ভাদই এই বাঁশের লাইন টেনে নিয়ে গেল সামনের উঁচু ডাঙাটিতে–সেটার ওপরও এখন জল উঠেছে। সেখানে একটা পাতলা বাশ কাদায় এমনভাবে গাড়ে যাতে একটু স্রোতেই সেটা নুয়ে যায়। নুয়ে গেলে উপড়ে যাবে না। আর যদি যায়, তাহলে বাঁশের লাইনের ওদিকের মাথাটা বাধা থাকছে বাঁধের ঢালে। জল উঠলে সেই বাঁধনকে ভোলা যাবে। তখন যদি দরকার হয়, আর, জলের ভেতরের এই পাতলা বাশটাও যদি উপড়ে যায় তা হলে, বাঁধ থেকে এই বাঁশের লাইনটা ধরে অন্তত এই ডাঙাটা পর্যন্ত ত আসা যাবে।
কিন্তু তখন আসার দরকারটা কী? এখন না হয় গরুগুলোকে ঠিক ভাবে নিয়ে যাওয়ার জন্যে লাইন দরকার। যখন সারা তল্লাট জলে ডুবে যাবে, এমন কি বাধ থেকেও লোক সরানোর দরকার হতে পারে, তখন, এই বাঁশের লাইন ধরে জলেব তলের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার কী দরকার হবে?
দরকার হোক না-হোক, বাঁশের এই নিশানা ধরে ত সবাই বুঝতে পারবে ঐখানে জলের নীচে তাদের ঘরবাড়ি, জমিজিরেত।
এখনই সেই সব সম্পত্তির ওপর নদী। উঁচু উঁচু ডাঙাগুলোতে ঘরবাড়ির চাল দেখা যাচ্ছে, বেড়াগুলোও। নিচু জমির ঘরগুলোর চালের টুই জেগে আছে। জলের চেহারা ভাল নয়। আজ সারারাত এই বাতাস চলবে, বৃষ্টি চলবে, তাতে এই জল ফুলে উঠবে। সকালে দেখা যাবে–এখানে আর বাড়িঘর বলতে কিছুই নেই, শুধু নদী। তার ওপর এখনো ধস নেমে চলেছে। এমন সব পাহাড়ের গর্তেগুহায় জল জমে-জমে যে-হ্রদ হয়ে আছে, সেগুলো একসঙ্গে ফেটে গেলে পাহাড়ের জলে এখানে নতুন নদী তৈরি হবে। ভাদই কান্দুরা কানকাটু সেই নতুন নদীর জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নিকটতম একটু ডাঙাতে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত ডুবিয়ে ভাদই একটানা লম্বা ডাক দেয় বা থেকে ডাইনে তার মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে–হে-এ-এ কান-দূরা-আ-আ-কা-আনকা-আ-টু-উ-উ-উ। নদীর ওপারের বাতাস সে আহ্বানকে এই পারে পৌঁছে দেয়, তছনছ করে, যেন ভাইয়ের আহ্বান এদিকেই ছিল। কিন্তু নদীর ভেতরটা ফাঁকা বলে, ভাইয়ের বাতাসবিরোধী ডাক কান্দুরা কানকাটুর কাছে পৌঁছে যায় ঠিকই।
ডেকে ভাদই ওদিককার জলে নেমে পড়ে। সেখানে ডুব জল ও স্রোতের টান। তাতে ভাদই তার ছোট্টখাট্ট কোমল শরীরটাকে একটা কাঠের মত ভাসিয়ে দিয়ে আরো দূরের ডাঙাগুলোর কোনো একটাতে চলে যায়, কান্দুরা ও কানকাটুর মতই।
দু রাত্রির বাসি এই ঝড় ও বন্যায় আজকের এই প্রায় শেষবেলায় ওরা যেন শেষবারের জন্যে খতিয়ে নিচ্ছে এই বসতির সীমা-সরহদ্দ–মানুষের দখল থেকে যে-জমি নদী পুনর্দখল করেছে। সেই সীমার সবটুকু নয়, কিন্তু বেশ ছড়ানো-ছিটনো অনেকখানিতে, মাত্র তারা তিন জন এখন জলে সাঁতার কাটছে বা হাটছে বা দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর, সেই সব উঁচু ডাঙায় বেঁধে রাখা গরুগুলোকে নিয়ে তারা একসঙ্গে জলে নামে। এগিয়ে আসে সেই উঁচু ডাঙাটার দিকে, যেখানে ভাদই বাশ বেঁধে রেখে গেছে।
