উপেন, রামাশিস আর আসিন্দির আর্মারির ছাদে উঠে ত্রিপল খাটাচ্ছিল। ছাতের ওপরেই লোহার পাইপ থাকে, সে পাইপ ফিট করার জন্যে ছাদের মধ্যে বড় নল লাগানো আছে। সেই নলগুলোর মধ্যে। পাইপগুলো ঢুকিয়ে নাটবল্ট লাগাতে হয়। উপেন নাটবল্ট লাগাচ্ছিল আর টাইট দিচ্ছিল। আর রামাশিস ও আসিন্দির তলা থেকে কাঠের মই বেয়ে ত্রিপল টেনে তুলছিল। ত্রিপলটা ভারী–মাঝখান দিয়ে একটা ছোট বাশ চালিয়ে দু জনে কাঁধে করে সেটা তুলছিল। রামাশিস ওপরে, আসিন্দির নীচে। মইয়ের মাঝামাঝি উঠতেই রামাশিসের দিক থেকে ত্রিপলটা গড়িয়ে আসিন্দিরের দিকে চলে যায়। ফলে ত্রিপলের পুরো ওজনটাই আসিন্দিরের ওপর চাপে।
খাড়া কেনে, খাড়া কেনে, বলতে বলতে আসিন্দির ডান হাত দিয়ে বাঁশটা উঁচু করে ধরে চেঁচায়, তিরপলখান টানি নে রামাশিস, টানি নে।
রামাশিস মইয়ে হেলান দিয়ে ডান হাতে বাঁশটাকে ধরে রেখে, বাঁ হাতে ত্রিপলটা টানে কিন্তু নাড়াতে পারে না। আর-একবার জোরে টানে, তাতেও ত্রিপলটা নড়ে না।
কিয়া? তিরপল ঠিক হ্যায় ত রে? রামাশিস জিজ্ঞাসা করে।
আরে ঠিক না-ঠিক সে ত টাঙিবার তানে দেখিম, এলায় বাশখান নামি দাও কেনে। আসিন্দিরের কথা শুনে রামাশিস তার দিকের বাশটাকে মইয়ের ওপরে রেখে এবার মইয়ে হেলান দিয়ে দুই হাতে ত্রিপলটাকে টানে। প্রথম টানটা একটু সাবধানে দেয়। তার গায়ে ওয়াটার প্রুফ, পা খালি। জোরে টান দিলে যদি পিছলে যায়, তা হলে মই থেকে উপুড় হয়ে ত্রিপল-আসিন্দির সব নিয়ে একেবারে মাটিতে পড়বে। প্রথম টান দিয়ে একটু বুঝে নিয়ে সে দু হাতে দ্বিতীয় টানটা দিতেই ত্রিপলটা সড়াৎ করে সরে আসে।
ঠারো, ঠারো, বলে রামাশিস এবার তার বাশটাকে মইয়ের আরো উঁচুতে তুলে দিয়ে ত্রিপলের পাশ দিয়ে দু ধাপ নেমে, ত্রিপলের তলা দিয়ে ধাশটা ধরে।
হাঁ, ঘোড়াসে টান লাগাও, বলে সে বাশটাকে পেছনে টানে, আসিন্দিরও বুঝে বাশটা ধরে থাকে। এবার রামাশিস বা হাতে বাশটাকে উঁচু করে ধরে, উঠো, আভি উঠো, বলে মইয়ের সিঁড়ি ভাঙে।
এরকম করে রামাশিস তিনটি সিঁড়ি ভাঙতেই বাঁশের মাথাটা ছাতের ওপর উঠে যায়। রামাশিস বলে, থোড়াসে নামাও, আসিন্দির নীচে নামায়। মাথার বাশটা ছাতের ওপর পড়ে। রামাশিস চেঁচায়, এ উপীন, পাকড়ো ভাইয়া, জলদি। উপেন এসে বাঁশের মাথায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তার হাতে রেঞ্চ আর প্লায়ার্স। আসিন্দির আর রামাশিস এবার বাশটাকে উঁচু করতে করতে মইয়ের সিঁড়ি ভাঙে। তাদের দিকের বাশটা উঁচু হতে থাকে। ত্রিপলটা গড়িয়ে গিয়ে হাতের ওপর পড়ে। উপেন বাশটা ধরে নেয়। বাশটাকে ছাতের ওপর ফেলে দিয়ে সে আবার নাটকটু টাইট করতে যায়।
