কেন? অফ কেন? কার ডিউটি ছিল? কম্যান্ড্যান্ট তার চেয়ারের দুই হাতল ধরে জিজ্ঞাসা করে একটু উঁচু গলায়। কিশোরীচাঁদ ভিড়ের ভেতর থেকে এক্সচেঞ্জের দিকে সরে যায়। কিন্তু তাড়াতাড়ি হেঁটে বা দৌড়ে যায় না। তা হলে ত ধরাই পড়ে যাবে ডিউটি তার ছিল। তা ছাড়া বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে এই দুর্যোগে মেসেঞ্জার এল কেন সেটাও সে জেনে যেতে চায়। এমনিতে এ ক্যাম্পে কে কোথায় কখন ডিউটি করছে তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই-রুটিন কাজগুলো হয়ে গেলেই হল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে ফোন করে না পাওয়াটা সাধারণ ব্যাপার না। তার ওপর আবার ফোন না পেয়ে সাইকেল চড়ে মেসেঞ্জার এসেছে।
আজিজ তখন বলছে, স্যার, ক্যাভার সাহেব জানিবার চাহেন তোমারালার পাছত কোনো ফ্লাড ওয়ার্নিং আসিছে কি আসে নাই?
কেন? তোমাদের কাছে কিছু এসেছে নাকি? কম্যাভ্যান্ট একটু ঝুঁকে পড়েন।
সে ত বাবু কহিবার পারিম না। মোক কহি দিছে তোমারালার ওয়ার্নিং আসিছে কি আসে নাই পুছিবার তানে, আজিজ বলে। কম্যান্ড্যান্ট একটু ভাবে, তারপর হঠাৎ জিজ্ঞাসা করেন–এই, এক্সচেঞ্জে কে আছে? কোনো ওয়েদার মেসেজ আসছে না কি?
ততক্ষণে কিশোরীচাঁদ এক্সচেঞ্জের কাছে চলে গেছে। সেখান থেকে সে জবাব দেয়, না, আসে নাই।
তুমি ত ফোনের কাছে ছিলাই না, জাইনল্যা কেমন কইর্যা? কম্যান্ড্যান্টের গলায় আধা-তিরস্কার।
আমি ত এখানেই ছিলাম, কিশোরীচাঁদ এক্সচেঞ্জের দরজা থেকে গলা তুলে বলে।
ছিল্যা ত ছিল্যা। এখন দেখো, কোথাও ফ্লাডের কোনো খবর পাও কিনা–কোচবিহার দেখো, জলপাইগুড়ি হেডকোয়ার্টাস দেখো। আজিজ, তোমাদের কোনো খবর নাই? কম্যান্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা। করে।
খবর আর কোটত পাম? এ্যালায় ত দুই নম্বর ভাসি গেইসে।
দুই নম্বর? ভাইস্যা গিছে? কম্যান্ড্যান্ট দাঁড়িয়ে পড়ে, সেখানে ত তোমাগো অনেক লোক।
হ্যাঁ, সগায় আসি ক্যাম্পত ভিড় করিবার ধরেছে।
তোমাদের ক্যাম্পে দুই নম্বরের লোকজন আইস্যা গিছে? সাইরছে। তা হালি ত এই ক্যাম্পতেও আইসবার ধরব, কম্যান্ড্যান্ট এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, এ-ই দ্যাখোত দক্ষিণপাড়ার খবর কী? কম্যান্ড্যান্ট চিৎকার করে বলে। এখানে যে-ভিড়টা জমে ছিল সেটা ধীরে-ধীরে কেমন সরে যায়। এক বিভূতি ঘোষ দাঁড়িয়ে থাকে। কম্যান্ড্যান্ট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই বৃষ্টির ছাটটা আচমকা বাতাসে এদিকে ফেরে, কম্যান্ড্যান্ট তাড়াতাড়ি পেছিয়ে আসে, আজিজ দেয়ালের দিকে মুখ করে আর ঘোষ ঘরের ভেতর ঢোকে।
স্যার, কম্যান্ডার কহি দিছেন, আপনার সঙ্গে ফোনে কথা কহিবার চান। উমরায় ফোনের পাশতই আছেন আপনি ফোন ধরিলেই কাথা কহিবার পারিবেন।
