অফিসারদের আসা-যাওয়ায় নদী-আকাশের চেহারাটা যেন আরো সত্য হয়ে ওঠে। নদীর কোনো পার থেকে বাতাসের ছুটে আসা দেখা যায় না, অত প্রবল বাতাসে আকাশের সমস্ত মেঘ তছনছ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যেন মেঘে তৈরি নয়–এমনই অনড় থাকে এ আকাশ। আর আকাশেও প্রত্যাহত বাতাস এসে আছড়ে পড়ে এই বাধে দাঁড়ানো মানুষগুলোর গায়ে।
বাতাসের বিপরীতে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে একা-একা মহেশ্বর জোতদার চিৎকার করে ওঠে, এ্যালায় ত গরুগিলাক আনিবার নাগে হে, হে-এ এ ভাদই-ভাই কোথায় না জেনেই।
মহেশ্বর এমন ঘোষণা করেছিল একথা সত্য। বিপরীত ঝঞ্ঝার সেকথা ভাদইয়ের দিকে না এসে পশ্চিম থেকে পশ্চিমে চলে গেছে–এই ঘটনাও সত্য। সেই মুহূর্তে ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটু বাঁধের ঢাল বেয়ে জলে নেমে যায়–এ ঘটনাও সত্য। এই তিনের মধ্যে কার্যকারণের কোনো সংযোগ না-ও থাকতে পারে। কিন্তু থাকতেও পারে।
এখন ত এখানে রিলিফ ক্যাম্প প্রায় হয়েই গেল–চিড়ে আসছে, গরুর খাবারও নিশ্চয় আসবে, সুতরাং গরুগুলোকে নিয়ে আসা উচিত।
অথবা, শনিবারের বিকেলের এই মুহূর্তে, মহেশ্বর-ভাদই কান্দুরা কানকাটু একসঙ্গে বুঝে ফেলে এই মুহূর্তটি আত্মরক্ষার শেষ সময়, যেন তারা সেই অদৃশ্য পাহাড়ের অজ্ঞাত সব নতুন হ্রদের গায়ের ফাটলচিহ্ন দেখতে পেয়ে গেছে, জলের রঙে হঠাৎ যেন তারা মৃত্যু দেখতে পায়, অথবা অনির্দিষ্ট নদীপার থেকে উত্থিত বাত্যার আওয়াজে শুনতে পায় ধ্বংসের ধ্বনি। অফিসারের আসা থেকে ভাইদের জলে নেমে পড়ার ভিতর হয়ত কোনো কার্যকারণ ছিল না। কত কাকতালীয়কেই ত আমরা কার্যকারণ বলে ভুল করি। অথবা কত কার্যকারণকে আমরা কাকতালীয় মনে করি।
ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটু জলে মেনে যায়। জলের বাধাটুকু বাদ দিয়ে, তাদের হাঁটায় কোনো অনিশ্চয়তা থাকে না। পা পায়ের অভ্যাসে পায়ের তলার মাটি চিনে নেয়। কখনো উঁচু, কখনো নিচু, কখনো কোনো গর্তের ভেতর হঠাৎ কোমর পর্যন্ত ডুবে যায়, তারপরই আবার হাঁটু জেগে ওঠে। ওদের তিনজন একই জায়গায় নেমেছিল–কিন্তু ছড়িয়ে গেল তিন দিকে। ভেতরে ছড়ানো উঁচু ডাঙাগুলিতে গরুগুলো ছড়িয়েছিটিয়ে বাধা ছিল, সেই সব জায়গা থেকে হা-স্বা ডাক দীর্ঘায়িত এক কোরাসে ছড়িয়ে পড়ে, যেন ওরা জেনে গেছে এরা তিনজন আসছে। সেই কোরাস থেমে যাওয়ার পর আবার কোনো একক গাভীস্বর মেঘের চাপা ডাকের মত নদীর পারের দিকে ছড়িয়ে পড়ে–সেই সব মেঘের ডাক, যেগুলো আমাদের দেখতে পাওয়া মেঘেরও অনেক ওপরে থাকে। বানভাসি গরুরা বুঝে গেছে, এবার তাদের সরানো হবে। তারা দড়িতে শিং ঘষে মাটিতে ক্ষুর ঠুকতে শুরু করে।
এক গোছা পাটের দড়ি গলায় জড়িয়ে ভাদই আবার ফিরে আসতে হটে। জলের ভেতর ভাইকে যেন আর অত ছোট দেখায় না, শুধু তার খাটো শরীরে কাঁধের আর হাতের পেশিগুলো ফুলে-ফুলে ওঠে–জল কাটানোর জন্যে ত ভাইকে দুটো হাত নাড়িয়ে যেতে হয়। ভাদই কোথায় সঁতরায় আর কোথায় হাঁটে সে ত বোঝাই যায় না, জলে তার এই একবার ওদিকে যাওয়া, আর একবার এদিকে আসা এমনই, যেন, সে জল চষে বেড়াচ্ছে।
