গো-গো আওয়াজটা থেকে যায়। এবার ভারতের কম্যান্ড্যান্টকে জবাব দিতে হবে কিন্তু কম্যান্ড্যান্ট চট করে যেন জবাব খুঁজে পায় না। একটু চুপ করে থাকে, তারপর বলে, হ্যালো, মোতাহার ভাই? ওদিক থেকে আবার সেই গো গো আওয়াজ আসে–একটু সময়ের জন্যে। কম্যান্ড্যান্ট আবার একটু সময় নেয়, তারপর বলে, মোতাহার ভাই, আমাদের হেডকোয়ার্টাসে ত ফোনের কোনো লাইনই পাচ্ছি না, আপনি বলতেছেন ক্যাম্প, মানে আমাদের ক্যাম্প ভাসিবেই? আবার সেই গো-গো আওয়াজ। কম্যান্ড্যান্ট যেন হঠাৎ জবাবটা পেয়ে যায়।
হ্যালো মোতাহার ভাই। আমি এডু সবার সাথে কথা বইল্যা নেই, দেখি জলপাইগুড়ি বা কোচবিহারের সঙ্গে কনট্যাক্ট করা যায় কিনা। তারপর আপনারে ফোন দিব নে।
বাংলাদেশ থেকে আবার গো গো আওয়াজ আসে।
না, না, হাফ অ্যান আওয়ার, না, ধরেন ফিফটিন মিনিটস পরে আপনারে ফোন করব। না। বুঝছি ত, দেরি হয়্যা গেলে সব দিকেই লোকন। তবে, আমার একটা রিকুয়েস্ট। যদি আমাগো আপনাদের ঐখানে শিফট কইরতেই হয়, তা হলে আমাগো র্যাশন আমরা সঙ্গে নিয়্যা যাব।
বাংলাদেশ থেকে আরো একটা সংক্ষিপ্ত গোগোর পর কম্যান্ড্যান্ট আবার হে হে হাসি শুরু করে কিন্তু শেষ করতে পারে না, আচ্ছা, রাখি। রিসিভারটা রেখে দিয়ে রিসিভারে হাত রেখেই কম্যান্ড্যান্ট ঘোষকে বলে–সবাইরে ডাকো। ওরা শিফট কইরবার কয়। ফ্লাড নাকি সামনে বাড়তেছে। রাত্তিরে নাকি এই ক্যাম্পে জল ঢুইকবে।
.
১১১.
ইন্ডিয়ার গোপন আলোচনা
কম্যাণ্ড্যান্ট টেবিলের সামনে তার চেয়ার ছেড়ে টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে এসে বসে দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। বিভূতি ঘোষ সবাইকে খবর দিতে যাওয়ায় এখন কম্যাণ্ড্যান্টের চোখের সামনে ক্যাম্পের মাঠটুকু, মাঠটুকুর শেষের ঘাসবন, ঘাসবনের শেষের গাছগাছালি। কিন্তু সেই গাছগাছালি দেখাচ্ছে যেন দিগন্তসীমা বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট এত ছড়াচ্ছে। এমন কি সামনের ঐ ঘাসবনটাই যেন অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। ক্যাম্পের এই মাঠটুকুতে ঘাস বা গাছ নেই বলে বাতাস আর বৃষ্টির পাক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাতাস এত জোরে আছড়ে পড়ে এত দ্রুত পাক খাচ্ছে যে বৃষ্টির জল কুয়াশার মত জমাট বেঁধে বাতাসের ধাক্কায় আবার আবর্তের মত হয়ে যাচ্ছে। কমান্ড্যান্ট যেন এই প্রথম বৃটিাকে বুঝতে চায়।
দরজা থেকে আজিজ বলে, স্যার, মুই যাছ? তার গায়ে ওয়াটার প্রুফ, মাথায় টুপি
অ্যাঁ? হা, হা। তোমার সাহেবরে সালাম দিও আজিজ।
হ্যাঁ স্যার, দিম।
কম্যাণ্ড্যান্ট তাকিয়ে দেখে আজিজ সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, বাতাস সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে দিচ্ছে যেন। যাবে কী করে, আসার সময় ত বাতাসটা পিঠে ধাক্কা দিয়েছে, এখন তা বুকে দেবে।
কম্যাণ্ড্যান্ট সেটা দেখতে-দেখতেই আজিজ তার চোখের আড়ালে চলে যায়। আজিজকে সারাটা রাস্তা হেঁটেও যেতে হতে পারে। হতে পারে না, হেঁটেই যেতে হবে। সাইকেলটা এখানে রেখে গেলে পারত; তা হলে তাড়াতাড়ি যেতে পারত।
বিভূতি ঘোষ ঘরে ঢুকে কম্যাণ্ড্যান্টের পেছনে চলে যায়, তারপর কোণ থেকে একটা টুল টেনে নিয়ে বসে বলে, ওরা বলল কী, ফ্লাড আসবেই?
