কিন্তু ভাদই কান্দুরা কানকাটু যেখানে, নদীর সেই শুকনো খাত, আসলে বড় তিস্তার বুকের চাইতেও নিচু। সেখানে এই বাতাস নেই, এই আওয়াজ নেই। সেখানে জলের আওয়াজ মাটির ভেতর থেকে উঠে আসছে, তারপর ছড়িয়ে পড়ছে এই জলের ওপরেই, বাতাসের সঙ্গে মিশছে না।
মহেশ্বর সেই বাতাসে তছনছ হয়। সে কাউকে দেখতে পায় না। বাধে কেউ নেই, সব চৌপত্তিতে। অথবা এই বাতাসে মাথার চুল, কাপড়চোপড়, সমস্ত এমন এলোমেলো হয়ে আছে যে একবার চোখ বুলিয়ে কাউকে চেনা যায় না। মাথার ওপরে এমন বাতাস আর পায়ের নীচে এমন জল না থাকলে মহেশ্বর জোতদারের উচিত একবার চোখ তুলেই হুকুম করার লোক পাওয়া। কিন্তু নীচে জলের মধ্যে ভাদই হাত বাড়িয়ে আছে বাঁশের জন্যে, যে গরুগুলোকে তুলে আনা হবে, তার ভেতর মহেশ্বরের গরুরই সংখ্যা বেশি, এদের দিয়েছে ফসলের ভাগ পেতে। ফসলের ভাগ পেয়ে গেলে জমির ভাগ কায়েম হয়।
কিন্তু মহেশ্বর এখন ত কাউকে পায় না বাশগুলো বাঁধের ওপর থেকে, নীচে ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। ভাদই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অগত্যা তাকে দুটো বাশ দু হাতে নিয়ে এগতে হয়। বাঁধের কিনারায় এসে ঢালের দিকে ছুঁড়ে দেয়। কোথায় পড়ল না দেখে আবার ফিরে যায়। আবার দুটো বাশ এনে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে দেয়। কোথায় পড়ল না দেখে আবার ফিরে যায়।
মহেশ্বর যখন বোঝে, তাকেই হাতে করে করে বাশগুলো নিয়ে-নিয়ে ভাইয়ের হাতে দিতে হবে, তখন সে ঠিক করে ফেলে, একটা-একটা করে বাশ নেয়ার বদলে বরং সবগুলো বাশই বাঁধের ঢালে ছড়িয়ে দিয়ে, পরে, পা দিয়ে দিয়ে গড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাঁধের উত্তর দিক থেকে গামবুটু আর খাকির মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সি চিৎকার করে হাত তোলে। বাতাসে চিৎকারটা শোনা যায় না, হাত তোলাটা দেখা যায়। মহেশ্বর দাঁড়ায়। তারপর দু পা গিয়ে বাঁধের একেবারে মাথায় যে ধাশগুলো পড়ে ছিল সেগুলো পা দিয়ে ঢালে নামিয়ে দেয়। দিয়ে, দেখে, একটা বাশও জলে পড়ল না।
জলের ভেতর থেকে ভাদই চিৎকার করে ওঠে, আরে কী করিছেন, তাড়াতাড়ি দেন কেনে বাশ, তাড়াতাড়ি দেন–
অগত্যা মহেশ্বরকে ঢাল বেয়ে নামা শুরু করতে হয় জলের দিকে, নামতে নামতে পা দিয়ে বাঁশগুলোকে সে গড়িয়ে দিতে থাকে। বাশগুলো যেন ডাঙায় নেই, জলে আছে–এমন ভাবে ঘুরে-ঘুরে যাচ্ছে। মহেশ্বরকে একবার ডাইনে, একবার বয়ে গিয়ে বাশগুলোকে পা দিয়ে ঠেলতে হয়। হয়ত একটু রেগে গিয়েই থাকবে মহেশ্বর। সে বাশগুলোকে বেশ জোরে-জোরে লাথি মারে। আর তাতেই দু-একটা বাশ ভাইয়ের হাতের সীমানায় গিয়ে পড়ে। ভাদই দুটো লম্বা বাশ তার আগে ভাসিয়ে দিয়ে নিজে সেগুলোর পেছনে ভাসে।
ঠিক সেই সময়ই মোবাইল এমার্জেন্সি বাঁধের ওপর থেকে চিৎকার করে ওঠে, এ আপনি কী করছেন, বাশগুলো আমাদের লাগবে-কাওশেড করার জন্যে।
মহেশ্বর বাঁধের ঢাল থেকে মাথা তুলে চিৎকার করে বলে–এইলা তোমার বাবার তালই রাখি গেইসে এইঠে?
শোনা গেল না বলে, নাকি মানে বোঝা গেল না বলে, মোবাইল এমার্জেন্সি কানে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কী বললেন?
