এই, কে ছিলা এক্সচেঞ্জে? কম্যাণ্ড্যান্ট সবার দিকে তাকায়।
আমি ছিলাম, কিশোরীচাঁদ বলে। বাতাসের ধাক্কায় দরজাটা এত জোরে খোলে যে পাল্টা ধাক্কায় আবার বন্ধ হতে যায়। এবার একজন দরজাটা এটে বন্ধ করে ছিটকিনিটা লাগিয়ে দেয়। ফলে, বাতাসের আওয়াজটা কম আসে।
কী? কোনো মেসেজ দিব্যার বা নিব্যার পারল্যা?
না, না। কিসের? অল ডেড।
কোচবিহারও ডেড?
যাহা কোচবিহার, তাহা জলপাইগুড়ি। স্যার, এই রকম ফ্লাডে আবার কবে আমরা মেসেজ পাই? সব জায়গাতেই ত জল।
হ্যাঁ। আর মনেই বা রাইখছে কেডা যে এইখানে তিস্তার মুখে একখান ইন্ডিয়া আছে? কম্যাণ্ড্যান্টের গলায় যেন একটু বিষাদ। সেই বিষাদে সে একবার দরজা দিয়ে বাইরে তাকাতে চায়। দরজাটা বন্ধ থাকায় বাইরেটা দেখা হয় না বটে কিন্তু তার তাকানোটা থাকে।
তা হলে করবেনটা কী, সেটা ত আপনাকেই ঠিক করতে হবে, টাইমও ত আর নেই, বিভূতি ঘোষ টুল থেকে বলে।
আচ্ছা, এই নিয়ে এত ভাবার কী আছে? এখানে ফ্লাডের জল আসছে- আপনারা কি ফ্লাডে ভাসবেন নাকি? যদি ভাসতে চান, ভাসুন, আর যদি ভাসতে না চান বাংলাদেশের ক্যাম্প চলুন, কাস্টমসের লোকটি বলে।
কম্যান্ড্যান্ট তার দিকে একটু তাকিয়ে থাকে। তার তাকানোতে বোঝা যায় সে অন্য কিছু ভাবছে।
আপনি ত ভাবছেন ইন্ডিয়া ছেড়ে বাংলাদেশে গিয়ে উঠবেন কিনা। তা এখানে ত আপনার বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশই নেই। উঠবেন কোথায়? কাস্টমসের ভদ্রলোক আবার বলে।
কম্যাণ্ড্যান্ট তার দিকে তাকিয়েই ছিল। এবার তার ঠোঁটে একটু হাসি দেখা যায়।
আর ক্যাম্প ছাড়ছেন কোথায়? বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে টর্চ ফেললেই ত দেখা যাবে। রাতে না হয় একবার এসে দেখে যাবে কেউ, কাস্টমসের লোকটিই আবার বলতে থাকে, ব্যাপারটা ত রাতের কয়েক ঘণ্টা, এই নিয়ে এত ভাবার কী আছে?
যদি হেডকোয়াটার্স থিক্যা কোনো মেসেজ আসে? কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে।
নো রিপ্লাই হবে। বুঝবে ফ্লাডে সব নষ্ট হয়ে গেছে, বটুক বর্মন জবাবটা দেয়।
কম্যাণ্ড্যান্ট সোজা হয়ে বসে, শোনো, তা হলে এখনই মুভ করো। সবাই ফুল ইউনিফর্মে– ইউনিফর্ম ভিজে ত ঢোল হয়ে যাবে, বটুক বর্মনই বলে।
ক্যান? তোমাদের ওয়াটারপ্রুফ নাই নাকি? না। ইউনিফর্ম ছাড়া বাংলাদেশের ক্যাম্পে যাওয়া যাবে না। ফুল ইউনিফর্ম উইথ আর্মস।
আর্মস নিগি করিবেনটা কী?
এতগুলা আর্মস আমি কি এইখানে খালি রাইখ্যা যাব নাকি? তা হালে যাওনের কাম নাই। কম্যাণ্ড্যান্ট তার সিদ্ধান্ত জানায়।
আমরা নেয়ার পরও ত থাকবে–সেগুলো?
সে-সব আমি অর্ডার দিচ্ছি। তিনজন এক্সট্রা সেন্ট্রি ডিউটিতে থাকব আর্মারির ছাদে, ঐখানে ত্রিপল ফিট করো। কুইক। আর সবাই ইন ফুল ইউনিফর্ম উইথ আর্মস টু বাংলাদেশ ক্যাম্প, কম্যাণ্ড্যান্ট উঠে দাঁড়ায়।
.
