দেখতে-দেখতে বাঁধের ওপর কিছু-কিছু লোকজন আসা শুরু করে।
সবচেয়ে আগে আসে আবদুল–এই দুই নম্বরের বাঁধে।
তার রকমসকম দেখে মনে হয় সে সাগাই খেতে এসেছে। আকাশের মেঘ, বাতাস বা বৃষ্টির চাপ ও বেগে বা তার চোখের সামনে তিস্তার ঘোলাটে জলের ক্রমবিস্তারে আবদুলের যেন কিছুই যায় আসে না সে এমনভাবে তার একটা খুব সযত্ন ভাজকরা বিছানা, একটা ভাঙা ছাতাও সেই বিছানার সঙ্গে বাধা, একটা এলুমিনিয়ামের মগ, আর একটা এলুমিনিয়ামের হাড়ি নিয়ে এসে ভেজা ঘাসের মধ্যেই বসে পড়ে। কোন জায়গায় যে বসবে সেটা আবদুলকে একটু ভাবতে হয় বই-কি। সে একবার দুই নম্বরের এই গোলর্বাধটা চক্কর দেয়। পুরোটা চক্কর দিতে পারে না, উত্তরের দিকে এতটাই জংলা যে আবদুলও ফিরে আসে। তা ছাড়া বাধে বসলেও নদীর দিকে মুখ করেই ত বসতে হবে। শেষ পর্যন্ত আবদুল একটা ঝাকড়া কুলগাছের নীচের ডালটা বেছে নেয়। ঝোলানোর জন্যে বিছানাটা সে প্রথমে খোলে। ততক্ষণে বাধে যারা ছিল তারা নদীর দিকে পেছন ফিরে আবদুলের দিকে মুখ করে। আবদুলের বিছানাটা আসলে একটা তুলোর কম্বল–এরকমই কোনো বন্যার সময় রিলিফে পেয়েছিল। সেটার তুলো অনেক জায়গায় উঠে গেছে, কোনো-কোনো জায়গা ফেঁসেও গেছে, কিন্তু এমন নিপুণ ভজ আবদুলের যে বাইরে থেকে বোঝাই যায় না। সেই কম্বল খুলে তার ভেতর থেকে আবদুল একটা পাটের দড়ি বের করে। বের করে দড়িটাকে পাশে রেখে, আবার কম্বলটাকে ভাজ করে। কম্বলটা খোলা হয় যতটা, ভাজ তার চাইতে বেশি। সেই ভাঁজের ওপর দাগ পড়ে গেছে–বেশ মোটা দাগ। ঐ দাগগুলো ছাড়া অন্যভাবে আর একম্বল এখন ভাজ করাই যাবে না। কিন্তু আবদুল একবার লম্বালম্বি ভাজ করে আবার খোলে। পুরো কম্বলই দোর্ভাজি করে সে উঠে দাঁড়ায়, তার মাথা ধরে সামনে ঝুলিয়ে ঝাঁকায়, তারপর খুব ধীরে সেটাকে মাটিতে ছোঁয়ায় আর আস্তে করে শোয়াতে শোয়াতে, নিজে কোমর ভেঙে. নিচু হতে-হতে এগিয়ে কম্বলটাকে একেবারে মাটির ওপর মেলে দেয়। তারপর আবার যেখান থেকে সে শুরু করেছিল, সেই জায়গাটিতে ফিরে আসে, যেন কম্বলের, লম্বা করে শোয়ানো কম্বলেরও মাথা আর পা আছে। জল দেখতে আসা যে-ভিড়টা তখন আবদুলকে দেখছিল, তার ভেতর কেউ বলে, আবদুল, এ্যাখন শুইয়া পড়, রাত্তিরে ত বানা আইসলে জায়গতে হবে।
