলে দেয়, গাড়িটা এগিয়ে আসে কিন্তু চাকাটা আটকে যায়। উঁচু করে ধরে থেকেই উপেন চেঁচায়, ঐ দিকোটা টানি নেন আর এই দিকোটা ঠেলেন। গাড়ির বাঁ দিকটাকে ভেতরে ঢোকানোর জন্য দুই জোয়ান-টানে কিন্তু গাড়িটা কাত হয় না। কমান্ড্যান্ট গিয়ে উল্টোদিক থেকে ঠেলা দিতে শুরু করে। কমাণ্ড্যান্টের সঙ্গে আরো দুজন হাত লাগাতেই গাড়ির জোয়ালটা হট করে বায়ে ঘুরে যায়-কারো মাথায় লাগতেও পারত, কিন্তু গাড়ির ডান চাকাটা গেট গলে বেরিয়ে আসে। এবার সবাই মিলে জোয়ালটা ধরে টানতেই গাড়িটা বা দিকে মুখ করে গেট পেরিয়ে যায়।
কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, গেটখানা বন্ধ কইর্যা দ্যাও।
ঘোষ বলে, হ্যাঁ। নইলে ফ্লাডের জল ঢুকে যাবে।
কম্যাণ্ড্যান্ট বলে ওঠে, সব কথারই ত জবাব আছে ঘোষ। এই গেটটেটগুল্যা ত রোজই ভোলা বন্ধ হওয়ার কথা। সে হয় না ক্যান?
ততক্ষণে গাড়ি ঘোরানো হয়ে গেছে। আবার হাটা শুরু হয়। যারা এগিয়ে গিয়েছিল, তারা এদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘুরে আবার এদিকেই আসছে। কিন্তু গাড়িটা দেখে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর ঘুরে সোজা চলতে থাকে।
ঘোষ, সবারে কয়্যা দাও বাংলাদেশের ক্যাম্পের আগে যেন আবার লাইন হয়, মার্চ কইর্যা টুইকতে হবে,কম্যাণ্ড্যান্ট বলে। ঘোষ এক জোয়ানকে খবরটা দিয়ে আগের দলের কাছে পাঠায়। সে দৌড়তে শুরু করে বটে কিন্তু ওয়াটার প্রুফ আর বাতাসের ধাক্কায় এগতে পারে না।
ঘোষ, চলো নদীটা দেইখতে-দেইখতে যাই, বলে কম্যাণ্ড্যান্ট একটু কোনাকুনি নদীর দিকে হাটা শুরু করে।
এখন দলটা চার টুকরো। আগে একদল চলে গেছে। যারা গাড়িটা বের করার জন্যে গেট খোলাখুলিতে ব্যস্ত ছিল তারা একটা দল হয়ে এগয়। কম্যাণ্ড্যান্ট, ঘোষ আর দুই জোয়ান নদীর দিকে যায়। আর গাড়ি নিয়ে এখন ছয়জন চলে। যে-জোয়ানটিকে ঘোষ পাঠিয়েছিল আগের দলটাকে খবর দিতে সেই এক দলছুট ছুটছিল।
ভারতের এই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবাংলার নানা জেলার লোজন আছে, নদীয়ারই বেশি। তা ছাড়া কমান্ড্যান্ট যেন পশ্চিমবাংলারই নয়, বাংলাদেশের। নেপালি আছে কয়েকজন, বেশ কয়েকজন বিহারিও আছে। পাঞ্জাবি ছিল জনা তিন, তারা সবে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। দহগ্রামের এই এমন এক ইন্ডিয়াতেও–যেটাকে ইন্ডিয়াই ফ্লাডের সময় ভুলে গেছে–বোঝা যাচ্ছে ইন্ডিয়াটা অনেক বড় দেশ।
.
১১৫.
দেশের জন্যে দুঃখ
নদীর কাছ পর্যন্ত কম্যাণ্ড্যান্টকে আর যেতে হয় না, তার আগেই কোনো-কোনো জায়গায় নদী তাদের কাছে চলে আসে। এই মাঠ ত আর সমান না, কোথাও বেশ নিচু, কোথাও উঁচু। সেই সব নিচু জায়গায় নদীর জল ঢুকে গেছে। আর সেইসব জায়গায় জল যেরকম তোড়ে ঢুকছে তাতে মনে হয়, আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই এই পাড় একেবারে ভেসে যাবে। কম্যাণ্ড্যান্ট এরকম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখে নদীর জল এসে ঐ নিচু জমির কিনারায় ঘা মেরে আবার ফিরে যাচ্ছে, আবার নতুন স্রোত এসে ঘা মারছে।
ঘোষ, দেইখছ কাণ্ডখান!
হ্যাঁ, এখানে এরকম জল, মানে আমাদের ক্যাম্পের উত্তরে দক্ষিণপাড়া ত ভেসে গেছে এতক্ষণ?
কই, ওরা যে ক্যাম্পে আইস্যা উইঠবে কইল, এ্যালো না ত!
বুঝে গেছে যে ক্যাম্পও ভাসবে, তাই অন্য কোথাও গিয়ে উঠেছে হয়ত!
আর কুথায় উইঠবে? আর ত সব ফরেন ল্যাণ্ড?
ফরেন ল্যাণ্ডেই গেছে এতক্ষণ! না গিয়ে ভাসবে নাকি?
ওরা নদীর আরো কাছে যাবার জন্যে দু-চার পা এগিয়েই থেমে পড়েনদীর এপার-ওপার ত দূরের কথা, সামনে একটু দূরেই নদীটা আর দেখা যাচ্ছে না। নদীর খোলা বুকের ওপরে আকাশ আর নদী এখন আলাদা করা যায় না-বাতাস সেই অবকাশ দিয়ে হু হু করে বয়ে যাচ্ছে নদীর মতই বেগে কিন্তু বিপরীত মুখে। সেই বাতাসে বৃষ্টির ধারাপাত আর মাটিতে নামছে না বাতাসে কাত হয়ে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে, আকাশেই আবর্ত তৈরি করছে। আর তাতে নদীর বুকের ওপর এমন কুয়াশা তৈরি হয়েছে যে, কিছু দেখা যাচ্ছে না। নদীর স্রোত চলছে মাটির ঢাল অনুযায়ী। অত জল অতখানি ঢাল বেয়ে যখন গড়াচ্ছে তখন তার একটা আলাদা আওয়াজ ওঠে, আকাশ গমগম করে। কিন্তু এখন ত সে আওয়াজটাও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বিপরীতমুখী বাতাসের ধাক্কায়। বাতাসের স্রোত.আর জলস্রোতের সংঘর্ষে যে-আওয়াজ উঠছে তাতে মনে হয় নদী তার খাত থেকে উঠে এসে নতুন খাত তৈরি করে ফেলবে।
দূর থেকে একটা চিৎকারের মত ভেসে আসে। কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে, কিসের চিৎকার? একটু কান পেতে শোনে ঘোষ, তারপর বলে, চিৎকার না, গান গাইছে, আমাদের ছেলেরা।
