জমির উঁচুনিচুর হিশেব যদি কষা যায়, তা হলে এই দুই নম্বর আসলে তিস্তারও নীচে। কিন্তু তিস্তার বড় খাত আর দুই নম্বরের মাঝখানে বিরাট চওড়া কচুয়া–সেখানে পাকা বাড়ি পর্যন্ত আছে। জমির ঐ আড়ালটা থাকায় এখানে নদীর তলায় বসে নদী চাষ করা যায়। পাহাড়ের বৃষ্টিতে যদি ধস নামে, বন্যা নামে, তা হলে ওপর থেকেই তিস্তার জল আরো নানা খাত দিয়ে ছড়ায়। এই খাত দিয়েও। ওপরের বন্যার জলেই এই খাতে বান ডাকে। এর সঙ্গে বড় তিস্তার কোনো যোগ নেই। সে যোগ হলে তিন-চার গুণ লাল নিশানাতেও কুলোবে না। তেমন যে হয় না, তা নয়, অন্তত পনের যাদের বয়স তারা এখনো তেমন দেখে নি।
নদীর জমি যখন চাষে আসে তখন ষোল আনার ওপর আঠার আনা লাভ। কারণ, এ জমির কোনো মালিক নেই। যখন জমি জলে ভেজা, পা রাখলে দেবে যায়, থাকার জন্যে একটা বাঁশের মাচান বানাতে বঁশ পোতা যায় না, বাঁশ মাটির ভেতরে সেঁদিয়ে যায়, জল শুকোয় নি, একটু আঁচড়ালেই নীচের জল বেরিয়ে পড়ে, তখন যে গিয়ে প্রথম জমিটাতে নামে তার চোখের হিশেব আর মনের হিশেব হতে হয় নির্ভুল। এক কোনো পাগল-ছাগল যেতে পারে–চার পুরুষ ধরে জমি হারাতে-হারাতে এখন বটগাছের তলা ছাড়া যার নিজস্ব কোনো ছায়া নেই সে এই জমিটাকে নিজের জমি বলে ভাবতে পারে। তার পাগলামির সঙ্গে জমির একটা কার্যকারণের যোগ ঐতিহাসিক বলেই এটা সম্ভব হতে পারে, হয়ও অনেক সময়।
আর, নয় ত ঠিক এর উল্টো। তিস্তা কবছর পর-পর খাত বদলায় তার একটা আন্দাজি হিশেব যার বাপ-ঠাকুর্দার কাছ থেকে জানা আছে বা পর-পর কবছর এই খাতে জল কত পরে এসেছে ও কত আগে বেরিয়ে গেছে–এ হিশেব যার মনে আছে–তেমন হিশেবনিকেশ টাকাপয়সার মানুষ, আধপাগলা কাউকে দু-চার টাকা দিয়ে, এখানে বসিয়ে দিতে পারে জায়গাটার সম্ভাব্য দখল রাখতে।
চরের জমির ত কোনো মালিক নেই–তাই যেন, ভগবানের জমি। যে আগে দখল নিতে পারবে, জমি তার। যে যতটা দখল নিতে পারবে, ততটাই তার। মণ্ডলঘাট আর কচুয়ার মাঝখানে দুই নম্বর। এখন মণ্ডলঘাট পর্যন্ত তিস্তার বড় বাধ দেয়া হয়েছে–একেবারে পুরনো পাহাড়ে হাট-এর মাঝখান দিয়ে। মণ্ডলঘাট চৌপত্তি থেকে এই বাধ একটা গোল হয়ে গেছে যেন। এ বাধটা যেন চৌপত্তিরই একটা অংশ। বাধে ওঠা যা, চৌপত্তিতে ওঠাও তাই। মাঝখানে জলাজঙলা কিছু জায়গা আছে। বানবন্যা ছাড়া এ বাধে কেউ আসে না, আর বানবন্যাতেও আসে ত দুই নম্বরের মানুষজনই। বাধটা ফাঁকা বলে, জঙ্গলটঙ্গল পরিষ্কার করে এখানেই ক্যাম্প হয়। এ চরের দখল রাখলে পরে এটা মণ্ডলঘাটেরই অংশ হয়ে যেতে পারে। আর কচুয়ার পশ্চিম দিয়ে আর-একটা বাধ_গেছে সেই বোয়ালমারির দিকে। তার মানে দুই নম্বরটা পড়ল একেবারে দুই বাঁধের মাঝখানে।
