নিতাই নরেশের কথার কোনো জবাব দেয় না। বাচ্চা দুটোকে বলে–সরায়্যা নে; সরায়্যা নে। জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে বালিশ-সালিশ দু জনেই দু দিকে টানে। বুড়ি গরু বোধহয় নির্দেশটা বুঝতে পারে–সে সালিশের দিকে দু পা এগিয়ে যায়। নিতাই বলরামের ছেলেটাকে বলে–আ, ওগুলারে আ-ন। বলরামের ছেলে পেছনের গরুটাকে এগিয়ে দেয়। ঐটুকু বিরতিতে নিতাই দেখে, গরুগুলোর পায়ের চাপে পাড়টা এত ভেঙে ও ভিজে গেছে যে-কোনো গরু পড়ে যেতে পারে। সে বালিশকে বলে, আউগা, আর এটটু আউগা। সালিশ দড়ি ধরে টেনে দুই পা যেতে না-যেতেই ধপ করে গভীর জলে পড়ে যায়। বালিশ তীব্র শিশুকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, অ কাহা, সালিশ পইড়্যা গিছে, আগাই কুথায়?
নিতাই খাড়া বলে কিন্তু তাকিয়েও দেখে না, প্রফুল্ল পালের বুড়িটাও দাঁড়িয়ে যায়। সালিশ উঠে আসে। নিতাই দু পা পরে এক জায়গায় নতুন করে গরুগুলোকে পাড়ে তুলতে গিয়ে দেখে পাড়ের গরুগুলো এগচ্ছে না, দাঁড়িয়ে আছে, এখন কোনো গরু তুললে সেটা দাঁড়ানোরও জায়গা পাবে না।
নিতাই তার বাবরি চুলের রাশি বা থেকে ডাইনে ফেলে চিৎকার করে ওঠে, তুরা কি ঐখানে সঁজা টাইনবার ধরছিস নাকি, এই নরেইশ্যা।
নরেশ আধখানা ঘাড় ঘুরিয়ে বা হাত তুলে নিতাইকে থামতে বলে। নরেশ ঘাড় উঁচু করে দেখে পিঠের বাছুরটাকে নিয়ে মোটা ঐ নালী বেয়ে উঠতে পারছে না। আরে, শালা গজেন, তুর মাথা না শালকাঠ? বলতে বলতে নরেশ এক লাফে বোল্ডারের ওপর উঠে ঐ দিকে ছুটে যায়, শালা, পেরেক ঢোকে না মাথায়? বাছুরটাকে নামায়্যা থো বোল্ডারের উপর।
নরেশের চিৎকার শুনে গজেন পেছন ফিরে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। নরেশ গিয়েই মাটিতে নেমে তার লম্বা হাতে বাছুরটাকে টেনে মোষের পিঠের কিনারায়, আনে, গজেনকে বলে, ধর মাথা।
আরে, হাত দিয়্যা ঘ্যার পাই না, যে– গজেন বলে।
আরে শালা বাইটকুল, নরেশ হেসে ফেলে, টান, বোল্ডারের কাছে টান, টাইন্যা আন।
গজেন মোষের গলার দড়ি ধরে টেনে বোস্তারের কাছে নিয়ে আসে। নরেশ আর গজেন বোল্ডারের। ওপর উঠে পড়ে মোষের পিঠ থেকে বাছুরটাকে এক টানে নামাতে গিয়ে বোঝে পিছলে যেতে পারে। পেছনে সেই মা-গাইটা হঠাৎ হা-স্বা ডেকে ওঠে। নরেশ মোষটার পিঠে তার ডান পাটা দিয়ে দু বার চাপ দিয়ে যখন বোঝে মোষটাও বিপরীত চাপে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন ওয়ান টু থ্রি বলে এক ঝুঁকিতে বাছুরটাকে বোল্ডারের ওপর এনে আস্তে করে নামায়। পেছন থেকে বাছুরটার মা-গাই হামলে পড়ে–এতক্ষণে সে বাছুরটাকে জিভের আওতায় পেয়েছে। গজেন মোষের দড়ি ধরে নালী বেয়ে বাঁধের ওপরে উঠে যায়। নরেশ ছুটে যায় নিতাইয়ের দিকে।
.