হু।
আমাদের রেডিয়াতেও ত তাই বলছে।
হুঁ।
তা হলে ত শিফট করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
তা হলে আবার সবাইকে ডাকলেন কেন?
কম্যাণ্ড্যান্ট কোনো জবাব দেয় না। আসলে সে একটা দ্বিধার মধ্যে পড়েছে। যদি ক্যাম্প তুলে দিয়ে। ওদের ওখানে শেলটার নিতে হয়, সেটা তারই সিদ্ধান্ত। ক্যাম্পের আর সবাইও বলবে-কম্যাণ্ড্যান্টের হুকুমে গিয়েছি। কিন্তু গেলে ত ওই কয়েক ঘণ্টার জন্যে বা রাত্তিরের জন্যে ইন্ডিয়ার সীমান্তে কোনো পাহারা থাকবে না।
ক্যাম্পের অন্য অনেকে একে-একে এসে যায়–অনেকে বলতে জনা দশবার মাত্র। তার মধ্যে। কাস্টমসের একজন আছে। কেউ-কেউ ঘরের ভেতর এসে দাঁড়ায়, কেউ-কেউ দরজার বাইরে। যারা। দরজার বাইরে তারা চিৎকার করে, কী বলবেন স্যার বলুন, বৃষ্টিতে, দাঁড়ানো যাচ্ছে না এখানে।
তা ওখানে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আর কথা কইবা কী কইর্যা, ভিতরে আস, ভিতরে আস, বলে, চেয়ার থেকে উঠে কম্যাণ্ড্যান্ট নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে। কম্যাণ্ড্যান্ট এতক্ষণ যে-চেয়ারে বসে ছিল, সেটা বিভূতি ঘোষ টান দিয়ে পেছনে নিয়ে যায়। কাস্টমসের ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে সেই চেয়ারটিতে গিয়ে বসে। তার পেছন-পেছন আর-সবাইও ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, দরজাটা বন্ধ কইর্যা দ্যাও।
দরজার কাছে যে-ছিল সে দরজাটা আবজে দেয়।
শুইনছ ত সব, তা হইলে কও তোমরা, কী করা যায়?
এর আবার বলা কওয়ার কী আছে? ফ্লাড আইসলে ত সামনের উঁচু ডাঙায় উঠতেই হবে।
তোমরা শুইনছ ত, বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যার আমাদের অনুরোধ কইরছে আইজ রাইত তাদের ক্যাম্পে কাটাইতে।
ত তাই চলুন। যেতে হলে ত এখনই যেতে হবে। না হলে সন্ধ্যা হয়ে গেলে ত আরো বিপদ।
পুরা ক্যাম্পে তালা মাইরা চলা যাব সবাই? কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে, আসলে জলপাইগুড়ির সঙ্গে একটা কনট্যাক্ট হইলেই আর-কোনো ঝামেলা হইত না। কিন্তু হেডকোয়াটার্সের পার্মিশন ছাড়া ক্যাম্পটা এরকম বন্ধ কইর্যা দিব? কম্যাণ্ড্যান্ট চুপ করে, অন্যরাও সমস্যাটা নিয়ে ভাবে।
