কম্যাণ্ড্যান্ট ঘোষকে বলে, মার্চ করাই খানিকটা নিয়া যাও, তারপর ছাড়ো।
এক জওয়ান এসে কম্যাণ্ড্যান্টের সামনে দাঁড়িয়ে তার বেল্টসহ রিভলবারটা মেলে ধরে। কম্যাণ্ড্যান্ট ওয়াটার প্রুফটা ফাঁক করলে জওয়ানটি নিচু হয়ে কম্যাণ্ড্যান্টের কোমরে বেল্টটা বাধতে থাকে। ঘোষ নির্দেশ দেয়, এই তোমরা চারজন গাড়িটা নিয়ে এসো। এ-টেনশন।
এদের পায়ে বুট ছিল না বলে খট শব্দটি উচ্চকিত হল না। কিন্তু এখানে আর সেই আগের বারের মত দৌড়োদৌড়ি হুড়োহুড়ি পড়ল না। সবাই যে-যার জায়গায় দাঁড়িয়েই ছিল। ঘোষের নির্দেশে পুরো লাইনটা এক ছন্দে চলতে শুরু করল। তাদের ডান ঘাড়ের ওপরের শূন্যতায় মাথার পাশে রাইফেলের নল দুলে ওঠে, দলের চলার ছন্দ মেনে দুলে ওঠে।
পুরো লাইনটা ঘাসবনের দিকে চলে। ঘাসবনের ভেতরে তাদের প্রথম পা ফেলামাত্র বৃষ্টিতে নুয়ে পড়া ঘাসে ঢাকা-পড়ে-থাকা পথটা পায়ে-পায়ে তৈরি হয়ে যেতে থাকে।
.
১১৪.
বন্যার বাতাসের মুখে দুটি পাঁঠা
ঘাসবনের ভেতর পুরো লাইনটা ঢুকে গেলে ঘোষ অর্ডার দেয়া বন্ধ করে। লাইনটা কিন্তু চলতে থাকে যেন অর্ডার দেয়া হচ্ছে এমন তালে-তালেই। এই পথটাতে লাইন ভেঙে চলার মত জায়গা নেই। এইটুকু সময় তালে-তালে পা ফেলার অভ্যেস কিছুক্ষণ থাকে। ধীরে ধীরে বাতাসের ধাক্কায় ওয়াটারপ্রুফের কলার আর ঝুল ফতফত করে আছড়ে পড়ার আওয়াজ ওঠে। ধীরে-ধীরে তাদের পা ফেলার একটা সমবেত আওয়াজ শোনা যায়। এবং আরো ধীরে এই লাইনটার শাস ফেলার একটা। আওয়াজও এই বাতাসের মধ্যে আলাদা হতে থাকে।
যে রাস্তাটা এখন ঘাসে ঢাকা সেটা পায়ে চলা রাস্তা নয়। বর্ডার ক্যাম্প থেকে পাথর আর ইটের টুকরো ফেলে পিটিয়ে রাস্তাটা তৈরি করা হয়। বছরে একবার রাস্তাটার মেরামত হওয়ার ফলে ভৈঙেচুরে যায় না। লাইনের পেছনের গাড়িটা দুজন ঠেলছে, দুজন টানছে। তাদের বন্দুকগুলো গাড়ির ভেতর রাখা হয়েছে। গাড়িটার ওপরে ত্রিপলের ঢাকনাটা বাতাসে ফুলে ওঠে বটে কিন্তু ওড়ে না-এক-এক দিকে তিনটে স্কুর মধ্যে পাত দিয়ে মোড়া ত্রিপলে ফুটোগুলো ঢুকিয়ে দেয়। পাঠাদুটো সেই ত্রিপলের তলা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাই ত্রিপলটা বাতাস ছাড়াও নড়ছে। বাতাসের ধাক্কায় ত্রিপলটা একটু উঁচু হয়ে যাওয়ায় তার ভেতরে বাতাস ঢুকে পড়ছে–তারপর কিছুক্ষণ পাঠাদুটো চুপচাপ।
জলে ভেজা ঘাস নুয়ে পড়ে এই যে রাস্তাটাকে ঢেকে রেখেছে সেটা শেষ হওয়ার আগেই তিকার আওয়াজ কানে আসে। কম্যাণ্ড্যান্ট লাইনের পেছনে-পেছনে যাচ্ছিল। লাইনের মাঝ থেকে ঘোষ সরে দাঁড়ায়, তারপর কম্যাণ্ড্যান্টের দিকে ঘুরে বলে, নদীর আওয়াজ শুনছেন?