তারা তিন দিক থেকে আসছিল। কান্দুরা ছিল দক্ষিণের ডাঙায় আর ভাদই ছিল উত্তরের ডাঙায়। কানকাটু মাঝের ডাঙা থেকে গরুগুলোকে জলে নামায়। তিনদিক থেকে জলে নেমে পড়ায় এই এক স্বস্তি যে গরুর পালগুলিকে অন্তত কিছুটা সামলাতে পারবে, চট করে কোনো একটা পাল এদিক-ওদিক চলে যেতে পারবে না। যদি উত্তরের দিকে চলে যায় তাহলেই বিপদ। এদিকে গেলে ত তাও বাধ পাবে।
এই তিন-তিনটি পালকে একদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে হেট হেট হুট হুট করার কোনো দরকার ছিল না, তবু, ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটু মাথার ওপর ছড়িমত কিছু একটা ঘোরাচ্ছিল আর জিভ দিয়ে টাকরায় আওয়াজ তুলছিল যেন তারা মাঠ বা রাস্তা দিয়ে পালগুলিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেই আওয়াজেই হোক, আর, তাদের সামনে উঁচু বাধে এই গৃহপালিত গরুগুলো মাটির ইশারা পায় বলেই হোক, তারা যতটা সম্ভব দ্রুতগতিতে ঐ বাঁধের দিকেই ছুটছিল।
ছোটায় একটাই অসুবিধে ছিল। এই গরুর পালও এই নদীখাত এমন সরাসরি পেরতে অভ্যস্ত নয়। তা ছাড়া, কোথাও, তাদের কারো কারো বুক জল, কোথাও, কোনো-কোনো বাছুর ডুবে যায়, কোথাও-বা গাভিনের হাঁটু জেগে ওঠে ও সেই জলস্রোতের মধ্যেও জলস্থলের পার্থক্য না-বোঝা বাছুর, মায়ের বাটে হামলায়, পর মুহূর্তেই বাছুরসহ সেই গাই প্রায় পিঠ পর্যন্ত জলের ভেতরে চলে যায়।
কোনো একটি গরুও হাম্বা ডাকে না, যেন, এই গরুর পাল জানে যে তাদের সমবেত ডাকে, আকাশ আর জলজোড়া বাতাস বৃষ্টি আর সেই দূর পাহাড়ের গোপন সব হ্রদ সঙ্কেত পেয়ে যাবে। যত দ্রুত সম্ভব তারা এই নতুন নদী পেরিয়ে পুরনো মাটিতে পা রাখতে চায়।
কিন্তু ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটুর হয়ত কিছু সাহসের দরকার হয়, একটু অতিরিক্ত সাহসের। একা-একা এই পাহাড়-ভাঙা জল ডিঙতে সে-সাহসের দরকার হয় না, কিন্তু এই এতগুলো গরু নিয়ে এত দিক থেকে এই দৈনন্দিনের বাইরের জলরাশি পেরতে তাদের হয়ত দরকার হয় সেই সাহসের অতিরিক্ততাটুকু। তারা, নদীর ঐ ক্রমবিস্তারের মাঝখানে, পায়ে-কোমরে বুকে-পিঠে, আর, কখনো সারা শরীরে; ঐ জলরাশির আবর্তনের মাঝখানে, দেখে, এ-আকাশ যেন নদীর ওপর চেপে বসেছে, এরপর যেন নদী ও আকাশের মাঝখানে কোনো রেখাও থাকবে না। ভাদই হকার দিয়ে ওঠে, পার্থক্য এখনো এটুকু আছে এইটি নিজেকে বোঝাতে-হে-ই, হে-ট, হেট, খবোরদা–আ-রো-হে, খবোরদার, কান্দুরা চেঁচায়–কানকাটু বায় মারি দে, বয়ে মার।
