গজেন মোষটার সঙ্গে-সঙ্গে আধাআধি পর্যন্ত উঠেছে, তখন ফিরে তাকিয়ে দেখে গরুর পালটা মন্থর গতিতে পেছন-পেছন আসছে বটে কিন্তু তাদের গা থেকে এত জল ঝরছে যে পুরো চড়াইটা ভিজে গেছে। ভেজার রং দেখে বোঝা যায়–পিছল হয়ে গেছে। এই খাইসে, এ্যালায় ত গর্তত পড়ি যাবা ধরিবে, গজেন মোষটাকে থামিয়ে দেয়, তারপর নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। নিতাই আর নরেশ এখনো নদীর পাড়ে। গজেন আর মোষটা থেকে শুরু করে সেই পাড় পর্যন্ত একটা করে গরু বা বাছুরের লাইন। নদীর মধ্যে পালের আরো কিছু গরু-বাছুর। এই পুরো লাইনটা এগনোর সঙ্গে-সঙ্গে পাড়ে একটা-একটা করে উঠছে।
হে-এ-এ নিতাই, গজেন চিৎকার করে ওঠে। সে চিৎকারটা বাঁধের ওপর দিয়ে বিপরীত দিকে চলে যায়। তা হলে কি মোষটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বলে আসবে? শালা অমূল্যা কোটত গেইল? গজেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে বালিশ-সালিশ, বলরামের ছোঁয়া, আরো গোটা তিনেক ছাওয়াহোটর ঘর বাঁধের ওপর গরুর খোটা পোতা শুরু করেছে। আর, বোল্ডারের ওপর দিয়ে মাথায় ঘাসপোয়ালের বস্তা নিয়ে দুইটা আখোয়াল বাধে উঠছে। গজেন চিনতে পারে–অশ্বিনী রায়ের মানষি আর অমূল্যাদের মানষি। গজেন সেখানে দাঁড়িয়ে চেঁচায়–হে-ই বাউ, এইঠে আসেন কেনে। লোকদুটি গজেনের কথা শুনতে পায় না কিন্তু মুদ্রা দেখতে পায়। তারা বোল্ডার ভেঙে বাধে উঠছিল, গজেনের ডাক শুনেসিধে ডাইনে ঘুরে গজেনের দিকে আসতে শুরু করে। বাঁধের ঢাল দিয়ে আড়াআড়ি হাঁটা কঠিন। ওদের ডান-পাটা নীচে, বাঁ-পাটা ওপরে।
কিন্তু মোষটা দাঁড়িয়ে পড়ায় গরুর লাইনটাই ত দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফলে, পাড়ে আর নতুন গরু তোলার জায়গা না পেয়ে নরেশ ঘুরে তাকায়, নিতাইয়ের চুল নদীর ভেতর থেকে জেগে ওঠে। ওরা তাকিয়ে কিছু বুঝতে চায়। গজেন হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলে। লোকদুটি এগিয়ে আসে। নরেশের চিৎকার বাতাসের সঙ্গে এসে ঝাপটা মেরে উঠে যায়–ঐখানে খাড়ায়্যা-খাড়ায়্যা কি মৃতব্যার ধরছিস নাকি?
গজেন সে কথার কোনো জবাব না দিয়ে লোকদুটিকে বলে–এইঠে পিছল হয়্যা যাছে, খাড়ি করি ছাড়িবার ক, যা কেনে। লোকদুটি ওখান থেকে ঢালটার দিকে একবার তাকিয়েই সমস্যাটা বুঝতে পারে। গজেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই দুজনে বোল্ডার দিয়ে সরসর করে নেমে যায়। অশ্বিনী রায়ের মানষিটা, আষাঢ়, নেমেই যায় কিন্তু অমূল্যাদের মানষিটা আবার উঠে আসে। সে বাঁধের ওপর উঠে মাথার বস্তাটা ফেলে আবার বোল্ডার দিয়ে নদীর দিকে ছোটে।
