এবার ওরা একে-একে কাঁধে করে করে আনতে থাকে দুটো পাঠা, দুবাণ্ডিল কলাপাতা, পলিথিনের চাদর দিয়ে মোড়া হোট-ছোট কিছু প্যাকেট। পাঠাদুটো গাড়ির মধ্যে প্রথমে এদিক-ওদিক তাকায়, তারপর পাশের ঢাকনাটা পা দিয়ে টপকাতে চায়। কিন্তু বারকয়েক পিছনে গিয়েই বোঝে যে ওখানে ওঠা যাবে না। তখন গাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভ্যা-ভ্যা করে বারকয়েক চেঁচিয়ে চুপ করে যায়। বোধহয় ঐটুকু সময়ের মধ্যে ওদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হওয়ায়, বিপদের আশঙ্কাটাও ওদের কেটে যায়। তবু চাপা গলায় একটা ছোট ভ্যা-ভ্যা ডেকে দেয়, একসঙ্গে নয়, একটার পর আরেকটা।
অনেকেই ততক্ষণে বৃষ্টির মধ্যে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে। বাতাস তাদের গায়ের ওপর হামলে পড়ছে, বৃষ্টির ছাট তাদের মুখের ওপর এসে সুচ বেঁধায় কিন্তু তৎসত্ত্বেও তাদের যেন এই বৃষ্টিতে ও হাওয়াতে দাঁড়াতেই ভাল লাগছে। এতগুলো লোকের এই বৃষ্টিতে মাঠে এসে দাঁড়ানোর মধ্যেই যেন বৃষ্টি ও বাতাসকে অস্বীকার করা আছে।
কম্যাণ্ড্যান্ট তার ঘর থেকে নীচে নামে, সিঁড়ি দিয়ে, একটু ধীরে-ধীরে। তার গায়েমাথায় কোথাও ওয়াটারপ্রুফ কিছু ছিল না। সিঁড়িয়ে পা দিতেই বৃষ্টি আর হাওয়ার মধ্যে পড়ে যায়। এক জওয়ান দৌড়ে গিয়ে কম্যাণ্ড্যান্টের ঘরের মধ্যে ঢুকে ওয়াটারপ্রুফ নিয়ে বেরিয়ে আসে। তখন বৃষ্টি আর হাওয়ার মধ্যেই কম্যাণ্ড্যান্ট সেই গাড়ির দিকে খানিকটা এগিয়ে গেছে। জওয়ানটি পেছন থেকে ওয়াটারপ্রুফটা মেলে ধরে ডাকে, স্যার। কম্যাণ্ড্যান্ট দাঁড়িয়ে হাত দুটো পেছনে মেলে দেয়, এ বৃষ্টি কি আর এই কোটে ঠেকবেনে? বলতে বলতে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কম্যাণ্ড্যান্ট কোর্টটা পরে, কিন্তু বোম লাগায় না, তারপর টুপিটা নিয়ে ভেজা মাথায় চাপাতে গেলে জওয়ানটি বলে ওঠে, স্যার, মাথাটা মোছেন।
কম্যাণ্ড্যান্ট হাত বাড়ায়। সে দৌড়ে গাড়িটার কাছে গিয়ে একটা পলিথিনের ব্যাগ থেকে তোয়ালে নিয়ে ছুটে আসে। কম্যাণ্ড্যান্টও দু পা এগিয়েছে। দাঁড়িয়ে পড়ে মাথাটা মুছে টুপিটা চাপায়।
কী ঘোষ? চলো, স্টার্ট দাও। তোমার ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা কী কইরল্যা?
আমারিতে ডিউটি দেবে তিনজন না, ছয় জন। আর্মারির ওপরে ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। জল যদি আর্মারিতে ঢোকে তা হলে আর্মস এমিউনেশন হাতে তুলে রাখবে। এই ত ব্যবস্থা। আর সবাই যাচ্ছি।
তা হলে চলো, আর দেরি কইর্যা লাভ কী?