দুই বাঁধের মাঝখানে ত এক নদীই থাকতে পারে। ইনজিনিয়াররা নাকি দুই দিকে বাঁধ দিয়ে ইচ্ছে করেই এই জায়গাটিকে শুকনো রেখে দিয়েছে যাতে সাংঘাতিক বন্যার সময়, যখন পাহাড় ভেঙে নীচে নামবে, পাহাড়ের মাথা দিয়ে জল ঢুকে তলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে, ফরেস্টকে ফরেস্ট উপড়ে আসবে, যখন বোল্ডারগুলো গড়াতে-গড়াতে নামে যেন ভূমিকম্প আসছে, যখন গোটা সাতেক লাল নিশানা রেডিওতে বাজে, ও স্থানীয় সংবাদে হেলিকপ্টার ওঠে ও মিলিটারি নামে তখন নদী বেরবার একটা রাস্তা পায়।
এ রকম একবার ঘটেছিল বটে আটষট্টিতে কিন্তু আবার কবে ঘটবে কেউ জানে না। ততদিন নদীর জন্যে এই খোলা পথটা আটকে দিয়ে আবাদ হবে। যেখানে জমি, যেখানে চাষ-আবাদ সেখানেই মালিকানা, দখল, ভাগাভাগি। নদী নিয়েও সেই মালিকানা, সেই দখল, সেই ভাগাভাগি, আছে। শুকনো হলেও এ ত নদীই।
কিন্তু নদী হলেও এ ত মাটিও বটে। মাটি ত আর নদী নয় যে বয়ে যাবে। মাটি মানে ত গাছ। তাও ছোটখাট ফুললতাপাতা না, কাটাগাছ না, ঝোপঝাড়ও না। মাটি মানে মহীরুহ গাছ–যেখানে আছে, সেখানেই আছে, বাকলের ওপর বাকল জমে, সেখানেই ডালে ঝুরি নামে, সেখানেই ডালে-ডালে সব পরগাছা বাসা বাধে, সেখানেই মাটির ওপর মাটি পড়ে, সেখানেই মাটি উঁচু থেকে আরো উঁচু হয়, লোকে বলে মাটির বুক, সেখানেই উঁচু নিচুতে নানা রকম বাসা বাধা হয়, চাষ চষা হয়–মাটি নিয়ে মানুষের কাজেরও আর শেষ নেই। তার পর কোন এক সময় কারো মনেও থাকে না এই মাটি আসলে মাটি নয়, নদী, বা বড়জোর নদীর জন্যে খুলে রাখা পথ–সে পথে নদী আর কখনো ঘুরে আসে নি। তখন ধীরে-ধীরে সেই নদী জনপদের প্রাক্তন এক উপকথায় পরিণত হয়, জনপদবাসীর পুরুষানুক্রমিক মুখে-মুখে। ধীরে-ধীরে তেমন মানুষ কমে আসে, যারা নিজেদের অতীতকে গৌরবান্বিত করতে এক নদীর ক্রমবিস্তার ঘটায়–সে কী নদী। ধীরে-ধীরে তেমন মানুষ কমে আসে, যাদের স্মৃতিতে নদী বহমান থাকে। ধীরে-ধীরে তেমন মানুষ কমে আসে, যারা নদীকে ডাকনামে ডাকে। সেই কোনো এক সময় এই জায়গাটিকে আর দু দিক বাঁধ বাধা বলে চেনা যাবে না। তখন নদীর প্রবহমাণ জলের জন্যে অন্য কোথাও নতুন ধাধের দরকার হবে।
এই জায়গাটি, এই দুই নম্বরটি, এখনো সেই পথে পৌঁছয় নি-যেমন ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে সেই পাহাড়ের তলার মঞ্জুলি, তার নীচে প্রেমগঞ্জ বা বাসুসুবার চর, দোমোহনি বা পদমতীর চর, বা তারও নীচে কোচবিহারের পুবে মেখলিগঞ্জ পশ্চিমে হলদিবাড়ির মাঝখানে নুয়াপাড়া থেকে দহগ্রামের বহু পুরনো চর। বা, তার আগেই এই কাশিয়াবাড়ি, বোয়ালমারি, এমন-কি কচুয়াও। তাই এখনো এই খাতে নিয়ে নদীর সঙ্গে কিছু-কিছু দখলের লড়াই চলছে। মানুষজন এখনো চাষে-চাষে এই নদীপথকে নদীর পক্ষে দুরধিগম্য করে তুলতে পারে নি। নদী এখনো জলে-জলে এই মাটিকে চাষের পক্ষে অযোগ্য করে তুলতে পারে নি। তাই এখনো বছরে কয়েকবার, বা দু-এক বছরে একবার চলে মানুষ আর নদীর দখলের লড়াই।