আরে, তাই নাকি, খাড়াও, তা হইলে কথা কয়্যাই নেই, কম্যান্ড্যান্ট ফোনের দিকে হাত বাড়াতেই আজিজ বাধা দিয়ে বলে, স্যার, আমার আর-একখান ম্যাসেজ আছে স্যার, সেইটা শুনি ফোনখান ধরেন।
আছে নাকি? কও, কও।
স্যার, কম্যান্ডার বলিছেন, এ্যালায় রাতিভর পানি বাড়িবার ধরিবে, এ্যানং বাতাস দিবা ধরিছে, তোমরালার ক্যাম্পের সায় হামলার ক্যাম্পে আজি রাতিত্ সাগাই নিমন্ত্রণ খাইবেন।
অ্যাঁ? সাগাই দিছে তোমার কম্যান্ড্যার? হে-হে করে হেসে ওঠে কম্যান্ড্যান্ট।
হ্যাঁ, স্যার, সগায় আজি হামরালার ক্যাম্পত চলেন, ওইঠে রাতিটা থাকিবেন, কালি সকালে বাও-জল কমিলে এইঠে আসিবেন। আজিজ তার মেসেজ শেষ করে।
আরে শুইনছ বিভূতি ঘোষ, সারা ক্যাম্পড়া তুইল্যা যাইতে হবে, কাম দেখছনি?
বলে কম্যান্ড্যান্ট আবার হে-হে করে একচোট হেসে ওঠে। তার হাসিতে মনে হয়, এটা বাইরের দুর্যোগের কোনো ব্যাপার নয়, ফুর্তির ব্যাপার।
আপনি ত চিল্লিয়েই যাচ্ছেন, ও যে আপনাকে একটা ফোন করতে বলল, বিভূতি ঘোষ কম্যান্ড্যান্টকে মনে করিয়ে দেয়।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলোত কানেকশন করতে, কম্যান্ড্যান্ট ফোনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়। বিভূতি ঘোষ রিসিভারটা তুলে বলে, বাংলাদেশকে কানেকট করো, তারপর কম্যান্ড্যান্টকে বলে, ধরুন। কম্যান্ড্যান্ট তখন আজিজকে বলছিল, তোমরা কি পাঠাটাঠা কাইট্যা সাগাই ডাইকতে বারাইছ? এই কথাটা শেষ করতে করতে হাতটা বাড়িয়ে দিলে বিভূতি ঘোষ রিসিভারটা ধরিয়ে দেয়।
রিসিভারটা একটু ধরে থেকে কম্যান্ড্যান্ট চিৎকার করে ওঠেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, তারপর গলাটা নেমে আসে, ইয়েস, ইন্ডিয়া স্পিকিং, ইন্ডিয়া স্পিকিং, ইন্ডিয়া স্পিকিং। হ্যালো, কম্যান্ড্যান্ট ইন্ডিয়ান বর্ডার আউটপোস্ট, দহগ্রাম, স্পিকিং। তারপর হঠাৎ গলা চড়িয়ে দেয় কম্যান্ড্যান্ট, যেন ভিড়ের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে, যাকে খুঁজছিল তাকে পেয়ে গেছে, আরে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মোতাহার ভাই? আরে, আজিজ আইসছে ত, কয়, সবার নাকি সাগাই খাওগার কথা হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, কম্যান্ড্যান্ট হাসতে থাকে। বিভূতি ঘোষ নিচু স্বরে বলে, উনি কী বলতে চাইছেন, সেটা আগে শুনে নিন, তারপর হাসুন। শুনে, কম্যান্ড্যান্ট হাসি থামিয়ে বলে ওঠে, হ্যাঁ,বলেন,কী হইল? তারপর রিসিভারে শুধু , ই করে যায়। টেলিফোন থেকে একটা গো গো আওয়াজ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের বাতাস কোনো বাধার সামনে আচমকা পড়ে গিয়ে আওয়াজ তোলে, আবার কোথাও প্রয়োজনের চাইতে বেশি চওড়া পথ পেয়ে কেমন হা-হা করে ওঠে। ফোনে বাংলা দেশের কম্যান্ডারের গলা বাইরে থেকেও বোঝা যাচ্ছিল, ঘোষ সেটা কান পেতে শোনে।