আষাঢ়ু নরেশকে গিয়ে বলতেই নরেশ হাতের ইশারায় জানায়, ঠিক আছে, এখন গজেন মোষটাকে নিয়ে উঠুক। আষাঢ়, আব অমূল্যার মানষিটা আবার বোল্ডার দিয়ে গরুর লাইনের দিকে আসে। আষাল্ড অমূল্যার মানষিটাকে কিছু বলে, সে তড়াক করে মাটিতে নেমে পাড়ে দাঁড়ানো গরুগুলোর পা থেকে জল কাচিয়ে ফেলতে শুরু করে আর আষাঢ় বোল্ডারের ওপর, বাঁধের ঢালুতে যে-সব আগাছা জন্মেছে সেগুলো ছিঁড়ে-ছিড়ে ঢালটাতে একবার ছড়িয়ে দিয়ে দ্বিতীয়বার আনার জন্যে পেছন ফিরতেই গজেনের হা-হা, হাসির আওয়াজে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে গরুগুলো সেই সব ঘাসপাতা জিভে তুলে চিবুতে শুরু করে দিয়েছে। সে তখন আবার ঘুরে, হেঁটে, এই লাইনটার দিকেই এগয়–গজেনের দিকে জিজ্ঞাসু মুখ তুলে। গজেন হাতের ইঙ্গিতে তাকে বাঁধের ওপর যেত বলে। মোষের দড়িটা ধরে নিজে পা বাড়ায়।
বাঁধের ওপর থেকে খোটা পোঁতার আওয়াজ মৃদু আসছে–আওয়াজের বাকিটা ত বাতাসে রংধামালির দিকে চলে যাচ্ছে। এখন ত গরুবাছুরগুলো এসে বাধে উঠল। এখনই যে-হ্যাঁর গরু-বাছুর আলাদা করে নেবে, আলাদা খোটায় পুঁতবে। যাদের অনেকগুলো গরু, নানা রকমের নানা কাজের গরু–তারা সেই অনুযায়ী গরুগুলোকে ভাগ করে খোটায় পুঁতবে। অমূল্যা আর অশ্বিনী রায় ত মানষি পাঠিয়েই দিয়েছে, জগদীশ বারুই এরকম পাঠায় না–সে জানে তার গরুমোষ দেখার লোকের অভাব হবে না। কিন্তু ঐচরে প্রতিদিনের কাজে যাদের সঙ্গে দেখা হয় না, তারা বন্যার মুখে এই বাধে গরুবাছুর পরিবারসহ এসে উঠলেও ত আর একেবারে মিলেমিশে যেতে পারবে না। শেষে দেখা যাবে-পাড়া অনুযায়ী এখানেও ভাগ হয়ে আছে। কিন্তু গরুর বেলায় পাড়াভাগে চলবে না–যার-যার গরু সে আলাদা-আলাদা করে নেবে। প্রথমে এল গরু। তারপরই আসছে গরুর খাবার আর দেখাশোনার লোক–যার মানষি আছে তার মানষি, যার ছাওয়াছোট আছে তার ছাওয়াছোট। যার-যার গরু তারার মত আলাদা হয়ে যাবে।
ভেঙে পড়া দিগন্ত থেকে উচ্ছন্ন বাতাস আর লোপাট আকাশ থেকে বৃষ্টির তীরে বিদ্ধ হতে-হতে এতক্ষণ যে গরুমোষবাছুরের পাল সমবেত এক বাঁচার প্রয়াসে এই বাঁধ পর্যন্ত ছুটে এল, তাদের ওপর ব্যক্তিস্বত্বের ভাগাভাগি কায়েম রাখতে বাঁধের ওপর খোটা পোতা হচ্ছে। সেই খোটা পোতার আওয়াজ বন্যার বাতাসে বাহিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে।
গজেনের হতে ধরা জগদীশের মোষের বাকা শিং আকাশের ধূসর মেঘে জেগে ওঠে।
.
১০১.
চর দুই নম্বর
নিতাইদের চর থেকে নদী হয়ে মাইল আট আর জলপাইগুড়ি শহর হয়ে মাইল বার ভাটিতে এই দুই নম্বরটাও ত চর–লোকের মুখে-মুখে। আসলে এটা তিস্তার এই খাত বছরে আট মাসই শুকনো থাকে। বাকি চার মাসও শুকনো থাকতে পারে যদি তিস্তা অন্যদিক দিয়ে বয়ে যায়। তেমন পরপর তিন বছর গেল বলেই না এইখানে লাঙল নামল, মানুষজন নামল; তারপর ঘরও উঠল, কলাগাছও ফাপল, আর একসারি সুপুরি গাছও সাইসাই করে বাড়ল। কিন্তু, তারপরই আবার একবার তিস্তা আর-সব খাত ছেড়ে দিয়ে এই একটা খাতের দিকেই ছুটল। এরকম করতে করতে গত বছর দশেকে এখন এই নিচু চরের কোনো-কোনো জায়গা উঁচু হয়ে গেছে, কোনো-কোনো জায়গা ভোবা হয়ে আছে। আর দশ বছরে জমির ভাগাভাগিটাও পরিষ্কার। শীতকালে পুরো জমিতেই রবিচাষ হয়। গমও আজকাল ভাল হচ্ছে। যদি এরকম ভালই হয়, তা হলে অন্য রবি চাষ না করে গমই করবে সবাই। উঁচু জায়গাগুলো থাকে আমনের জন্যে। উঁচু, মানে এই চরের নিচু জমির চাইতে উঁচু কিন্তু, নদীর পাড়ের অনেক নিচু।