এই নালীটা তৈরি হয়ে গেছে একটু অদ্ভুত কারণে। সাধারণ ভাবে বাঁধের ওপর থেকে কোনো জল স্রোতের মত গড়িয়ে পড়া নিষেধ। যদি তেমন স্রোত কোথাও কোনো-কোনো কারণে তৈরি হয়ে যায়, তা হলে সেটা তখনই বন্ধ করে দেয়ার কথা। নইলে বাঁধের মাটি ক্ষয়ে যাবে, বাঁধের তলার মাটি আলগা হয়ে যাবে। কিন্তু এই নালীটা তেমন কোনো স্রোতের ধাক্কায় তৈরি হয় নি বরং বাঁধের গা এখানেও তারের জালে আঁটা বোল্ডার দিয়ে বাঁধানো।
নদীর স্রোত বন্যার সময় যাতে সরাসরি বাঁধের গায়ে ধাক্কা না মারে, সে জন্যে, বিশেষ বিশেষ জায়গায় শালখুটির লম্বা খাঁচা নদীর ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে–যাকে বলে স্পার। সেই স্পারগুলোর ভেতরটাও বড়বড় বোল্ডার দিয়ে ভরা। জলস্রোত সেখানে ঘা খেয়ে ঘুরে যায়, ঘুরে যাওয়ার সময় কিছুটা বালি ও মাটি ফেলে রেখে যায়। তাতে পাড়টা আর-একটু চওড়া হয়, নদী একটু দূরে সরে যায়। যখন নদীতে বন্যা আসে তখন এসব ব্যবস্থার সুফল বোঝা যায়–অনেকক্ষণ পর্যন্ত স্পারের ধাক্কায় নদীস্রোত উল্টোদিকের চরে, নিতাইদের চরে গিয়ে ধাক্কা মারে।
কিন্তু ৫৮ সালে বাঁধ তৈরির পর ৬২-৬৩ সালে দেখা গেল–আর সব জায়গা থেকে জল সরে গেলেও এই জায়গাটিতে একটা ছোট্ট খাড়ির মত থেকে যাচ্ছে। তাতে কারো কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না–কারণ জল সরে গেলে এরকম একটা তিরিশ-পঁয়তিরিশ হাত খাড়ি থাকলেই বা কী আর না থাকলেই বা কী। কিন্তু তার পরের বৎসর বন্যায় এই খাড়ির ভেতর দিয়েই স্রোত গিয়ে:বাঁধের গায়ে সরাসরি ঘা মারল। সেবার বৃষ্টি বেশি হয় নি। সেই শীতকালেই বোল্ডার দিয়ে নদীর পাড়টাকে বাধিয়ে দেয়া হল–যাতে খাড়ির ভেতর জল ঢুকতে না পারে। খাড়িটা একটা জলহীন নালীর মত থেকেই গেল! ধীরে-ধীরে বুনো গাছগাছড়ায় ভরে গেল। কিন্তু একেবারে বুজে গেল না।
এখন জগদীশের মোট তার পিঠের বোঝা নামিয়ে সেই খাড়ি বা নালীর পাশ দিয়ে পা ফেলে-ফেলে উঠতে লাগল। গজেন মোষটার গলার দড়ি ধরে আগে-আগে যাচ্ছিল। দড়িতে কোনো টান লাগছিল না। মোষটা তা হলে নিজের মত করেই ধীরেসুস্থে উঠছে। গজেন দড়িটা ছেড়েও দিতে পারে।
কিন্তু ছাড়ে না। তারের জালেঘেরা বোল্ডার আর খাড়ির সীমানার মধ্যে জায়গাটা, মানে যে-জায়গাটা দিয়ে পালটা উঠবে, সেটা তত চওড়া নয়, যদিও নদীর পাড়ে আর বোল্ডারের মাঝখানের যে-পথটুকু ওরা পার হয়ে আসছে, তার থেকে চওড়া। তার ওপর আবার চড়াই ত বটেই। কোনো গরু বা বাছুর যদি এখান থেকে ঐ গর্তটার মধ্যে পড়ে যায় তা হলে সেটাকে ঐ গর্ত থেকে ভোলা সাত হাঙ্গামা। একেবারে ঘাড় মটকে যদি না পড়ে তা হলে মরবে না হয়ত, কিন্তু ঠ্যাংট্যাং ভেঙে যেতে পারে। ঘাড়ও যদি না মটকায়, ঠ্যাঙও যদি না ভাঙে তা হলে কোনো গরুর অবিশ্যি ওখানে থাকতে আপত্তি হবে না-গাছগাছালিও আছে, জলও আসবে না। কিন্তু এখন, চর খালি করার এই শুরুতেই এসব গোলমাল শুরু হওয়া ভাল নয়।
