এখন চরের মত হয়ে গেলেও আসলে ত এটা ছিটমহল, এখানকার মাটি তাই পুরনো ও শক্ত, তিস্তার বেলেমাটির মত আলগা নয়। গাছগাছড়ায় পুরো গ্রামটি ঘেরা। শুধু ঘেরাই নয়, ভরাও। সীমান্তের নিয়মঅনুযায়ী এই আউটপোস্টের ভেতরের প্রায় সমস্ত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে–যে দুটি-একটি গাছ এদিকে-ওদিকে ছড়ানো সেটাও ক্যাম্পের দরকারেই। একটা বিরাট আমগাছ-কম্যান্ড্যান্টের প্রাইভেট-এর সোজা পশ্চিমে, প্রায় নদীর কাছাকাছি। ওখানে চাঁদমারি হয়। আর-একটা বড় সিসু গাছ থেকে গেছে ঐ বন্দুকের পাকা ঘরের পেছনে সিধে উত্তরে। কেন, তা এখন আর অনুমান করা যায় না। কিন্তু এরকম দু-একটি গাছ বাদে ক্যাম্পের চারপাশ, চারপাশেই অন্তত মাইলখানেক জায়গাও, একেবারে খোলামেলা। সেই ঘাসবনের সীমানায় কাটাতারের বেড়া ঘেঁষে খুটির ওপর গার্ডরুম–একটা পুবে, একটা পশ্চিমে। সেখানে দুই শাস্ত্রীর রাতদিন বাইনোকুলার নিয়ে পাহারা দেয়ার কথা। কোনো দিনই কেউ ওখানে একা-একা বসে থাকে না। যার নাইটডিউটি থাকে সে আর কাউকে সঙ্গে নিয়ে রাতটা ওখানে ঘুমিয়ে আসে। এখন ত কোনো কথাই নেই–ক্যাম্প ভাসতে বসেছে, এখন আবার গার্ডরুম কী?
ভারতের সীমান্ত চৌকিটাই এ রকম একটু বেখাপ্পা ও একটেরে, কারণ, এখানে দেশ নেই কিন্তু সীমান্ত আছে তিস্তার যে-ঘোলাটে স্রোত এই সীমান্তের ওপর আছড়ে পড়ে বায়ে-ডাইনে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সেটাকে যদি দেশ বলে ধরা যায়, তা হলে অবিশ্যি দেশ আছে। কিন্তু শীতের সময় যদি পাতলা, শুকনো, মাঝে মাঝে বালি-বেরনো ঐ নদীটাকে দেশ বলে মনে হতেও পারে, এখন ত মনে হচ্ছে ঐ নদীর মুখ থেকে ভেতর দিকে যত সরে যাবে তত বাঁচবে–সেই ভেতরটাই যেন দেশ। কিন্তু এই দ্বীপের মত ছিটমহলেরও মাত্র একটা অংশে ইন্ডিয়া, বাকি সবই ত বাংলাদেশের।
ফলে, বাংলাদেশের সীমান্ত চৌকিটার প্রাধান্য অনেক বেশি। তারা ত নিজেদের দেশের ভেতরে বসে বসে নিজেদের সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। তাদের ত আর কোনো সময় মনে হয় না যে তারা দেশের বাইরে গিয়ে দেশকে পাহারা দিচ্ছে। এমন-কি, এখন যে তিস্তার বন্যা সেই ইন্ডিয়া থেকে এত জল নিয়ে এই বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে, আজ এই শনিবার বিকেলে আর ভরসা হচ্ছে না যে রাতের ঘন্টা কটা নিরাপদে কাটবে, আর এখন তাড়াতাড়ি, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই একটা কিছু উপায় ভেবে রাখতে হচ্ছে–তাতেও ত ভারতের সীমান্তচৌকির সমস্যা আর বাংলাদেশের সীমান্তচৌকির সমস্যা এক নয়। বাংলাদেশের ওরা হয়ত সবাই মিলে এতক্ষণ নৌকোয় ডাইনে-বায়ে কোথাও পার হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ার ত পার হওয়ারও জায়গা নেই, পার হতে হলে সেই বাংলাদেশেরই কোথাও যেতে হবে। সপ্তাহে একদিন বা দুদিন কয়েকজন মিলে হাট করে আনা এক জিনিশ, আর সেখানও ত আইনের এই ছুতোটুকু থাকে যে হাটটা অর্ধেক ভারতে বসে, সুতরাং বেআইনি চালান বন্ধ করার জন্যে তারা রাউন্ডে যায়। কিন্তু তাই বলে পুরো ক্যাম্প তুলে দিয়ে বাংলাদেশেরই এক জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নেয়া ত আর যায় না। আবার, না নিয়ে উপায়ই বা কী?