গাড়িটার ভেতর থেকে একটা পাঠা নিচু স্বরে ডেকে ওঠে, ভ্যা-অ্যা। অন্য পাঠাটি যেন সেই ডাকের সঙ্গত রাখার জন্যে আরো নিচু স্বরে আরো সংক্ষিপ্ত ডাকে, ভ্যা।
কী? ফল ইন করাব নাকি? ঘোষ জিজ্ঞাসা করে।
করো, বেশ মার্চ কইরতে কইরতে যাওয়া যাবেনে, কম্যাণ্ড্যাট বলে।
ফল ইন করলে ঐ গাড়ি নেয়া যাবে কী করে? বটুক জিজ্ঞাসা করে।
কম্যাণ্ড্যান্ট ঘোষের দিকে তাকায়। কম্যাণ্ডাণ্ট বলে, তা হালি এমনিই চলল।
ঘোষ হুইসল মুখে দিয়ে হুইসল নামিয়ে আনে, না। ফল ইন করতে হবে। ফল ইন করে আমারিতে গিয়ে আর্মস নেয়া হবে, তারপর আবার ফল ইন। তারপর ডিসপার্স।
কম্যাণ্ডাণ্ট ঘাড় হেলাতেই ঘোষ চেঁচিয়ে হুকুম দেয়–ফ-অ-ল ইন।
যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা দুজন করে দাঁড়িয়ে পড়ে। যারা তখনো ঘরে ও বারান্দায়, তাদের ভেতর। একটা তাড়াহুড়ো পড়ে যায়। কেউ-কেউ বারান্দা থেকে লাফিয়ে মাঠে নামে, নেমেই দৌড়য়। বাতাসের আওয়াজের চাইতেও গামবুটে কাদা ভেঙে দৌড়নোর আওয়াজ প্রবল হয়। সেই আওয়াজের মধ্যেই ঘোষের হুকুম আবার শোনা যায়–অ্যাটেনশন।
তখনো ভেতরের দিক থেকে কারো কারো দৌড়ে আসার আওয়াজ বাধানো বারান্দা দিয়ে ধপধপ করতে-করতে ছুটে আসে, তারপর আচমকা থেমে যায়। বারান্দা থেকে মাঠে লাফিয়ে নেমে তারা লাইনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঘোষের হুকুমে লাইনটা চলতে শুরু করে। ঘোষ পাশে-পাশে হাঁটতে-হাঁটতে লেফট লেফট করতে করতে আর্মারির দিকে এগয়। লাইনটা যখন আর্মারির সামনে পৌঁছয় তখনো একজন এক হাতে এক জোড়া গামবুট ঝুলিয়ে খালি পায়ে জলের মধ্যে দৌড়তে-দৌড়তে লাইনের শেষে এসে দাঁড়ায়।
আর্মারি থেকে যে-যার রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে এসে আবার লাইনে দাঁড়ানো শুরু করে। আমারির ভেতরে লাইন বেঁধেই সবাই একে-একে ঢোকে, যেখানে যার রাইফেল থাকে, সেখান থেকে রাইফেলটা তুলে কাঁধে ঝুলিয়ে আবার লাইনে এসে পঁড়াতে-দাঁড়াতে বারকয়েক ঝাঁকি দিয়ে রাইফেলটাকে কাঁধের ওপর ফিট করে নিচ্ছে। এমন-কি লাইনে দাঁড়ানোর পরও কাধ ঝাঁকিয়ে রাইফেলটা ঠিক করে নিতে হয়।
এই লাইনের প্রতিটি লোকের কাঁধে বন্দুক ওঠা মাত্রই পুরো লাইনটার চেহারা যেন পাল্টে যায়। এতক্ষণ ছিল ওয়াটারপ্রুফ, গামবুট আর টুপির লাইন। তাকালেই বৃষ্টিবাদলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বন্দুক কাঁধে উঠতেই বৃষ্টিবাদল অবান্তর হয়ে যায়। এমনকি এই যে বাতাস এই ধাঁধা লাইনের গায়ে হামলে পড়ছে আর টুপির আচ্ছাদনের ভেতরেও বৃষ্টির ছুরি বিধছে সেসব যেন রোদের মতই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতা মেনে নিয়েই এই পুরো লাইনটা রাইফেল কাঁধে তুলে নিয়েছে, আর, রাইফেল কাঁধে ওঠা মাত্রই এই বাহিনীর পেশাগত পরিচয় যেন প্রধান হয়ে ওঠে–ইন্ডিয়ার সীমান্তরক্ষার কাজ।
