এই লড়াইটাতে মজা আছে। হঠাৎ জলের ধাক্কায় মাটির ভাগাভাগি বন্ধ হয়ে যায়। তিস্তার জল ঢুকে আলগুলোকে ঢেকে দিলেই, আলে-আলে ভাগ করা মালিকানাও ঢেকে যায়। তখন জল হয়ে পড়ে সকলেরই শত্রু। যেন জল সরে গেলে, মাটি বেরলে, এই মানুষজনের পুরনো কয়েকটি দখলের লড়াই আবার শুরু হতে পারবে; তার আগে পর্যন্ত, যতক্ষণ জল উঁচুনিচু, শুখা-দোআঁশলা, ঢাল-চড়াই জমির ভেদ লোপ করে দিতে থাকে, ততক্ষণ, এই সব জমির দখলদাররা, চাষীরা, মালিকরা, ভুলে থাকতে পারে, জলের নীচের মাটির অসমতলতা বা এই টানা জমির মাটির পরতে-পরতে বালি, চুনপাথর, এই সবের মিশেলের বৈচিত্র্য।
ঐ অসমতলতা আর ঐ মিশেলের রকমফেরের জন্যে জমির দাম বাড়ে কমে, দখল কায়েম হয়, হাতবদল হয়-সম্পত্তির মামলা ত মানুষের সঙ্গে মানুষেরই হয়। কিন্তু, এখন, এমন সব ঋতুবিপর্যয়ে, যখন পাহাড় থেকে ঢল নেমে নদীকে ক্রমেই করে তুলছে যে-কোনো আয়তনের পক্ষেই অনেক বড়, যখন জলের চেনা রং বদলে গেছে, জলের ওপর হুমড়ি খেয়ে তার একেবারে ঘোলাটে মেঘের মত শাদা রং, ফেনা, আর ফেনা কেটে গেলে আচমকা কাদাগোলা জল চিনতে হয়, যখন জন্ম যেন নদী বয়ে, আসছে না-নদীময় পাতাল থেকে উথলে উঠছে, তখন বাঁধের ঠিক নীচেই নদীর গভীর ভেতর থেকে ভাদই চিৎকার করে ধমকে ওঠে বাঁধের ওপর মহেশ্বর জোতদারকে বাবা গে, বঁশ ফেলি দাও, বাঁশ ফেলি দাও—
ভাদইয়ের সারা জীবনে মহেশ্বরকে ডাকার কোনো উপলক্ষই থাকার কথা নয়। আর কচ্চিৎকদাচ যদি হয়ও, তা হলেও দেউনিয়া কথাটিই কত-না শ্লেষ্মায় জড়িয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তিস্তার বানার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেউনিয়া বড় দীর্ঘ শব্দ। আর এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় জোতদারের একজন, মহেশ্বর দেউনিয়া, ভাইয়ের হুকুম মত বাঁধের ওপর জমিয়ে রাখা বাশ একটা তুলে বাঁধের ঢাল বেয়ে ধীরে-ধীরে নেমে জলের ভেতরে ভাইয়ের দিকে ছুঁড়ে দেয়। ভাদই সেই বাশটা ধরে ফেলে চিৎকার করে, আরো দ্যাও কেনে, আরে দ্যাও, যেন, এইমাত্র তিস্তার বন্যায় মানবেতিহাসে শ্রেণীসংগ্রামের চরম নিষ্পত্তি ঘটে গেল।
.
১০২.
