বাংলাদেশ বর্ডারের লোকজন বলল, নিয়্যা যান কেনে দাদা, আপনাদের ক্যাম্পে ফাটক দেওয়া গেইল। চোরা বলাইয়ের মাথার ওপর নেমে আসে হাট করার বিরাট ঝুড়ি, এতক্ষণ সেটা এক জোয়ান দড়ি বেঁধে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও একটা সতর্কতা থাকে। সীমান্তের কাছে কোনো হাট সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে না, তার অন্তত ঘণ্টা দু-তিন আগে শেষ হতে হবে, যাতে, হাটের লোজন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে যেতে পারে ভারতীয় বর্ডারের এ-নিয়ম এই হাটেও মানা হয়, যদিও এ হাটটাকে বাংলাদেশের হাট বলার আইনি সুযোগ অনেক বেশি। কিন্তু এই নিয়মটা মেনে নিয়ে দুই বর্ডারের সরকারি লোকজন যেমন তাদের নৌকো করে সেই সয়েদপাড়া-দহগ্রামের ছিটমহল-চরমহলগুলোতে সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্যে ফিরে যায়, তেমনি, এই বড় চর এলাকার বাসিন্দারাও নিজ-নিজ জায়গায় ফেরে। হাটে ত শুধু চরের লোকরাই আসে না, পাশাপাশি গায়ের লোজনও আসে–তারাও হাটশেষে তাদের গ্রামে পৌঁছয়। সয়েদের হাটের হাটখোলা, হাটের লোজন, দুই বর্ডারের সেপাই-জোয়ান, গরু-পাঠা-মুরগি, এমন-কি চোররাও, দুই রাষ্ট্রের এই সীমান্তকে মেনে নিয়েই সীমান্ত লঙ্ঘন করে। তিস্তা এখানে প্রকৃত সমতলের বিস্তার পেয়েছে। সেই সমতলে, ও সেই বিস্তারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জায়গাগুলিতে, সীমান্ত ত একেবারে অনতিক্রম্য ও সুনির্দিষ্ট। তিস্তা সেই অনতিক্রম্যতা ও নির্দিষ্টতাকে অন্য সময় একটা আকারও দেয়। তখন তিস্তার চরের মধ্যে টিনের লাল রং দেখে ভারতীয় বর্ডার ক্যাম্প ও টিনের সবুজ রং দেখে বাংলাদেশ বর্ডার ক্যাম্প চিনে নেয়া যায়। তখন চরের ওপর কাটাতারের যে-বেড়া একটা সীমান্তের সঙ্কেত হয়ে থাকে, সেটা মেনে নিয়ে তিস্তাও যেন নিজের ভেতরে একটা অঘোষিত কাটাতারের বেড়া তোলে।
কিন্তু এখন বন্যার তিস্তা সেই সমস্ত সীমান্তচিহ্নকে লোপাট করে দেয়। যেমন সূর্যের আলো বা রাত্রির অন্ধকার সীমান্ত মেনে চলে না, তিস্তাও এখন সেরকম। আজ শনিবারের বিকেল। চারপাশ থেকে তিস্তা এই চরগুলোর ওপর উঠে আসছে, কোনো একটি চরের ওপর নয়–সেই নাউয়াপাড়া থেকে ঐ নীচের ছয় নম্বর দহগ্রাম পর্যন্ত সবগুলো চরের ওপর দিয়ে তিস্তা বয়ে গিয়ে ছিটমহল, চরমহলের আন্তর্জাতিক সমস্যা দূর করে দেবে। বুধবার থেকে জল বাড়ছে। কিন্তু এখানকার বৃষ্টি ত থেমেও গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার শেষ রাত থেকে হঠাৎ আকাশ ক্রমেই বিবর্ণ হতে শুরু করে আর বাতাস যেন খুবলে মাটি তুলে ফেলতে চায়। এখন এই শনিবারের বিকেলে ঘোলা আকাশ আর ঘোলা তিস্তা মিলে যেন একটা সুড়ঙ্গের মত হয়েছে।
.
১০৯.
