.
১০৩.
বন্যার মুখে জিপগাড়ি
আবদুল এ-এলাকার পরিচিত পাগল। বা, পাগলও নয়, হয়ত। তার এমনিতে কোনো পাগলামি নেই। কথা প্রায় বলেই না। পোশাক-আশাকও যে তার এরকম হোমগার্ডদের মত, তার কারণ সে তার নিয়মিত চক্করের মধ্যে নগর বেরুবাড়ির বর্ডার ক্যাম্পে একবার যায়, অন্তত মাসে একবার। ওখানে গেলে টানা দিন সাতেক বা দিন পনেরও থেকে যায়। গিয়ে তার জন্যে কাজ যেন ঠিক করাই আছে এরকম দ্বিধাহীনতায় তরকারির বাগানে কাজ করতে লেগে যায়। ক্যাম্পের কিচেনে খায় আর একটা বারান্দায় ঘুময়। বারান্দার বাটামে তার বিছানা ও হাঁড়ি বাধা থাকে। কেউ আপত্তি করে না। তারপর। আবার একদিন ক্যাম্প ছেড়ে হাঁটা দেয়। সেটাও আগের মুহূর্তে বোঝা যায় না। কুয়োপাড়ে যায়, হাতমুখ ঘোয়, তারপর বারান্দায় এসে লাঠিটার ডগায় বাণ্ডিলটা ঢুকিয়ে, আর-এক দড়ির ফাসে হাঁড়িটাকেও লাঠির মাথায় গলিয়ে সে হাঁটা দেয়, যেন তরকারির বাগানের কাজটুকু করে দেয়ার জন্যেই সে এসেছিল, বা, সে এখানে রোজ খাটে, এখন দিনের শেষে বাড়ি ফিরছে।
আবার এরকম চক্কর মারতে-মারতেই মণ্ডলঘাটের চৌপত্তিতে, ঘুঘুডাঙার হাটে, কাদোবাড়ির হাটে যায়। কিন্তু কখনো কারো বাড়িতে বা কোনো পাড়ার মধ্যে যায় না। এতই চেনা আবদুলের গন্ধ যে রাতবিরেতে সে কোথাও ঢুকলেও কুকুররা ডাকে না, একবার এসে শুঁকে যায় মাত্র। যেখানে যায় সেখানেই তার খাবার জুটে যায় বটে কিন্তু খাবার কখনো চায় না আবদুল। বরং যেখানেই যায় সেখানেই সে সারা দিন ধরে এত কাজ করে যে মজুরি ধরলে তার একটা ভাল আয়ই হতে পারে। কিন্তু রোয়াগাড়াই হোক আর ধানকাটাই হোক–আবদুল কারো খেতে কখনো কাজ করে না। মনে হয়, যেন মানুষের সঙ্গেই ও থাকতে চায়, অনেক মানুষের সঙ্গে, মানুষের ভিড় কিন্তু কোনো একজন বা দুজন মানুষের সঙ্গে নয়। তাই আবদুল হাটে, চৌপত্তিতে, ক্যাম্পে ঘোরে কোনো বাড়িটাড়ির কাছে ঘেঁষে না।
আবদুল এসে ধাধের ধারে দাঁড়িয়ে, কোমরে হাত দিয়ে নদীর দিকে তাকায়। তিস্তায় বন্যা হবে, চরের সব মানুষ এসে বাধে উঠবে, এখানে ক্যাম্প বসবে, ত্রিপল টাঙানো হবে, সাধুসন্ন্যাসীরা আর অফিসাররা আসবে-যারে–আগামী কয়েক দিন এখানে অনেক কাজ আবদুলের। কুলগাছের ডালে বিছানা, হাঁড়ি আর লাঠি ঢুকিয়ে সে এখন সেই অত কাজের জন্যে তৈরি।
চৌপত্তির দিক থেকে একটা আওয়াজ ওঠে আর এই বাঁধের ভিড়টা প্রায় দৌড়েই চৌপত্তির দিকে ছোটে। বাচ্চাদের গলায় চিৎকার ওঠে, আসি গেইল, আসি গেইল, জিপগাড়ি আসি গেইল। আবদুল প্রায় একাই দাঁড়িয়ে থাকে। আবদুল ছাড়া আর দাঁড়িয়ে থাকে এ এলাকার সবচেয়ে বড় জোতদার মহেশ্বর রায়। তার প্রায় বিশ-ত্রিশটা গরু দুই নম্বরে থাকে। সে গরুগুলোর খোঁজখবর করতে এসেছে।
