তা হলে ওকে যেতে দিচ্ছেন কেন?
না, না, ও খুব ভাল পারিবে স্যার।
আবার ওঁদের অপেক্ষা করতে হয়। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা যায় একটা নৌকো ওঁদের বা দিক থেকে বেরিয়ে কুটোর মত দক্ষিণ দিকে ভেসে যাচ্ছে কিন্তু পঁচজন লোক লগি দিয়ে নৌকোটাকে উল্টো দিকে ঠেলছে। আবদুল তার জুতোজামা-সোয়েটারসহ জলে ঝাঁপ দিয়ে স্রোতের টানে মুহূর্তে নৌকোটার কাছে পৌঁছে যায়।
ডেপুটি কমিশনার পঞ্চায়েতের মিটিঙের জন্যে পেছন ফেরেন। তিনি অন্তত বলতে পারবেন–ফাস্ট রেসকিউবোটটা স্টার্ট করে দিয়েছেন।
ডেপুটি কমিশনারের পেছনে-পেছনে মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সির অফিসারও হাঁটতে-হাঁটতে বাইরে আসে। এতক্ষণ তাদের সঙ্গে লোকজনের যে-ভিড়টা ছিল সেটা খসে গেছে। কাউকে কাউকে ডেপুটি কমিশনারই কাজে পাঠিয়েছেন আর বাকিরা এখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে নৌকোটাকে দেখবে।
দুটো দোকানঘরের ফাঁক দিয়ে ওঁরা চৌপত্তিতে এসে যান। ওঁদের জিপগাড়িগুলো উল্টো দিকে দাঁড় করানো। তাদের দেখে ড্রাইভাররা একটু এগিয়ে আসে। কিন্তু ড্রাইভাররা ডেপুটি কমিশনারের কাছে পৌঁছনোর আগেই দুদিকের দোকান থেকেই অনেকে বেরিয়ে আসে। আসামের সিল্কের চাদর গায়ে, লুঙিপরা একজন এসে নমস্কার করে বলে, আসেন স্যার, একটু বসে যাবেন।
ডেপুটি কমিশনার যদিও বলেন, না, এখন আর বসব কী? একটু পঞ্চায়েতে গিয়ে দেখি। কিন্তু দুইহাত মাথার পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, যেন একটু কথা বলতেই চান।
আপনি নিজে এসে গেলেন স্যার-সেই সিল্ক-চাদর গায়ে ভদ্রলোকই আবার বলেন।
না এসে আর উপায় কি? ডেপুটি কমিশনার হেসে বলেন, আমি ত জানিই আপনাদের যত নোটিশই দেয়া হোক, রেডিয়োতে যতই বলা হোক, আপনারা কিছুতেই চর ছেড়ে ডাঙায় উঠবেন না। এতগুলো ফ্লাড কাটালাম আপনাদের সঙ্গে–আর এটুকু বুঝব না?
ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে অন্য সবাইও হেসে ওঠে। একটি বাচ্চা ছেলে একটি কাপডিশ নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। সে বোঝে না কাকে দিতে হবে। একজন তার হাত থেকে কাপডিশটা নিয়ে, ডিশের চাটা ফেলে ডেপুটি কমিশনারকে এগিয়ে দেয়। ডেপুটি কমিশনার কাপটা নিয়ে ছোট্ট একটা চুমুক দেন। ইতিমধ্যে একজন বলে, স্যার, নিজের ঘরবাড়ি ছাড়ি আসিবার মন চাহে না। মনত খায়, দেখি কেনে আজি সকালটা, আজি রাইতটা
সে ত দেখলেন, তারপর জলে ভাসলে ত সব হবে সরকারের দোষ। আপনাদের পঞ্চায়েতও ত কিছুই করে নি। পঞ্চায়েত অফিসটা কোন দিকে?
এই যে স্যার, এই যে, আসেন–একজন সরে গিয়ে ডেপুটি কমিশনারকে পথ করে দেয়।
ডেপুটি কমিশনার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপডিশটা কোথাও রাখার ভঙ্গি করতেই একজন হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলে, দেখি, একটু পঞ্চায়েতে গিয়ে, বলে ডেপুটি কমিশনার এগিয়ে যান।
.
১০৫.
