যে-জলমগ্ন ডাঙায় ভাদই বাশ বেঁধে রেখে গিয়েছিল, গরুগুলো সেখানে উঠে পলমাত্র দেরি না করে হু হু বেগে সেই দুই বাঁশের লাইনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এতক্ষণ যেভাবে আসছিল, তেমন ছড়িয়ে নয়, দুই বাঁশের ভেতরের সেই জায়গাটুকুতে গায়ে গা লাগিয়ে এই এতগুলো গরু যেন একটা অগ্রসরমাণ সঁকো হয়ে যায়, মাঝখানে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে থাকে কান্দুয়া, ভাদই আর কানকাটু। আচ্ছন্ন আকাশেও এক অদৃশ্য সূর্যাস্ত ঘটছিল। সেই অভ্যস্ত গোধূলিলগ্নে, সেই বিকেলে, সেই প্রবল ঝঞ্ঝায় এই যেন অপ্রাকৃত জলরাশি ভেদ করে ভাদই কান্দুরা কানকাটু তাদের ধেনুদল নিয়ে প্রায় ফিরে আসে–
.
১০৮.
‘সীমান্তবাহিনী’র দুই অর্থ
তিস্তার মধ্যে নোয়াপাড়া, মেচিয়াপাড়া, সয়েদপাড়া, দহগ্রাম–এই চারটি চর বা ছিটমহল। এ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়েছে, কারণ, এই চারটি জায়গা আগেকার পূর্ব পাকিস্তান ও এখনকার বাংলাদেশকে কোনো এক চুক্তি অনুযায়ী দিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে পাটগ্রাম থানা ছিল জলপাইগুড়ি জেলার মধ্যে। তিস্তা এখানে বরাবরই সীমান্তবাহিনী। মণ্ডলঘাটের পর তিস্তা পুব পারে মেখলিগঞ্জ আর পশ্চিমপারে হলদিবাড়ি এই দুই জায়গার মধ্যে দিয়ে তখনকার কোচবিহার রাজস্টেট, এখনকার কোচবিহার জেলা, পার হয়ে পাটগ্রামের পশ্চিম সীমা দিয়ে রংপুরের দিকে চলে যেত। তখন পাটগ্রামের পশ্চিমের এই নদীই ছিল রংপুর আর জলপাইগুড়ির মাঝখানের সীমান্ত। এই নদীর একেবারে মাঝখানে, পাটগ্রামের একেবারে ভেতরে নোয়াপাড়া, মেচিয়াপাড়া, সয়েদপাড়া, দহগ্রাম ও আরো অনেক নাম-না-থাকা চর আসলে ছিল কোচবিহার রাজ্যের ছিটমহল ও সেই কারণে কোচবিহারের ভারতভুক্তির পর ভারত ইউনিয়নের ও পশ্চিমবঙ্গের অংশ। কিন্তু সে ত ম্যাপের অংশ। অন্য একটা রাষ্ট্রের একেবারে ভেতরে এই কয়েকটি চরের মত ছিটমহলে ভারত ইউনিয়ন বা পশ্চিমবঙ্গ তার নিত্যিনৈমিত্তিক দখল কায়েম রাখবে কী করে? কেনই বা রাখবে? যে-সব স্থায়ী জায়গা, নদীর গতিপথ বদলানোয়, অনেক দিন ধরে কার্যত নদীর চর হয়ে গেছে অথচ সেটলমেন্টে সেসব জায়গা মূল ভূখণ্ডের অংশ, তাদের জুরিসডিকশন লিস্ট নম্বর আছে, সেই সব জায়গাই ত ছিটমহল। এই সব মহল ত নদীর ভাঙাচোরায় ছিট হয়ে গেছে। কোথাও এক নম্বর আর পাঁচ নম্বর হয়ত ভারতের, দুই তিন চার হয়ত বাংলাদেশের। আবার কোথাও হয়ত আট নম্বর আর নয় নম্বর বাংলাদেশের, ছয়, সাত আর দশ ভারতের। এই রকম এক-একটা চর নিয়ে এক-একটা রাষ্ট্র হয়ে থাকা দুই রাষ্ট্রের পক্ষেই অসুবিধের। সেই জন্যেই দুই দেশের মধ্যে কিছু লেনদেন সেরে ছিটমহলগুলোকে যতদূর সম্ভব একটু সাজিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সাজিয়ে নেয়া হলেও ত নদী নদীই থাকে। চর চরই থাকে। আর, নদী নদী থাকলেও বা চর চর থাকলেও ত সেখানে রাষ্ট্র থাকে, রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকে, সীমান্তে বর্ডার আউটপোস্ট থাকে। কাস্টমসের লোকজন থাকে, সীমান্তবাহিনী থাকে, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের ক্যাম্প থাকে, সেই ক্যাম্পের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার থাকে। তেমনি, আগে যেমন পাকিস্তানের • থাকত, এখন তেমনি বাংলাদেশেরও বর্ডার আউটপোস্ট থাকে, কাস্টমসের লোকজন থাকে, বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্যাম্প থাকে, সেই ক্যাম্পের নিজস্ব অস্ত্রাগার থাকে।