একটা বাঁশ হাতে নিয়ে এমার্জেন্সিকে মারার জন্যেই যেন তুলে মহেশ্বর পেছনে ছুঁড়ে দেয়। বাশটি যে জলে পড়ল তার কোনো শব্দও ওঠে না। মহেশ্বর আঙুল এমার্জেন্সির দিকে তুলে জিজ্ঞাসা করে তোমার বাবায় আনিছে এই বাশ? তোমার বাবায়? যেন এমার্জেন্সির বাপ বাঁধের ওপরে এমার্জেন্সির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
এমার্জেন্সি তখনো কানের পেছনে একটা হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কী বলছেন?
একটা রাগ দু বারের বেশি তিনি বার করা যায় না। মহেশ্বর এমার্জেন্সিকে আঙুল দিয়ে বাঁশগুলো দেখিয়ে, নদীর ভেতর ভাইকে দেখায়। তারপর আবার বাশগুলোকে লাথি দিয়ে দিয়ে গড়াতে চায়।
বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে এমার্জেন্সি দেখে।
তারপর, বাঁধের ওপর থেকে দুটো বাশ নিয়ে বাঁধের ঢালের দিকে নামে। দু-এক পা নেমে বা হাতের বাশটা মাটিতে নামিয়ে রাখে আর ডান হাতের বাশটা মাথার ওপর তুলে, দুই হাতে ধরে। তার সামনে যেন কোনো লক্ষ আছে। সেই লক্ষ সে এই ওপর থেকে বিদ্ধ করবে, এমন ভাবে তাক করে। ভাল করে তাক করতে বা-পাটা একটু পেছিয়ে দেয়। বোঝে যে এই ঢালে এর চাইতে শক্ত ভাবে পা রাখতে পারবে না। মোটা শরীরটাকে একটু দুলিয়ে জলের দিকে বাঁশটা ছুঁড়ে দেয়। বাশটা বেশ খানিকটা ওপর থেকে বাঁধের ঢালেই চলে যায়, কিন্তু লম্বালম্বি পড়ে বলে একটা ডিগবাজি খেয়ে জলে পড়ে, ভাইয়ের বা দিকে, পেছনে। জলে যদি সে বাশ ভেসে যায় সেই ভয়ে ভাদই লাফিয়ে এদিকে আসে, একটু যেন সাঁতার কেটেই।
.
১০৭.
জলগোধূলি
এখন এই নির্জন বাধে, নির্জন বন্যায় ও নির্জন ঝড়ে-জলের ভেতর দাঁড়িয়ে, হেঁটে সাঁতার কেটে ভাদই একটা বাঁশের সঙ্গে আর-একটা বাঁশকে জুড়ে-জুড়ে লম্বা করছে, আর বাঁধের ওপর থেকে মহেশ্বর জোতদার আর এমার্জেন্সি অফিসার ঠেলে-ঠেলে তাকে বাশ জোগান দিয়ে যাচ্ছে বাঁধের ঐ ঢাল বেয়ে, কখনো পা দিয়ে বাশ গড়িয়ে, কখনো হাত দিয়ে ছুঁড়ে, কখনো জলের কাছে গিয়ে ভাসিয়ে দিয়ে। ভাদই একটার পর একটা বাশ জুড়ে যাচ্ছে আর পাটের দড়ি দিয়ে গিঠ দিচ্ছে। বাশটা হাতে যাওয়ার পর জোড়া দিয়ে গিঠ, বাধতে তার খুব বেশি সময় লাগছিল না। পিঠের কাছে যে তার কাস্তে গেঁজা ছিল, অথবা, কান্দুরা বা কানকাটু কারো ছিল-সে নিয়ে এসেছে, তা বোঝা যায় যখন ভাদই গিঠ বাঁধার পর দড়ি কাটে। এই রকম করে বাশ বেঁধে ভাদই নিয়ে যাবে, অন্তত কাছাকাছি কোনো একটা উঁচু জায়গা পর্যন্ত। দু লাইনে বাধা বাশ বন্যার জলের সঙ্গে সঙ্গে ভাসবে। এখন গরুগুলোকে এই দুই সারির মাঝখানে ছেড়ে দিলে সবগুলো সিধে বাধে উঠবে। না হলে এমন জলেভরা জায়গাটা তাদের এতই অপরিচিত যে একসঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলে যেতে পারে বড় স্রোতের দিকে। তখন এই জলের মধ্যে ভাদই কান্দুরা কানকাটুর সাধ্যও নেই গরুর পালকে বাঁচায়। দুই দিকে বাঁশের নিশানা থাকলে গরুর পালের ভুল হবে না। তা ছাড়াও, জল আরো বাড়লে, সব ডুবে গেলে, এই বাঁশের নিশানাটা অন্তত থাকবে–সব ডোবার আগে এই নিশানা ধরেই ত যাতায়াতের দরকার হতে পারে।