১১২.
‘টু বাংলাদেশ উইথ আর্মস’ : আয়োজন
গত কয়েকদিন ধরে সারাটা ক্যাম্প এই বৃষ্টি আর বাতাসে যেন ধীরে-ধীরে চাপা পড়ে গিয়েছিল। বুধবারের কথা ছেড়ে দিলেও বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে এই বৃষ্টি ক্যাম্পটাকে যেন গিলে ফেলল। বোধহয় এর ভেতরে একটা নিয়ম সকলের অজ্ঞাতেই কাজ করে। সাধারণত রাতভর বৃষ্টি হয়ে সাকালে রোদ ওঠে। তাতে কারো কিছু এসে যায় না, বরং রাতের বৃষ্টিতে একটু আরামে ঘুমনো যায়। সারা বর্ষাকালে দু-চারবার রাতের বৃষ্টি সকালে ছাড়ে না, সারা দিন হয়ে সন্ধের দিকে হয়ত ধরল, বা, সে রাতেও হয়ে, তার পরদিন সকালে বেশ পরিষ্কার হল। তাতেও কারো কোনো কাজ আটকায় না–বর্ষার মধ্যে অন্তত দু-চারবার এরকম বৃষ্টি না হলে চলবে কেন? কিন্তু দুরাতেও যে বৃষ্টি থামে না, তৃতীয় রাত্রির দিকে গড়িয়ে যায় আর সে রাত পোহানোর পরও দেখা যায় আকাশটা নেমে এসেছে, বাতাসের জোর আরো বেড়েছে আর বাতাসের বেগে বৃষ্টির জল আকাশেই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে-সে বৃষ্টি তখন ধীরে-ধীরে পুরো ক্যাম্পটাকে দখল করে নেয়। এমনিতেই ত কাজকর্ম কিছু নেই। তবু সকালের পি-টি, সপ্তাহে একদিন রুট মার্চ, তরি-তরকারির বাগান করা, ডিউটি শিফট, দিনরাত ধরে এক-একটা গ্রুপের সীমান্ত এলাকায় চৌকি দেয়া–এসব কাজের মধ্যে দিনটা ত একরকম ব্যস্ততাতেই কেটে যায়। কিন্তু এরকম বৃষ্টিবাতাসে সেই সব কাজই একে-একে বন্ধ হয়ে যায়। পি-টি সবচেয়ে আগে বন্ধ হয়, রুটমার্চের কথাই ওঠে না, ডিউটি-শিফট নিয়মমত হয় বটে কিন্তু আমারির বারান্দায় ছাড়া অন্য কোথাও সেটা বোঝাও যায় না, দু-একটা গ্রুপ ওয়াটার প্রুফ চাপিয়ে ছোটখাট চৌকিতে বেরয় বটে কিন্তু সে শরীরের খিল ভাঙবার জন্যে। খাওয়াদাওয়াও একঘেয়ে হয়ে আসে। রাতদিন শুয়ে বসে বা তাস খেলে সময় আর কিছুতেই কাটে না। এক এক সময় মনে হয়–এক্যাম্পে বোধহয় জনমনিষ্যি থাকে না। আলসেমি কাটানোর জন্যে হঠাৎ-হঠাৎ কারো চিৎকার-চেঁচামেচি ছাড়া মানুষজনের স্বাভাবিক স্বর শোনাই যায় না।
কম্যাণ্ড্যান্ট হুকুম দেয়া মাত্র হঠাৎ সারাটা ক্যাম্প যেন জেগে উঠল। বাতাসের ভেতরও যাতে শোনা যায় এমন চড়া গলায় ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি শুরু হয়ে গেল। যে-মাঠটা গত কয়েক দিন ধরে খালি পড়েছিল, সেখান দিয়ে ওয়াটার প্রুফ মাথায় দৌড়ে চলে যায় কেউ। কেউ আবার পিঠের দিকটাতে ওয়াটার পুফের ঢাকনি দিয়ে জলের ছাট আটকে বারান্দায় কোনো কাজ সারে। পেছনের দিক থেকে নানা রকম চিৎকার আর আওয়াজ উঠতে শুরু করে। বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে নিমন্ত্রণ অন্তত পুরো ক্যাম্পটাকে জাগিয়ে দিল।