আবদুল সেকথার কোনো জবাব দেয় না। এমন-কি ফিরেও তাকায় না। সে এবার কম্বলের দুটো দিক ধরে আবার ধীরে-ধীরে এগতে থাকে, নিচু হয়ে। কম্বলটাকে তলার ভঁজের ওপর শুইয়ে সে এবার মাটির ওপর উবু হয়ে বসে দুহাত দিয়ে কম্বলটাকে সমান করে। এবার ডান দিক থেকে তুলে বা দিকের তলার ওপর ফেলে। তারপর আবার তার দিক থেকে তুলে ওপর দিকে ভাজ ফেলে। আবার দু হাতে ঝাড়ে আর দু হাতে কম্বলটাকে একটু চাপে। এবার সে উঠে দাঁড়ায় কম্বলটাকে ওখানে রেখেই। তার পরনে একটি খাকি ফুলপ্যান্ট–একটু ছোট কিন্তু খুব ঢোলা, গায়ের শার্টটা তার ভেতর গোজা, শার্টের ওপর একটা সোয়েটার। যে-ভঙ্গিতে রাস্তার মোড়ে গোল করে দাঁড়ানো ভিড়ের মধ্যে মাদারিকা খেল দেখানোর সময় মা বা বাপ ভিড়টার এক পরিধির একপ্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে পেশাদারি নিশ্চয়তায় হেঁটে আসে, আবদুলও সেরকমই হেঁটে এসে পাটের দড়িটা তুলে নেয়। সে ভাজ করা কম্বলটা ওখানে না এনে, ওখান থেকে ফিরে এসে দড়িটা নিয়ে যে আবার কম্বলের কাছে ফিরে যায় তাতেই বোঝা, যায়কম্বলটা খোলা, ভাজ করা ও বাধা এই কাজটার চাইতেও কাজের প্রক্রিয়াটা তার কাছে বড়। আর, তার মুখচোখে একটা স্মিত হাসি লেগেই ছিল–সকলে তাকে দেখছে এই ঘটনাতে সে বেশ। অভ্যস্ত।
আবদুল গিয়ে কম্বলটার সামনে এক হাঁটু গেড়ে, আর-এক হাঁটু তুলে বসে দড়িটা বাণ্ডিলটার নীচে লম্বালম্বি দেয়। দুদিকে ধরে দড়িটা টানটান করে। একবার বাণ্ডিলটা তুলে সেটাকে ফেলে এমন করে বসায় যেন দড়িটা ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়। উঠে গিয়ে ডান হাতি দড়িটাকে টানটান করে, আবার, বা দিকে গিয়ে বাঁ হাতি দড়িটাকে টানটান করে। তারপর বাণ্ডিলটার সামনে আগের ভঙ্গিতে বসে দুদিকের দড়ি দু হাতে ধরে একই টানে মাঝখানে নিয়ে এসে একটা গিঠ দেয়। হাঁটুটা দিয়ে সেই গিঠটা চেপে ধরে এবার সে দড়িটাকে পাশাপাশি ঘুরিয়ে দেয় আর বাণ্ডিলটাকে উল্টে দেয়। দড়িটাকে বাণ্ডিলের অপর দিক দিয়ে ঘুরিয়ে এসে সে আবার বাণ্ডিলকে উল্টে দেয়। এবার দড়ির দুটো প্রান্তকে আগের গিঠটার ভেতর দিয়ে গলিয়ে একটা গিঠ দেয় ও তার ওপর আবার একটা এমন ফাস বানায় যাতে বাণ্ডিলটাকে সে হাতে বা লাঠিতে ঝুলিয়ে নিতে পারে। এবার সে উঠে দাঁড়ায় ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাণ্ডিলটাকে দেখে। দেখারও যেন একটা সময় ছিল, সেটা পেরিয়ে গেলে সে নিচু হয়ে বাণ্ডিলটা তুলে গাছের তলাটায় আবার চলে আসে। একবার তাকিয়ে ভাঙা ডালের অংশটা দেখে, তারপর, রোজই সে যেন এই গাছটাতেই বাণ্ডিলটা ঝুলিয়ে রাখে এমন ক্ষিপ্রতায় বাণ্ডিলটার ঐ হাতলের মত ফাঁসটাকে ঐ ভাঙা ডালে ঝুলিয়ে দেয়। বাণ্ডিলটা একটু দোলে। সে দুলুনি থামার আগেই আবদুল ওর ডেকচির ভেতর মগটাকে ঢুকিয়ে কুলগাছটার যে-জায়গাটা থেকে ডালপালা বেরতে শুরু করেছে, সেখানে ঐ হাঁড়িটাকে ঢুকিয়ে দেয়। হাঁড়ির সামনে দুই ডালের ওপর ওর লাঠিটা সেঁদিয়ে আবদুল দুই হাত ঘষে, তার কাজ শেষ।
