মাস্টার মৃদুস্বরে বলে, স্যার, আমরা ভাবছিলাম জল নেমে যাবে, তাই আর-কিছু করা হয় নি।
ডেপুটি কমিশনার নিজের মত করে বুঝে নেন এই মেম্বার পঞ্চায়েতের সভ্য নিশ্চয়ই কিন্তু এখানকার নেতা নয়। নেতা হলে জিপগাড়ি থেকে তার সঙ্গে আসত। কিন্তু পঞ্চায়েতকে না-জড়িয়ে কিছু করাও ঠিক হবে না। এবার ডেপুটি কমিশনার নদীর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে ডাকেন, সান্যাল।
মইনুদ্দিন ডিলার ভাবে ডেপুটি কমিশনার তাকে বুঝি কিছু বলবেন। সে তার লম্বা ঘাড় ডেপুটি কমিশনারের কাছাকাছি এনে জিজ্ঞাসা করে, আমাকে কিছু বললেন স্যার?
ডেপুটি কমিশনার তার বিপরীত মুখটা ঘুরিয়ে বললেন, না। আমাদের ডিস্ট্রিক্ট পঞ্চায়েত অফিসার মিস্টার সান্যাল
কথা শেষ হওয়ার আগেই মিস্টার সান্যাল পেছন থেকে এগিয়ে এসে বলেন, হাঁ স্যার।
এখানে এ্যাভেইলেবেল পঞ্চায়েত মেম্বারদের মিট করুন পঞ্চায়েত অফিসে, আমি আসছি। আর, তার আগে নৌকো পাঠান; এখুনি, শেষ কথাটা ডেপুটি কমিশনার বলেন মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সির অফিসারকে।
মিস্টার সান্যাল আর সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার বাঁধ ছেড়ে চৌপত্তির দিকে যান। তাঁদের সঙ্গে ভিড়ের অনেকেও সেদিকে যায়। বাকি ভিড়টাকে নিয়ে ডেপুটি কমিশনার দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই ভিড়টার ভেতরে থেকেও সেই ভিড়টার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আব্দুল সে প্রথমে যেখানে দাঁড়িয়ে লি সেখান থেকে এক পাও সরে নি। তার আশেপাশে, প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে এই ভিড়ে যারা ছিল তাদের সবারই মুখ ডেপুটি কমিশনারের দিকে ফেরানো। ডেপুটি কমিশনারের পেছনে যারা তাদের মুখ নদীর দিকে কিন্তু তারা তাকিয়ে আছে ডেপুটি কমিশনারের দিকেই। আবদুল যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকেই তার উচিত ছিল ডেপুটি কমিশনারের দিকে তাকানো।
.
১০৪.
বন্যা ‘ঘোষণা’–হল কি হল না?
এখন অবিশ্যি আবদুলের দাঁড়ানোটার একটা মানে আসে, কারণ, ডেপুটি কমিশনারও নদীর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। জলের রং ঘোলা থেকে ঘোলা, স্রোতের বেগে সেই বিরাট বিস্তারের কোথাও একটা কুঞ্চন পর্যন্ত নেই। মাইল-মাইল বিস্তৃত সেই জল ধাতুপাতের মত পড়ে আছে স্রোতের বিভ্রম জাগিয়ে। সেই পশুটে বিবর্ণতা আকাশ থেকে নদী আর ডাঙায় ফোঁসফোঁস করছে। বুঝি, কোথাও কিছু ঘটে গেছে, বা এখনই ঘটবে।
তা হলি আপনি স্যার চলেন, ঐখানে বসি সব কথাবার্তা হোক-মইনুদ্দিন ডিলার গলাটা ডেপুটি কমিশনারের কানের কাছে এনে বলে।
ওখান যখন যাবার যাব। আপনি এক কাজ করুন–এখানে কি চিড়ে, আর গুড় পাওয়া যাবে?
এখানে পাওয়া যাবে না স্যার, ঘুঘুডাঙ্গাতে তা হালে রিক্সা পাঠাই?