কম্যাণ্ড্যান্ট তখনো অত স্পষ্টভাবে নদীর আওয়াজটাকে আলাদা করতে পারে নি, সে জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে ঘাড়টা দোলায়। ততক্ষণে লাইনটা আরো খানিক এগিয়ে গেছে। ঘোষ তাও চেঁচিয়ে বলে, নদীর আওয়াজ। এবার কম্যাণ্ড্যান্ট সম্মতিতে ঘাড় দোলায়।
ঘাসবনের শেষে সেই কাঠের খুঁটি দিয়ে তৈরি উঁচু সেন্ট্রি বক্স। আসলে একটা ঘরই–দরজাও আছে। দরজাটা বাতাসে একবার বন্ধ হচ্ছে, আর খুলছে। কম্যাণ্ড্যান্ট একবার তাকিয়ে চেঁচায়–এই, ঐ দরজাটা আটক্যাইয়্যা দিয়্যা অ্যাসো। বলে, কম্যাণ্ড্যান্ট থামে। আবার বলে, লাস্ট কে ডিউটিতে ছিল্যা? দরজা খোলা রইখ্যাই সব চল্যা অ্যাসো? লাইনের সবচেয়ে পেছনে, কম্যাণ্ড্যান্টের সামনে যে-দুজন ছিল, তাদের বা দিকের জওয়ানটি লাইন থেকে বেরিয়ে মইয়ের মত সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়। সে উঠতে-উঠতেই আরো দুবার দরজাটি খোলে ও বন্ধ হয়। কিন্তু এই সেন্ট্রি বক্সগুলো বড়বড় কাঠ। আর খুঁটি আর বড়বড় পেরেক আর নাটবল্ট দিয়ে এমন ভাবে তৈরি যে ঘরটা বাকাচোরা হয়েই থাকে। সেই কারণেই এত বাতাসেও দরজাটা খুব জোরে পড়ে না।
সেন্ট্রি বক্সের তলায় কাটাতারের বেড়ার ভেতর গেট–যে-দুজন সামনে ছিল, তার গেটের সঙ্গে খুঁটির পেঁচানো তারটা খুলে গেটটা ঠেলে দেয়। সেই ফাঁক দিয়ে দলটাকে একটু বায়ে বেঁকে বাইরে বেরতে হয়। সে রকমভাবে বেরতে গিয়ে লাইনটা ভেঙে যায়। বেরিয়ে গিয়ে কেউ আর লাইনে দাঁড়ায় না। গেট দিয়ে বেরিয়েই কেউ-কেউ ঘুরে দাঁড়ায়, কেউ হাত দুটো ওপরে তুলে আড়মুড়ি ভাঙার ভঙ্গি করে আর কেউ-কেউ ডাইনে ঘুরে হাঁটতেই থাকে–থামে না।
এই জায়গাটায় একেবারেই কাঁচা ঘাস আর ঘাসের মধ্যে কাদা। ডাইনে না বেঁকে সোজা গেলেই নদী। ঘাসবনের ভেতর দিয়ে আসার সময় বাতাসের যে-আওয়াজ উঠছিল, গেটটা পেরনোর পরই সেই আওয়াজটা যেন বদলে যায়। কিন্তু বদলাবার ত কথা নয়–একটা কাটাতারের বেড়ায় আর বাতাসের আওয়াজ বদলাবে কেন। বাতাসটা একই রকম ভাবে বইছে, বৃষ্টির ছাটও একই রকম ভাবে পড়ছে, কিন্তু এদের হাঁটাটাও বদলে গেল। এতক্ষণ লাইন বেঁধে হাঁটার একটা আলাদা আওয়াজ লি, সেটা এখন আর নেই। ঘাসে ঢাকা পথ কিছুটা দেখে-দেখে আসতে হচ্ছিল, এখন তাও করতে হবে না। ফলে, নদীর আওয়াজ আর বাতালের আওয়াজ মিলে যে ঝারব তৈরি হচ্ছে সেটা কানে আসে। আর, কান একবার এলে ত ঐ আওয়াজটাই থাকে-আর-কোনো আওয়াজ শোনা যায় না।
গাড়িটা এসে গেটে আটকে যায়। যে-চারজন গাড়িটা নিয়ে আসছিল তার ভেতর থেকে একজন এসে গেটটা ঠেলে দেয়, কিন্তু গেটটা বেশি খোলে না। আর একবার আর-একটু জোরে ঠেলতে গেটের ওপর দিকটা নড়ে, তলার দিকটা সরে না। এই গেটও ত ঐ ভাবেই তৈরি, তাছাড়া গেটটা পুরো খোলার ত দরকারও পড়ে না সাধারণত। উপেন এগিয়ে গিয়ে মাটিটা দেখে চেঁচায়, ঠেলিলেই খুলিবে নাকি? এইঠে ত মাটি উচ্যা হয়্যা আছে।