কিন্তু এত কিছু ব্যবস্থা যে-সীমান্তকে রক্ষা করার জন্যে সে সীমান্তটিই এখানে থাকে না। দুই দেশের আইনসঙ্গত বা বেআইনি যাত্রীরা কেউই এত বর্ডার থাকতে এই চরের বা নদীর জলের বর্ডার পেরতে চায় না। অথচ এই বর্ডার বা নদীর চরে যে-সব মানুষজন থাকে তারা তাদের বাজারের জন্যে বা খাবারদাবারের জন্যে কাছাকাছির বন্দর এলাকায় বা হাটেই ত যায়। না গিয়ে উপায় থাকে না বলেই যায়। এমনকি ভারতীয় বর্ডার আউটপোস্টের খাবারদাবারের জন্যে, রবি আর বৃহস্পতি, সয়েদের হাটে নৌকো নিয়ে না গিয়ে উপায় থাকে না। সয়েদের হাটটা বসেই একটা অদ্ভুত জায়গায়–ওটা ত পুরোপুরি পাটগ্রাম, কিন্তু ঠিক হাটখোলায় নদীর সঙ্গে লাগানো একটা ফালি আছে ভারত ইউনিয়নের, কারণ, দেশভাগের সময় এই ফালিটা কোচবিহারের ছিটমহলের মধ্যেও আবার ছিল জলপাইগুড়ি জেলার ছিটমহল। সয়েদের হাটটা বসে এই সীমান্ত জুড়ে–তাই হাট করতে-করতেই ভারতীয় ইউনিয়নের বর্ডার আউটপোস্ট আর বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের লোকজন বাংলাদেশে ঢুকে যায় ও বাংলাদেশের বর্ডারের লোকজন ভারত ইউনিয়নে চলে আসে। হাটটা চলেই ত প্রধানত দুই বর্ডারের লোকজনের জন্যে-নইলে এত একটেরে হাটে কি এত পাঠা, খাশি বা মুরগি আসে?
হাটখোলটার পশ্চিম দিকটা বাংলাদেশের আর পুব দিকটা ভারতের। ঠিক আধাআধি নয় বাংলাদেশেরটাই আসল কিন্তু ভারতের দিকে, রাজকিশোরী পাড়ার অংশটাতে, মুরগিহাটা। ওদিকেই পাঠা-মুরগি, এমন-কি দু-চারটে গরু বাছুরও বিক্রি হয়। দু-এক সময় গরুবাছুর নিয়ে গোলমালও বাধে বর্ডারের চোরাই গরু ধরা পড়ে যায়। দু-একবার বাংলাদেশের চোর, ভারতে গিয়ে গরু চুরি করে এনে বেচছে, ভারতীয় বর্ডারের লোকরা ধরে ফেলেছে হাটে, তারপর হাটের ভেতরে ভারতের এলাকায় নিয়ে এসে প্রচুর মার দিয়েছে। বাংলাদেশ বর্ডারের লোকজনও এসে সে মারে হাত লাগিয়েছে। আর-একবার এক চোরকে বাংলাদেশেরই বর্ডারের লোকরা ধরে ফেলেছিল কিন্তু সে এক দৌড়ে ভারতীয় এলাকায় গিয়ে নিজেকে ভারতের লোক বলে ঘোষণা করল। এক দেশের নাগরিকতা ত্যাগ ও আর-এক দেশের নাগরিকতা গ্রহণের মত নাটকীয় ঘটনাও কেমন হাসির বিষয়ে হয়ে ওঠে–উমরায় ত কুচলিহাটার চোরাবলাই। চোরা বলাই সম্ভবত স্বনামখ্যাত বলেই আত্মরক্ষার জন্যে এমন একটা উপায় ভাবতে পারে। কিন্তু এই ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের একজন চোরা বলাইয়ের ঘোষণাকে মেনে নিয়ে তাকে ভারতীয় নাগরিকের স্বীকৃতি দিয়ে ঘাড় ধরে টেনে এনে তার পাছায় একটা লাথি কষায়–এতটাই জোরে যে সে হাটের এক তরকারিঅলার ঘাড়ে গিয়ে পড়ায় তার কুমড়োগুলো চারদিকে গড়িয়ে যায়। কুমড়োগুলোর কোনো-কোনোটা বাংলাদেশে চলে যায়, কোনো-কোনোটা ভারত ইউনিয়নের ফালি জমির আরো গভীরে। কুমড়োঅলা সেগুলের পেছনে-পেছনে দুই রাষ্ট্রের ভেতরে ছুটোছুটি করবে নাকি পেছন থেকে হঠাৎ তার ঘাড়ে যে চোরা বলাই এসে পড়ল তাকে চেপে ধরবে এটা সাব্যস্ত করতে না করতেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী এসে চোরা বলাইয়ের চুল ধরে তাকে সঁড় করায়। এদিকে বাংলাদেশ বর্ডার ফোর্সের লোজন বলাইকে নিতে এলে ভারতীয়রা বলে, দাদা, একে কয়েক দিনের জন্যে ধার দেন, আমাদের ঠাকুরের এসিস্ট্যান্টটা ভেগেছে।