কমান্ড্যান্ট বলে, এক কাজ করো। তোমরা এখন নৌকোটা নিয়্যা ওপার যাও। কয়েকটা শিফটে যত জন পারো যাও। আমি বাকিদের নিয়্যা এইখানে থাকি। রাত্তিরে যদি জল ঘরে ঢোকে, তখন আমরাও নৌকায় চইড়া বসব।
বিভূতি ঘোষ বয়স্ক লোক। সে বলে, কথাটা মন্দ বলেন নি। তা হলে রাতে না গিয়ে এখনি চলে যান না!
কোথায় যাব? কম্যান্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে।
রাতের ঐ অন্ধকারের মধ্যে, তখন পুরো ফ্লাড, যেখানে ভেসে যাবেন।
কমান্ড্যান্ট তার চেয়ারে হেসে দুলে-দুলে ওঠে, ঘোষের কথা শুনো।
তা হলে আর এত মিটিংটিটিঙের দরকার নাই, যা হওয়ার তা হবে, বটুক বর্মন বলে ওঠে।
কী হবে তা ত বোঝাই যাচ্ছে। কী নিত্যানন্দ, বলল আবার, গায়ের লোকজন কী করছে?
নদী ত দক্ষিণের গায়ে তখনি ঢুকে গেছে–আমি ত সেই সকালে দেখে এসেছি।
তারপর জল ত আরো বাড়ল। দক্ষিণের লোকজন বলছিল–তাদের গরুবাছুর ক্যাম্পের মাঠে এনে রাখবে।
তা আনে নাই যখন, জল কমতেও পারে, কম্যান্ড্যান্ট বলে, কী বলো বিভূতি ঘোষ?
আপনার ত দেখছি বেশ আমোদ হয়েছে। এখন ইলিশমাছ আর খিচুড়ি হলেই হয়।
আরে ফ্লাডেই যদি মরতে হয় ইলিশমাছ খায়্যা মরাই ভাল, কম্যান্ড্যান্ট চেয়ারের মধ্যে হেসে ওঠে।
এমন সময় আপাদমস্তক ওয়াটার পুফে মোড়া একজন একটা সাইকেলে চড়ে হুড়মুড় করে এসে নামে। সাইকেলটাকে সিঁড়িতে রেখে লোকটি বারান্দায় ওঠে। বারান্দায় উঠে সে তার ওয়াটারপ্রুফের টুপি খোলার পরও কেউ চিনতে পারে না। তারপর ওয়াটারপ্রুফের বোম খুলতেই বটুক বর্মন বলে ওঠে, আরে আজিজ, তুমি?
আর আজিজ? রেডিও-টেলিফোন বাজি বাজি হয়রান হই গেসি। স্যালায় সাইকেল নিগি রওনা দিছু। উঃ কী বাতাস। কম্যান্ডার পাঠি দিসে।
.
১১০.
ইন্ডিয়া বাংলাদেশ বার্তাবিনিময়
সে কী? তোমরা ফোন করছিলা নাকি? কম্যান্ড্যান্ট চেয়ার থেকে পা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করে। আজিজ তখন ভেজা ওয়াটারপ্রফুটা কোথায় রাখবে সেই জায়গা খুঁজছিল, শেষে আর জায়গা না পেয়ে ফিরে গিয়ে তার সাইকেলের সিটের ওপরই রাখে। এমনভাবে ভাজ করে রাখে আজিজ, যাতে বাইরের দিকটা বাইরে থাকে।
আজিজের পরনে লুঙি, স্যান্ডো গেঞ্জি আর গামবুট। লুঙিটা ভাজ করে কোমরে গোজা। এইবার আজিজ কম্যান্ড্যান্টের দিকে তাকিয়ে বলে তোমরালার টেলিফোন কি অফ করি রাখিছেন?
