স্যার, বসেন স্যার, সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারটাকে একটু এগিয়ে দেন একজন।
চেয়ারটাতে বসতে বসতে ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন, কী, আপনাদের মেম্বার কে কে আছেন, এখানে?
দরজার কাছের ভিড়টা থেকে একজন এগিয়ে আসে, স্যার, আমরা কয়েকজন মাত্র আছি স্যার, আর দুই জন মেম্বারের বাড়িতে সাইকেল দিয়া লোক পাঠানো হইছে স্যার। কিন্তু তারা এইখানে আছে না টাউনে গেইছে– মেম্বার বাক্যটি শেষ করতে পারে না।
এর মধ্যে আরে দুজন এগিয়ে এসেছে। ডেপুটি কমিশনার বলেন, আপনারা বসুন।
সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সামনের চেয়ারের বা দিকের বেড়া ঘেঁষে একটা বেঞ্চ পাতা ছিল। মেম্বাররা সেই বেঞ্চটাতেই বসে। পাশের একটা ঘর থেকে একজন একটা চেয়ার এনে রাখে দেখে ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন, ওদিকেও একটা ঘর আছে নাকি?
হ্যাঁ স্যার, ছোটঘর একখান আছে। একটা ঘর ত ভিড় হয়্যা যায়, অফিসের কাজকর্মে বাধা হয়, স্যালায় ঐঠে কাজ হয়।
ডেপুটি কমিশনার আবার ঘরটার বেড়াগুলোতে চোখ বুলিয়ে বলেন, পঞ্চায়েত অফিসগুলোতে এখনো নতুন ঘরের গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? সকলে একটু হাসে। ডেপুটি কমিশনার আবার বলেন, ঘরটর নোংরা হতে দেবেন না। আর কাগজপত্র জমতে দেবেন না। যা বাজে জিনিস, সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট করে ফেলবেন। একবার যদি নোংরা জমতে শুরু করে, তা হলে আর কোনো দিন পরিষ্কার করতে পারবেন না। আমাদের কাছারি দেখেন না? এখন হোয়াইট ওয়াশও করা যায় না। হ্যাঁ বলুন। আপনাদের এখানে ত দেখছি আপনারা কোনো ওয়ার্নিঙেই কান দেন নি। এরপর বড় একটি এ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেলে, তখন কৈফিয়েত দেবে কে?
স্যার, বোধ হয়, এব্যাপারে কথা বলার জন্যেই আপনার কাছে আজ যাওয়া হয়েছে, একজন মেম্বার বলে।
এখনো যদি আমার কাছে ছোটেন তা হলে আর পঞ্চায়েত করে লাভ কী হল।
আপনাদের এলাকায় বন্যা হলে আপনাদেরই ব্যবস্থা নিতে হবে—
না স্যার। হামারালার ত জানা নাই টাকাপয়সার খরচা কতখান চলিবে আর কতখান চলিবে না–
প্রথমেই ফান্ডের কথা আসে কোত্থেকে। সেসব ত পরে পঞ্চায়েত অফিসার এসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবেন। তার আগে ত বাঁধের ওপারে, নদীর দিকে যারা আছেন, তাদের নিয়ে আসতে হবে। তারা ত দেখলাম ভাবছে ফ্লাড় আসবে না। শেষে মাঝরাতে যদি লোক সরাতে হয় তখন কী করবেন? ঐ বাঁধের ওপর একজন ভদ্রলোকের নৌকো চাইলেন আমাদের সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার, তিনি আমাকে বলে দিলেন নৌকো এখন তার কাজে লাগবে, নৌকো দেবেন না
কে স্যার?
সে আমি কী করে বলব। দেখুন ত আমাদের সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার বাইরে আছেন কি না।
একজন মেম্বার উঠে দরজায় যায়। দরজা থেকেই ডাকে, এইঠে আসেন, আপোনাকে স্যার ডাকিছেন।
সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার ঘরে এলে ডেপুটি কমিশনার বলেন, আপনি এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন? ওখানে যান, দেখুন নৌকোটা ঠিক মত ফাংশন করছে কিনা।
হ্যাঁ স্যার বলে ভদ্রলোক বেরিয়ে যান।
মহেশ্বর জোতদারের নৌকোর কথা কহিছেন স্যার? উমরায় নৌকো দেয় নাই?
কে দেয় নি তার নাম আমি জানি না। আমি একটা রেসকিউ নৌকো স্টার্ট করিয়ে দিয়েছি, এবার আপনারা দেখুন আর কোন-কোন পয়েন্টে লোক থাকতে পারে। যদি দরকার হয়, ঐ আর-একটি নৌকোও নিয়ে নিন। অন্তত আজ সন্ধের মধ্যে নদীর দিকে যেন কেউ না থাকে। এই কথাটি বলার জন্যেই আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। ডেপুটি কমিশনার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে বলেন, আপনাদের লিডাররা কেউ নেই বলে দেরি করবেন না। তারা এলে বলবেন, আমি আপনাদের বলেছি। আর ঘুঘুডাঙা থেকে চিড়েগুড় আনতে গেছে, সেগুলো এসে গেলে যা করার করবেন। ডেপুটি কমিশনার বারান্দায় এসে দাঁড়ান। সেখানে তখনো অনেকে দাঁড়িয়ে, বসে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে ডেপুটি কমিশনার বলেন, গাড়িটাকে একটু আসতে বলুন না।
৩.৩ বন্যার কার্যকারণের সেই মুহূর্তটি
অফিসাররা স্বাধটা ফাঁকা করে দিয়ে চলে গেলে জানা জিনিশই আর-একবার জানা হয়, নৌকো করে সরিয়ে আনার মত বিশেষ কিছু দুই নম্বরে আর নেই। মেয়েরা ও বাচ্চারা ত উঠেই এসেছে, চৌপত্তিতে ঘোরাফেরা করছে, পুরুষমানুষরাও আসছে-যাচ্ছে। এখন, ধীরেন সাহার নৌকোটা একবার যায়, তাতে কোনো বাড়ির জিনিশপত্র কিছু কিছু আনাও হয়। কিন্তু তারপর নৌকোটা কোথাও নিয়ে যাওয়া হয় যেন বেঁধেছেদে তৈরি রাখবার জন্যেই সিবিল এমার্জেন্সির অফিসারের অনুমতিসহ। যতদিন জল থাকবে, মানুষজনকে যাতায়াত করতে হবে, ততদিনই নৌকোটা সরকারের ভাড়া পাবে। অফিসারের ভাড়া করা নৌকো ত আর পঞ্চায়েত খারিজ করতে পারবে না।
কিন্তু এই অফিসারদের আসা, সিবিল এমার্জেন্সির লাল গাড়ি, নৌকো ভাড়া করা; ঘুঘুডাঙা থেকে চিড়ে আর গুড় আনতে রিক্সা পাঠানো, এর ফলে, যেন বন্যাটা ঘোষণা হয়ে গেল। এই ক-দিনের ঝড়বৃষ্টিতে ও হাঁটুজল থেকে কোমর জলে ডুবেও বন্যাটা যেন ততখানি বন্যা ছিল না, এখন এটা সরকারি বন্যা বলে সাব্যস্ত হয়ে গেল। আরো যদি বাড়ে, তাহলে হেলিকপ্টার আর সৈন্যবাহিনীর কথা আসবে। কোনো বন্যায় কেউ কখনো হেলিকপ্টার দেখে নি, একজন সৈন্যও দেখে নি। কিন্তু মোটামুটি এটাই ঠিক হয়ে গেছে–ঐ দুটো দিয়ে বন্যার আর-এক অবস্থা বোঝানো হবে।