বাঁধের তলায় এসে ভাদই মহেশ্বর জোতদারকেই হুকুম করে–বাশ ফেলাও কেনে, বাশ ফেলাও।
মহেশ্বর বাঁশের গোছ থেকে একটি বাঁশ নিয়ে বাঁধের ঢাল বেয়ে নেমে জলের কিনারা থেকে ভাইয়ের দিকে ছুঁড়ে দেয়। সেটা জলে পড়তেই ভাদই আবার চিৎকার করে, আরা ফেলাও কেনে, আরো ফেলাও
মহেশ্বরকে আবার উঠতে হয়। আবার একটা বাশ নিয়ে সে ঢাল বেয়ে নীচে নামে, এবার জল কিনারা পর্যন্ত যায় না, সেখান থেকেই গড়িয়ে দেয়–জলে পড়লে ভাদই নিয়ে নেবে। কিন্তু বাশটা দুটো কাটা গাছে এমনই আটকে যায় যে মহেশ্বরকে আরো খানিকটা নেমে পা দিয়ে সেটাকে গড়িয়ে দিতে হয়।
সেই বাঁশটা ধরতে ভাইকে বেশ কিছুটা এগিয়ে আসতে হয়, তার কোমর থেকে জল ধীরে-ধীরে নেমে যায়, আর বাঁধের একেবারে কাছাকাছি এসে ভাদই মহেশ্বরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, কায় একখান একখান করি বাঁশ আনিবার ধরিছেন, ফ্যালান কেনে, বাশ ফ্যালান। জলের ভেতর থেকে ভাদই তার এক হাত বাড়িয়ে দেয়। ভাদই বাতাসের দিকে পেছন ফিরে ছিল, তাই তার কথাগুলো বাতাসের বেগে এসে এই বাধটিতে আছড়ে পড়ে। মহেশ্বর এমন ভাবে তার কাপড়টা তুলে হাঁটু ভেঙে বাধ বেয়ে ওঠে, যেন মনে হয়, ভাইয়ের হুকুম এই মুহূর্তে অমান্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
মহেশ্বর যখন একবার-দুবার, বাঁধময়, ও দূরেও, তার চোখ ঘোরায় এমন কাউকে দেখতে যে বঁশগুলো নীচে জলে ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবে, তখন নীচে, জলের অনেক অভ্যন্তর থেকে কান্দুরা ডাকে–ভাদইগে। ভাদই বাঁধের নীচের জলে আজানু দাঁড়িয়ে হঠাৎ ঘাড়টা ঘুরিয়ে হক, দেয়
হে-এ-এ
ছাড়ু কি না ছাড়?
না ছাড়ু, না ছাড়ু।
ভাদইয়ের না-ছাড়ু, আওয়াজটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যে প্রলম্বিত ও তীব্র হয় তা প্রতিধ্বনিও হতে পারে। কিন্তু এত বিপরীত বাতাসে প্রতিধ্বনি আসে না। তা হলে হয়ত কান্দুরাই কথাটাকে আর-একটু দূরে কানকাটুর কাছে ছড়িয়ে দিল এখন গরুগুলিকে ছেড়ো না।
বন্যার জল যখন আসে, তখনও তার আসাটা দেখা যায় না, আসে ত থিতু জলের সঙ্গে বা স্রোতের সঙ্গে মিশে। জলটা শুধু উঁচুতে উঠতে থাকে–কোনো আওয়াজ নেই, কোনো ভাঙন নেই, পাতালের জল যেন উথলে ওঠে। কিন্তু বাতাস ত তেমন নীরবে, অব্যাহত আসে না। একে ত এখন তিস্তার এপার-ওপার সত্যি দেখা যায় না ঝকঝকে রোদের দিনেও দেখা যায় না। জল বা বালির ঝিকমিকে দৃষ্টি আটকে যায়। এখন ত আরো দেখা যায় না–ছাই রঙের আকাশ নদীর একেবারে ওপরে নেমে মাঝখানে যেন নদীর ওপর দেয়াল হয়ে আছে। আর বাতাস সেই অদৃশ্য দেয়ালের পেছন থেকে তিস্তার এত বড় বিস্তারটা পার হয়ে যায় প্রায় যেন নীরবেই, অথবা, জলের যে-শব্দটা এখন আলাদা করে চেনা যায় না সেই শব্দের সঙ্গে মিশে আত্মগোপন করে। তারপর বাঁধের ওপর আছড়ে পড়ে সংহত সমস্ত শক্তিকে একসঙ্গে মুক্ত করে দিয়ে।