বন্যার মুখে শয্যা
জল এসেছে সেই বুধবার থেকে। কিন্তু এখানে অন্তত সেদিন বৃষ্টি ছিল না। ফলে মনে হচ্ছিল, যেমন এসেছে, তেমনি চলে যাবে। কিন্তু আজ শনিবার, কাল গেল শুক্রবার, তার আগের দিন বৃহস্পতিবার থেকে এখানে ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি শুরু হল। বৃহস্পতিবার সকাল দশটা-এগারটা নাগাদ থামলও একটু। রাস্তাঘাট শুকিয়ে গেল। রোদ উঠল না। কিন্তু আকাশের রোদটাকা মেঘে জল বেশি ছিল না। তাই রোদের আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দুই নম্বরের নদীর জল একটু-আধটু বেড়েও ছিল, যেমন বাড়ে, এ রকম ঝড়ো বাতাসে।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ঝড়জল দ্বিগুণ হয়ে উঠল। বৃহস্পতিবার রাত দশটায় প্রথম, তারপর শুক্রবার সকাল জুড়ে রেডিওতে বারবার কমলা সঙ্কেতের কথা বলা শুরু হল। যারা নদীর চরে বা বাঁধছাড়া পারে বসবাস করেন তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ ঘন-ঘন দেয়া হল। সিকিমে কোন একটা জায়গায় বিরাট ধসের খবর পাওয়া গেছে কিন্তু বিস্তৃত বিবরণ এখনো মেলে নি। হেলিকপ্টার ও সৈন্যবাহিনীর কথা রেডিওতে শুক্রবার রাত দশটার আগে বলে নি, তার মানে কোথাও তখনো বন্যা শুরু হয় নি।
কিন্তু শুক্রবার রাত দশটাতেই বলা হল–সিকিমের কিছু খবর পাওয়া গেছে, কয়েকটি জায়গায় প্রবল ধসের ফলে নদীর মুখ আটকে গিয়ে কৃত্রিম হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে। এই হ্রদগুলি ফেটে গেলে নদীর নিম্ন এলাকায় আকস্মিক ও প্রবল বন্যার আশঙ্কা দেখা দেবে। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের জেলা কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে সর্বত্র কমলা সঙ্কেত দিয়েছেন। নদীর চরে ও বাধছাড়া পারে যারা বসবাস করেন তাদের এই মুহূর্তে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তা ছাড়াও সকলকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
রেডিওর এই ঘোষণাতেই যেন হাওয়া তিস্তার ওপরের শূন্যতা থেকে পারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন, জলস্রোত পাড় ভেঙে ফেলে লাফিয়ে উঠে আসতে পারছে না বলেই, হাওয়া, জল বেয়ে ধেয়ে এল ওপরে, একসঙ্গে, এক পরাক্রান্ত আক্রমণে, যা কিছু দাঁড়িয়ে ছিল তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। নিশ্চয়ই মিশে গেল, উড়ে গেল অনেক কিছু। বৃষ্টি ছিল, কিন্তু বাতাসের বেগে সে বৃষ্টি মাটিতে পড়তে পারে না–মাটির সমান্তরালে তীক্ষ্ণ ছুটে যায়।
সুতরাং শুক্রবার রাতটা ত প্রায় অন্ধের মতই কাটানো। শনিবার ভোর হয় যেন নেহাৎ ভোর হতে হয় বলে। ছাইরঙা আকাশ নদীর ওপর নেমে এসেছে আর ঘোলাটে নদী ধাধ বেয়ে উঠে গেছে অনেকটা। নদীর ভেতরে এই উঁচু ডাঙাটায় জল এখনো ওঠে নি বটে, কিন্তু কাল সন্ধ্যার তুলনায় সারা রাতে বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ। বাতাস যেরকম তাতে মনে হয় যেখানে পাহাড়ে ধস নামছে, সেখানে আরো ধস নামবে। কিন্তু সেই ধসের ফলে কোথায় কোন পাহাড়ে নতুন-নতুন হ্রদ গোপনে-গোপনে তৈরি হয়ে আছে, সেগুলো যদি একসঙ্গে ফেটে যায় তা হলে বাধ ত বাধ, বাঁধের ওপর থেকে সরে যেতে হবে মণ্ডলঘাট স্কুলে। যদি সেই সব হ্রদের জল একসঙ্গে না বেরিয়ে এক-এক বারে, বা চুঁইয়ে চুঁইয়ে, বেরয় তা হলে এখানে বন্যা হবে না।