যে-ভিড়টা চৌপত্তিতে ছুটে গিয়েছিল সেই ভিড়টাই এখন চুপচাপ ফিরে আসে, হাঁটতে-হাঁটতে-মইনুদ্দিন ডিলার, গামবুটপরা দারোগার মত দেখতে একজন, আর একজন অফিসারের পেছনে-পেছনে। ওরা তিনজন সামনে সামনে ছিল, পেছনের ভিড়ের মধ্যেও শহর থেকে আসা আরো দু-একজন ছিল। মইনুদ্দিন ডিলারের পরনে লুঙি আর পাঞ্জাবি। সে এদের মধ্যে সকলের চেয়ে লম্বা আর অফিসারটি সবচেয়ে খাটো। আবদুল যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই যে এরা এসে দাঁড়ায় তার কারণ হতে পারে যে আবদুল একা দাঁড়িয়ে থাকায় অফিসারটির মনে হয়েছে–এটাই দাঁড়াবার জায়গা। আবদুলের খাকি প্যান্ট দেখে তার মনে হয়ে থাকতে পারে–সে সরকারি কাজই করছে। এত বড় ভিড় ও অফিসারদের দেখে আবদুলের সরে যাওয়ার কথা কিন্তু সে যে সরে না আর মাত্র একবার তাকিয়েই আবার নদীর দিকে মুখ ফেরায় সেটাই বোধহয় তার পাগলামো।
মইনুদ্দিন ডিলার সবার ওপর দিয়ে গলা তুলে হাত বাড়িয়ে মহেশ্বর জোতদারকে ডাকে, এই যে মহেশ্বরবাবু, এইখানে আসেন। বাতাসে মইনুদ্দিনের গলা শোনা যায় না কিন্তু মহেশ্বর তার আহ্বানটা বোঝে। সে এগিয়ে আসে, ভিড়টা তাকে জায়গা ছেড়ে দেয়। সে অফিসারদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
এই যে ডি-সি সাহেব আসছেন, বলেন, এখানকার পরিস্থিতি কী?
মহেশ্বর নমস্কার করে দু হাত দু দিকে ছড়িয়ে বলে, পরিস্থিতি ত সগায় দেখিছেন– যেন মহেশ্বরের দু হাতেই বন্যা।
ঐ চরে যারা থাকেন তারা সব উঠে এসেছেন ত? ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন।
কায় আর উঠিবে? গাইগরুগিলাই এখন ঐঠে থাকি গেইল! মহেশ্বর সেই একই ভঙ্গিতে বলে।
মানে? রেডিয়োতে এতবার করে অ্যানাউন্সমেন্ট করা সত্ত্বেও আপনারা লোকজনকে সরান নি? এরপর ক্যাজুয়ালটি হলে তার দায়িত্ব কে নেবে? এখানকার পঞ্চায়েতের লোকজন নেই? ডেপুটি কমিশনার ঘাড় ঘুরিয়ে ভিড়টাকে জিজ্ঞাসা করেন।
পঞ্চায়েত আর কী করিবে, কহেন? এই ত মাস্টার আছে, মেম্বার। মহেশ্বর বলে।
কই? কে মেম্বার? ডেপুটি কমিশনার বলেন।
মাস্টার, মাস্টার, একটা গুঞ্জন ওঠে। ডেপুটি কমিশনার ঘুরে দেখেন-লুঙি ও গেঞ্জিপরা এক যুবক নমস্কার করে এগিয়ে এল।
কী? আপনারা রেডিয়োতে এতগুলো এ্যানাউন্সমেন্ট শুনেও চরের লোকদের পাড়ে তোলার কোনো ব্যবস্থা করেন নি? ডেপুটি কমিশনার একটু চেঁচিয়েই বলেন কিন্তু বাতাসের বেগ এতে বেশি যে বোঝা যায় না, তিনি রাগ করে জোরে বলছেন, নাকি এই বাতাসের জন্যে তাকে বাধ্য হয়েই জোরে বলতে হচ্ছে।