ছাতের পুব সীমায় আর পশ্চিম সীমায় তিনটে-তিনটে ছটা টিউব দাঁড় করানো, মাঝখানেরটা উঁচু, দুপাশে সমান মাপের নিচু। এই ছটা লাগানো হয়ে গেলে আবার আড়াআড়ি তিনটে লাগানো হবে–তার ওপর দিয়ে ত্রিপলটা ফেলা হবে। উপেন খাড়া টিউব সবগুলোই লাগিয়ে ফেলেছিল। রামাশিস সেগুলো নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখে আবার পুবের দুটো টিউবের গোড়া টাইট করে। ততক্ষণে আসিন্দির আর উপেন আড়াআড়ি টিউবটা নিয়ে প্রথম লাইনের খাড়া টিউবের সঙ্গে লাগাতে থাকে। এই লাগানোর জন্যে টিউবের মাথাগুলির মাঝখানে কাটা ও দুদিকে ফুটো। নাটকগুলো উপেনের পকেট। সে পকেটে হাত দিয়ে একটা নাট বের করে টিউবগুলোর মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে হাতে কন্টু লাগায়। সেজন্যে আসিন্দিরকে বিপরীত দিকে টিউবটা উঁচু করে ধরে রাখতে হয়।
এক দিকের বন্টু লাগিয়ে আসিন্দিরের দিকে এসে সে-দিকের টিউবগুলোতে নাটবল্ট উপেন লাগানো শুরু করতেই রামাশিস এসে উপেনের হাত দিয়ে লাগানো নাটক টাইট দিতে থাকে।
আসিন্দির গিয়ে ত্রিপলটার ভাজ লম্বালম্বি খুলতে শুরু করে। খুলতে গিয়ে তাকে ত্রিপলটা দু হাতে একটু টেনে আনতে হয়–তার পর ভাজ খুলে-খুলে এগিয়ে যায়। ভাজটা খুলে ফেলার পর আসিন্দির দেখে দড়ি নেই। এখন ত্রিপলের দুই মাথায় আর মাঝখানে দড়ি বেঁধে টিউবের ওপর ফেলে ওদিক থেকে টানতে হবে। আসিন্দির মইয়ের দিকে যেতে-যেতে বলে, খাড়াও কেনে, মুই দড়ি আনিবার যাছু।
আসিন্দির নাইলনের দড়ি নিয়ে আসতে-আসতেই রামাশিস আর উপেনের টিউব ফিট করা হয়ে যায়। তারপর দড়ি বেঁধে টেনে তুলতে গিয়ে ত্রিপলটা ঠেকে যায়। আসিন্দির দড়িটা পরের টিউবের সঙ্গে বেঁধে ত্রিপলটাকে বাশ দিয়ে খোঁচাতেই সেটা টিউবের ওপর উঠে যায়। তখন আবার তার পরের টিউবে, যেটা একটা উঁচু সেটাতে তুলতে হয়।
আর্মারির ছাতে ত্রিপলের ছাউনি উঠে যায়।
.
১১৩.
বাংলাদেশ অভিমুখে কুচকাওয়াজ
ইতিমধ্যে সেই ফ্ল্যাগ তোলার মাঠে বা পি-টির মাঠে একে-একে সবাই এসে জড়ো হচ্ছে। এখন আর-কেউ বৃষ্টির জন্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই, বরং, সকলেরই বারান্দা ছেড়ে মাটিতে নামার তাগাদা যেন বেশি। প্রত্যেকেই ইউনিফর্ম পরে নিয়েছে, পায়ে গামবুট আর গায়েমাথায় ওয়াটারপ্রুফ। বিভূতি ঘোষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুইসল বাজাচ্ছে।
বটুক বর্মন, পরশমণি সুন্দাস, আষাঢ়, সুভদ্র আর পঞ্চানন টানতে-টানতে ও ঠেলতে-ঠেলতে একটা ঠেলাগাড়ি নিয়ে আসছে পেছন থেকে। গাড়িটা দেখতে অনেকটা জিপগাড়ির সঙ্গে লাগানো ট্রেইলারের মত। বড় বড় টায়ারের চাকা, সামনে কাঠের দুটো উঁচু দণ্ড, জোয়ালের মত–সেটা ধরে টানা যায়, বা গাড়ির পেছনে লাগিয়ে নেয়া যায়। ওরা গাড়িটা টেনে এনে রাখে। তারপর আবার ফিরে যায়।