বাংলাদেশের দূত ইন্ডিয়ায়
ভারতের সীমান্ত চৌকিতে রেডিও-টেলিফোন বেজে ওঠে। এক্সচেঞ্জে কেউ ছিল না। এখন ডিউটি কিশোরীচাঁদের, সে কম্যান্ড্যান্টের ঘরের সামনে অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। একটা এল-প্যাটার্ন ব্যারাকের মাথায় কম্যাভ্যান্টের ঘর আর তার সমকোণে, শেষে এক্সচেঞ্জ-সুতরাং ফোন বাজলে শুনতে পাওয়ারই কথা। কিন্তু বাতাসটা বিপরীত দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল আর কম্যান্ড্যান্টের ঘরে এরাও নিজেদের মধ্যে জোরে জোরে কথা বলছিল–তাই ফোনের বাজনা আর শোনা যায় না।
ওপরে ভামনির ছাউনি আর পাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে এই একটাই ব্যারাক–এই ব্যারাকের দক্ষিণ আর পুবের দিকটা অফিস আর পশ্চিম ও উত্তর দিকটা প্রাইভেট। আসলে ভামনির ঘর একটা–সেই ঘরটা দুভাগ করা, বাঁশের বাতার পার্টিশন দিয়ে। এই প্রাইভেট-দিকে অবিশিষ্ট একটা ঘর খুব লম্বা–সেখানে জওয়ানরা থাকে। অফিসের দিকের মাঠটা পরিষ্কার–এক দিকে ভলি আর ফুটবল খেলার মাঠ, তারও পরে অনেকটা দূর পর্যন্ত মাঠটা ঘাসেঘাসে ছড়িয়ে গেছে। সেখানকার ঘাসগুলো বড়কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নেতিয়ে আছে। তারও পরে কাটাতারের বেড়া। প্রাইভেট-দিকটাতে একটা আলগা ঘর রান্নার জন্যে। আর-একটা ছোট আলগা ঘর- ইটের দেয়াল, চুনকাম করা, লাল টিন, একটা বারান্দা, একটা কোল্যাপসিবল গেট, তার পেছনে একটা কাঠের দরজা–এই ঘরটাতেই বন্দুক ও হয়ত আরো কিছু অস্ত্র থাকে। বারান্দায় দুজন শাস্ত্রী পোশাক পরেই পাহারা দিচ্ছে।
এই ছোট ঘরটা ও শাস্ত্রীরা ছাড়া আর-কোথাও রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনো পরিচয় নেই। এমনকি কমান্ড্যান্টের অফিসের সামনে লোহার যে-ফ্ল্যাগস্টাফটিতে ভারতের জাতীয় পতাকা রোজ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত ওড়ে, সেই ফ্ল্যাগস্টাফটি ভিজে ও তার গায়ের দড়িটি স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে! বৃষ্টির জলে ফ্ল্যাগস্টাফের রং অনেকটা ধুয়ে গেছে–শাদা রঙের মাঝে-মাঝেই লোহার দাগ। ফ্ল্যাগস্টাফটা একটা সিমেন্ট বানো বেদির ওপরে। বেদিটাকে গোল করে ইটের কেয়ারি-এক দিকে একটু ফাঁক। ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ আগস্ট ওখান দিয়ে গিয়ে কম্যান্ড্যান্ট পতাকা উত্তোলন করে। অন্য দিন নাইট ডিউটির সেন্ট্রি পতাকা তুলে দিয়ে ডিউটি থেকে অফ হয়। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ফ্ল্যাগস্টাফের কেয়ারি কাদায় ঢাকা পড়েছে। ফ্ল্যাগ গত কয়েকদিন ভোলা হচ্ছে না। প্রথম দিনের বৃষ্টিতেই এত ভিজে গেছে। যে কম্যান্ড্যান্টের অফিসের বেড়ায় শুকোবার জন্যে গুঁজে দেয়া হয়েছিল। বুধবারে শুকয় নি। বৃহস্পতিবারে দিনের বেলায় শুকবার আশা ছিল, কিন্তু তারপরই ত এই বৃষ্টি বাতাস শুরু হল। এখনো, ফ্ল্যাগটা শুঁকতে দেয়াই আছে–কিন্তু একটা ছোট লাঠিতে ফ্ল্যাগটা ঝুলিয়ে দিয়ে লাঠিটা বেড়ায় খুঁজে দেয়া, যেন বাইরে বৃষ্টি বলে অফিসের ভেতরে ফ্ল্যাগ তোলা হয়েছে। ফ্ল্যাগটা একটা বড় ভেজা ন্যাতার মত নেতানো। রংগুলোও একটু মিশে গেছে। গেরুয়াটার ভেতরে সবুজের ছোপ, বা সবুজের ভেতরে গেরুয়ার ছোপ অত চোখে নাও পড়তে পারে কিন্তু শাদার ভেতরে গেরুয়া আর সবুজের ছোপ খারাপ লাগবে। ক্যাম্পে আর স্পেয়ার নেই। নতুন ফ্ল্যাগ চাইতে হবে।