বন্যার মুখে পঞ্চায়েত
ডেপুটি কমিশনার কয়েক পা হাঁটতেই তার ড্রাইভার পেছন থেকে দৌড়ে এসে বলে, স্যার, গাড়িটা নিয়ে আসি?
ডেপুটি কমিশনার দাঁড়িয়ে পড়ে ড্রাইভারের দিকে ঘুরে বলেন, না, না, তুমি এখানেই থাকো। চাটা খেয়েছ?
ড্রাইভার দাঁড়িয়ে পড়ে ঘাড় হেলায়। ডেপুটি কমিশনার হাঁটতে-হাঁটতে দোকান ঘরগুলো পার হয়ে যান। বায়ের বিস্তীর্ণ বালির চড়ার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেন, এই জায়গাগুলো খুব ভাল ধানি জমি ছিল। আটষট্টির ফ্লাডে সব নষ্ট হয়ে গেল। এদিককার ধান ত খুব ভাল ছিল।
যারা সঙ্গে আসছিল, তাদের ভেতর একজন বলে, আপনি স্যার তখন ছিলেন স্যার এখানে?
হাঁটতে-হাঁটতে একটু ঘাড় ঘুড়িয়ে ডেপুটি কমিশনার বলেন, আমি তখন প্রবেশনে ছিলাম, সে বছরই ফ্লাড। তাই জলপাইগুড়িতে এলেই মনে হয় ফ্লাড হবে। আপনারা তখন ছিলেন, এখানে?
এ প্রশ্নের কোনো একটি জবাব হয় না–কেউ-কেউ ছিল, কেউ-কেউ তখন অনেক ছোট ছিল। কিন্তু সকলেরই কিছু-কিছু জানা আছে। সকলে মিলেই জবাব দিতে যায়–ডেপুটি কমিশনারও একবার বায়ে, একবার ডাইনে ঘাড় ঘুরিয়ে যেন সকলের কথাই শুনতে চান। শেষ পর্যন্ত তার পাশে যে ছিল সেই কথাটা চালিয়ে যেতে পারে–আটষট্টির বন্যার পর ত স্যার মণ্ডলঘাটের চেহারাই বদলি গিসে। কোটত সে পাহাড়ের হাট? কোটত সে সরকার পাড়া?
পঞ্চায়েত অফিস এসে যায়। ডেপুটি কমিশনারকে স্যার, এইখানে স্যার বলেই পাশের লোকটি দৌড়ে পঞ্চায়েত অফিসের ভেতরে চলে যায়। কিন্তু সে ঢুকবার আগেই পঞ্চায়েত অফিসের ভেতর থেকে অনেকে বেরিয়ে আসে, বারান্দায়। যারা তার সঙ্গে এসেছিল, তাদের দিকে ঘাড়টা একটু হেলিয়ে ডেপুটি কমিশনার বলেন, ঠিক আছে। এখন একটু এদের সঙ্গে বসি। আর আপনারা নিজেরা সব সাবধানে থাকবেন। জলপাইগুড়ির বন্যা শুনলেই ভয় হয়! সবাই একটু হেসে উঠলে ডেপুটি কমিশনার পঞ্চায়েত অফিসের বারান্দায় ওঠেন।
কী? আপনারা কজন মেম্বার আছেন? জিজ্ঞাসা করে, ডেপুটি কমিশনার বারান্দা থেকে পঞ্চায়েত অফিসের ভেতরে ঢোকেন।
ঢুকে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অফিসের বেড়াগুলো দেখেন। দরজার মুখোমুখি বাঁশের বেড়াটাতে লেনিনের একটা রঙিন ছবি বানো। ডান দিকে সেক্রেটারিয়েট টেবিল, পাশে স্টিলের আলমারি। সেই টেবিলের পেছনের বেড়ায় ওপরে বামফ্রন্ট সরকার জিন্দাবাদ লেখা একটি পোস্টার। ডেপুটি কমিশনার যেখানে দাঁড়িয়ে তার বয়ে বেড়ার ওপরে রবীন্দ্রনাথের একটা রঙিন ছবি সম্ভবত কোনো ক্যালেন্ডার থেকে কাটা। বাধানো সেই ছবিতে একটা শুকনো মালাও দুলছে।