হ্যাঁ, এখুনি পাঠান।
হ স্যার, বলে মইনুদ্দিন ডিলার ভিড় থেকে বেরতে গেলেই, ডেপুটি কমিশনার বলেন, শুনুন, এখন আবার রিক্সা ভাড়া নিয়ে দরদস্তুর করতে যাবেন না, যা চায় তাই দিয়ে পাঠিয়ে দিন।
মইনুদ্দিন বেরতে-বেরতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, স্যার, ক্যাম্প কি তা হলে আজ থেকেই স্টার্ট হবে?
না, না, ক্যাম্প না। তবে লোকজন চরটর থেকে আসবে, সবাই ত আর রান্না করতে পারবে না। তাদের জন্যে স্টক করুন। ওয়েদার ফোরকাস্ট খারাপ। পাহাড়ে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে। জল আরো বাড়বে।
আরো বাড়িবে স্যার? মহেশ্বরের জিজ্ঞাসায় কোনো উদ্বেগ নেই যেন।
বাড়বে না? পাহাড়ে ত ধস নামছে। আপনাদের ত আজকাল এত রেডিয়ো হয়েছে। গত তিন দিন। ধরে শুনছেন না?
শুনছি স্যার, মহেশ্বর স্বীকার করে।
শুনছেন ত লোকজন সরান নি কেন?
রেডিয়োতে কথা ত সব সময় বিশ্বাস না যায়, সেই তানে স্যার।
স্যার, সিবিল মোবাইল এমার্জেন্সির অফিসারটি এসে পেছন থেকে বলে, এখানে ত একটা নৌকো পেলাম স্যার।
একটা নৌকোয় কী হবে? ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন। তারপর বলেন, নৌকো কি আছে। এখানে? তা হলে সেগুলো নিয়ে নেয়াই ত ভাল। দরকারের সময় কোথায় পাবেন?
অফিসারটি মহেশ্বরকে দেখিয়ে বলেন, ওঁর একটা নৌকো আছে স্যার, কিন্তু উনি দেবেন না।
মহেশ্বর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ডেপুটি কমিশনার একবার মহেশ্বরের দিকে, একবার অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলেন, উনি ত তখন থেকে এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, নৌকো দেবেন না বললেন কখন?
স্যার, নৌকো ত রাইস মিলের সামনে আছে। ওখান দিয়েই এদিকে বেরবে। ওর লোকজন আছে। তারা বলল, তিনি নৌকো কাউকে দিতে না করেছেন। ডেপুটি কমিশনার একটু বুঝে নেন, তারপর বলেন, কী? আপনার নৌকো দেবেন না নাকি?
না স্যার।
ডেপুটি কমিশনার একটু অবাক হন। কিন্তু অভিজ্ঞতার জোরে বোঝেন তিনি রাগারাগি করলে হিতে বিপরীত হবে। যদি এর নৌকো থাকে তা হলে পঞ্চায়েতের লোকজনরাই সে নৌকো নিয়ে নেবে।
সে কি, লোকজনকে রেসকিউ করতে হবে না?
আমার গরুমানষিকও এসকু নাগিবে স্যার। আপনারা সেনাবাহিনী আনেন স্যার।
ডেপুটি কমিশনার আসার সুযোগটা নিয়ে বলেন, আচ্ছা, এক কাজ করুন। যে-নৌকোটা পেয়েছেন এটা এখনই চরের দিকে ছেড়ে দিন। আর ওরটা ত থাকলই। এখানকার একজন কাউকে সঙ্গে নেবেন। অফিসার চলে যান।
আবদুল বাঁধ থেকে নেমে জলের কিনারায় চলে যায়–ও নৌকোয় যাবে। তার দিকে আঙুল দেখিয়ে ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন-ও যাবে নাকি? যে ভিড়টা তখনো ছিল তার ভেতর থেকে হাসি ওঠে। মহেশ্বরও হেসে বলে, পাগলা।
